অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে যশোর অঞ্চলের বহু চাষিকে এবার আগেভাগেই পাট কেটে ফেলতে হয়েছে। পরিপক্ব হওয়ার আগে এভাবে পাট কেটে ফেলায় ফসলটির ফলন ও গুণগত মান— উভয়টিতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আবার উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর কম থাকায় লোকসানের আশঙ্কা করছেন চাষিরা। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, বাজারে পাটের দাম ভালো।
যশোর মূলত উঁচু ভূমি হলেও তবে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ, পোল্ডার, স্লুইচগেট নির্মাণ করায় জেলার বিরাট একটি এলাকা যুগের পর যুগ ধরে জলাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। ‘ভবদহ’ নামের এলাকাটিতে শত শত কোটি টাকা খরচ করেও জলাবদ্ধতা নিরসন করা যায়নি।
এবার বর্ষা মৌসুমে যশোর অঞ্চলে স্বল্পসময়ের মধ্যে ভারী বৃষ্টি হয়েছে। ফলে ভবদহ তো বটেই, অন্য এলাকাতেও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বাধ্য হয়ে এসব এলাকার অনেক চাষি জমি থেকে আগেভাগে পাট কেটে ফেলেছেন। কৃষি কর্মকর্তা ও চাষিদের মতে, পাট কাটার উপযুক্ত সময় ভাদ্র মাস। এ মাসের শেষ দিকে কাটলে পরিপক্ব পাট পাওয়া যায় । এর আগে কাটলে ফলন যেমন কমে, তেমনি আঁশের মানও ভালো হয় না।
যশোর শহরঘেঁষা রামনগর ও চাঁচড়া ইউনিয়নের বিরাট এলাকাজুড়ে বিলহরিণার অবস্থান। বিলটি দিয়ে যশোর শহরের দক্ষিণাংশ ও আশপাশের এলাকার পানি নিষ্কাশিত হয়ে ভবদহ অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীগুলোতে যায়। কিন্তু ভবদহ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ায় পানি নিষ্কাশন একেবারেই কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে বিলহরিণায়ও।
বিলহরিণার পাট চাষিরা বলছেন, তারা পাটের আঁশ শক্ত বা মোটা হওয়ার আগেই কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। যে কারণে কাঙ্ক্ষিত মানের ছাল বা আঁশ পাওয়া যায়নি। যেগুলো পাওয়া গেছে সেগুলো অপরিপক্ব ও নিম্নমানের। স্বাভাবিকভাবেই এই পাটের দাম কম। তাছাড়া জলাবদ্ধ এলাকায় পাট কাটা ও জাগ দেওয়ার খরচও অনেক বেশি।
এখানকার চাষি পলাশ কুমার সরকার বলেন, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে পাঁচ কাঠা জমির পাট কাটে একজন শ্রমিক, বুক সমান পানিতে নেমে কাজ করতে হওয়ায় শ্রমিক লাগছে অনেক বেশি। ফলে খরচও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে।
একই কথা এলাকার চাষি দেবাশীষ পালের। তিনি বলেন, আমার দেড় বিঘা পাটের জমি বিলের পানিতে তলিয়ে গেছে। পাটের বাজারদর না বাড়লে খরচ তোলা অসম্ভব।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, যশোর সদরে মোট ১,৭২০ একর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে রামনগর ও চাঁচড়া ইউনিয়নের কিছু নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এখান থেকে পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই। শ্রাবণেই আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছি, পচন ধরা পাট গাছগুলো দ্রুত কেটে ফেলতে। কারণ পানিতে বেশিদিন থাকলে পুরো ফসলটাই নষ্ট হয়ে যাবে।
এদিকে, ভবদহ এলাকার অন্তর্গত কেশবপুর, মণিরামপুর, অভয়গরের চাষিদের অবস্থাও একই রকম। কৃষি কর্মকর্তা ও চাষিদের ভাষ্য, বপনের প্রায় ১২০ দিন পর অর্থাৎ ভাদ্র মাসের শেষ দিকে পাট পরিপক্ব হয়। কিন্তু জমিতে পানি বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক আগেভাগেই পাট কেটে ফেলেছেন। এতে আঁশের মান ও ফলন দুটোই কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চলতি মৌসুমে যশোর জেলায় ২৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে প্রায় সাড়ে তিন টন ফলনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। সেই হিসাবে মোট উৎপাদন হওয়ার কথা ৮৫ হাজার ৪০০ টনের মতো। তবে জলাবদ্ধ এলাকায় ফলন কমে গেছে। বিশেষ করে ভবদহ ও কাছাকাছি অঞ্চলের বিলগুলোতে পাটের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে।
এবার কেশবপুর উপজেলায় ছয় হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়। এই খাত থেকে উপজেলার চাষিদের ১৬০ কোটি টাকার বেশি আয় হওয়ার কথা। কিন্তু জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জমি। এতে পাটের উৎপাদন যে কতটা কমেছে, তা এখনই নিরূপণ করা সম্ভব নয়।
কেশবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলছেন, ভাদ্র মাসের শেষের দিকে কাটলে কৃষকরা পরিপক্ব পাট পেতেন। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে অনেক কৃষক আগেভাগেই পাট কেটে ফেলেছেন। ফলে তারা ভালো ফলন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
চাষিদের ভাষ্য, ক্ষতির হিসাব শুধু আগাম পাট কেটে ফেলা আর পানিতে কাজ করতে বাধ্য হওয়া শ্রমিকের বাড়তি মজুরিতেই সীমাবদ্ধ নয়। পাট চাষের শুরু থেকেই তাদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বীজ, সার, জমি প্রস্তুত, আগাছা পরিষ্কার, সেচ, শ্রমিকের মজুরি এবং পাট কাটা ও জাগ দেওয়ার খরচ মিলিয়ে বিঘাপ্রতি ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
কিন্তু বাজারদর তুলনামূলক কম। চাষিরা বলছেন, চলতি মৌসুমে প্রতিমণ পাট ২,৮০০ টাকা থেকে ৩,২০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় এই দর বেশ কম।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেনের ভাষ্য, চলতি বছর পাটের ফলন অত্যন্ত ভালো। কৃষকরাও ভালো দাম পাচ্ছেন। সরকারিভাবে যে পাট ক্রয়কেন্দ্রগুলো রয়েছে, সেগুলো আরো কার্যকর করা হলে এবং বিভিন্ন পাটকলের মাধ্যমে পাট কেনা হলে কৃষকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাবেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


