মৃত্যুর আগেই ‘চল্লিশা’, ৫ হাজার অসহায়কে ভোজ করালেন দম্পতি

মৃত্যুর আগেই ‘চল্লিশা’, ৫ হাজার অসহায়কে ভোজ করালেন দম্পতি

মৃত্যুর পর আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাঁর চল্লিশা করবেন—এমন প্রচলিত ধারণাকে ভিন্নভাবে দেখিয়ে জীবিত থাকতেই অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ‘চল্লিশা’র আয়োজন করেছেন কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার এক দম্পতি।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার উপজেলার জিনারী ইউনিয়নের বীর হাজীপুর গ্রামে প্রায় ৫ হাজার অসহায় মানুষের জন্য বিশাল ভোজের আয়োজন করেন মো. রফিকুল ইসলাম (৬২) ও তাঁর স্ত্রী বেগম আক্তার (৫৫)। ব্যতিক্রমী এ আয়োজন ঘিরে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি ছড়িয়ে পড়েছে।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বীর হাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এ ভোজের আয়োজন করা হয়। অতিথিদের বসে খাওয়ার জন্য মাঠজুড়ে বিশাল সামিয়ানা টানানো হয়। পাশাপাশি চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা করা হয়। একসঙ্গে প্রায় ৪০০ মানুষ বসে খাবার গ্রহণের ব্যবস্থা ছিল। কয়েক দফায় অতিথিদের খাবার পরিবেশন করা হয়।

ভোজের মেন্যুতে ছিল গরুর মাংস, মাছের মুড়িকণ্টা, ডাল ও পায়েস। এলাকার বিভিন্ন বয়সী মানুষ উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে আয়োজনে অংশ নেন। অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের পাশাপাশি স্থানীয় অনেক বাসিন্দাও এ আয়োজন দেখতে ও খাবার পরিবেশনে সহযোগিতা করতে মাঠে উপস্থিত হন।

আয়োজক মো. রফিকুল ইসলাম জিনারী ইউনিয়নের বীর হাজীপুর গ্রামের মৃত হাতেম আলীর ছেলে। নিজের এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর দুই সন্তান বাকপ্রতিবন্ধী। ভবিষ্যতে তাঁর মৃত্যুর পর সন্তানরা আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও এলাকার মানুষকে নিয়ে এ ধরনের আয়োজন সঠিকভাবে করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তাঁর আশঙ্কা ছিল। সেই চিন্তা থেকেই জীবিত অবস্থায় নিজের হাতে এ আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও এলাকার মানুষের দোয়া পাওয়ার আশায় এবং পরকালের সওয়াবের প্রত্যাশায় মৃত্যুর আগেই আমি এই আয়োজন করেছি। আমার ইচ্ছা ছিল, আমি নিজে বেঁচে থাকতেই সবার হাতে খাবার তুলে দেব।’

তিনি জানান, জীবিত অবস্থায় অসহায় মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা থেকেই এমন উদ্যোগ নিয়েছেন। মৃত্যুর পর অন্যরা আয়োজন করবেন—এমন অপেক্ষায় না থেকে নিজ হাতে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।

রফিকুল ইসলামের চাচাতো ভাই মো. শামীম হোসেন বলেন, ‘এ ধরনের আয়োজন আমাদের এলাকায় আগে দেখা যায়নি। সবাই উৎসবমুখর পরিবেশে আনন্দের সঙ্গে খাবারে অংশ নিয়েছেন।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রফিকুল ইসলাম তাঁর মৃত্যুর পর চল্লিশার পরিবর্তে জীবিত অবস্থাতেই এ ভোজ আয়োজনের পরিকল্পনার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করেন। এরপর থেকেই বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই তাঁর এ উদ্যোগকে ব্যতিক্রমী ও মানবিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।

রফিকুল ইসলাম জানান, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের রাস্তার পাশে নির্মাণাধীন দোকান ও জমির একটি বড় অংশ থেকে পাওয়া প্রায় ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা থেকে এ আয়োজনের অর্থ ব্যয় করেছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, পুরো আয়োজন করতে প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রফিকুল ইসলামের দুই সন্তান মাসুদ মিয়া (৩০) ও রায়হান মিয়া (১৪) বাকপ্রতিবন্ধী। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন শান্তা আক্তার (২৫), রানা মিয়া (১৭) এবং তাঁর মেয়ে-জামাই বাবলু মিয়া, যিনি মাদারগঞ্জের বাসিন্দা।

ভোজে অংশ নেওয়া কয়েকজন জানান, সাধারণত কারও মৃত্যুর পর স্বজনরা চল্লিশার আয়োজন করেন। কিন্তু জীবিত অবস্থায় একজন ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে অসহায় মানুষের জন্য এমন বড় আয়োজন করেছেন—বিষয়টি তাঁদের কাছে নতুন ও ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। খাবার পেয়ে তাঁরা আয়োজক দম্পতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং তাঁদের জন্য দোয়া করেন।

ব্যতিক্রমী এ আয়োজনকে ঘিরে বীর হাজীপুরসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। জীবিত অবস্থায় নিজের জন্য ‘চল্লিশা’ আয়োজনের পাশাপাশি অসহায় মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার এ উদ্যোগকে স্থানীয় অনেকেই মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন