হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকাতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে সৌদি আরব

হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকাতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে সৌদি আরব

রিয়াদকে চাপে ফেলতে বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে ইয়েমেনের হুথিরা। পাল্টা অভিযানে নেমেছে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী, বাড়ছে আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। ইয়েমেনের হুথিদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে সৌদি আরব। রাজধানী রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পাশাপাশি দেশটির অন্যান্য বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিমান চলাচল, প্রশ্ন উঠেছে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের ওপর হুথিদের এই আক্রমণ কেবল সামরিক সংঘাতের অংশ নয়; এর মাধ্যমে রিয়াদের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং নিরাপদ বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে দেশটির ভাবমূর্তিতেও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। একই সময়ে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কৌশলগত এলাকাগুলো পুনর্দখলে অভিযান জোরদার করেছে। ফলে সংঘাতটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা

গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরদিন রোববার একই বিমানবন্দর এলাকায় আরেকটি হামলায় একজন নিহত হন এবং প্রায় এক ডজন মানুষ আহত হন।

শনিবারের হামলার পর প্রকাশিত নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে বিমানবন্দরের টার্মিনালে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। হামলার অভিঘাতে টার্মিনালের ভেতরে ধোঁয়া ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে।

রিয়াদ বিমানবন্দর সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক যোগাযোগকেন্দ্র। রাজধানী থেকে প্রায় ২২ মাইল উত্তরে অবস্থিত এই বিমানবন্দরে হামলার কারণে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সময় বাড়িয়েছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাও রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও পরিবহন অবকাঠামো ঘিরে হুথিদের হামলা বাড়ছিল। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই অভিযানের সবচেয়ে গুরুতর পর্যায়গুলোর একটি।

এখনই হামলা জোরদার করল কেন হুথিরা?

হুথিদের হামলার সময় নির্ধারণের পেছনে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ এবং বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত—দুইয়েরই প্রভাব রয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধে হুথিরা প্রথমদিকে সরাসরি জড়ায়নি। তবে গত মাসে গোষ্ঠীটি গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা দখল করে এবং লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের অবস্থানে পৌঁছায়।

বাব আল-মান্দেব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি রপ্তানি এবং এশিয়া-ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে এই পথের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থক বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের পাল্টা অভিযান শুরু করে। বাব আল-মান্দেবের আশপাশ থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য অবস্থানেও আঘাত হানা হচ্ছে।

সৌদি আরব ইয়েমেনের স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করায় হুথিদের প্রধান প্রতিপক্ষের একটি হয়ে উঠেছে। ফলে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে রিয়াদকে সরাসরি যুদ্ধের মূল্য দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে গোষ্ঠীটি। রাজধানীর বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ হচ্ছে কীভাবে?

পরপর হামলার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সৌদি আরবের শক্তিশালী বলে পরিচিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কীভাবে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে। তবে হামলাগুলো কেন প্রতিহত করা যায়নি, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

সৌদি আরবকে একই সঙ্গে সরকারি ভবন, তেলক্ষেত্র, বিমানবন্দর এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার জন্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখতে বিপুলসংখ্যক প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র এবং কার্যকর নজরদারি সক্ষমতা প্রয়োজন।

হুথিদের হামলার পরিধি বেড়ে যাওয়ায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়ছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে একযোগে বা ধারাবাহিকভাবে হামলা হলে কোন লক্ষ্যবস্তু আগে সুরক্ষিত করা হবে, তা নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এর আগে রিয়াদ বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংক ও সংশ্লিষ্ট গুদামগুলোও হামলার লক্ষ্য হয়েছিল। এসব হামলায় বিমানবন্দরে থাকা একটি এয়ারবাস এ৩২০ যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ধ্বংস হয় এবং অন্তত আরো পাঁচটি উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হুথিরা দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হামলা চালিয়ে যাওয়ার হুমকিও দিয়েছে। ফলে বিমান চলাচলের নিরাপত্তার পাশাপাশি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করার কৌশল কী?

বিমানবন্দর এমন একটি অবকাঠামো, যার ওপর হামলা হলে শুধু যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হয় না; আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং বিনিয়োগের ওপরও প্রভাব পড়ে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, পর্যটন ও বড় বৈশ্বিক আয়োজনের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ২০৩২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতিও সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।

এমন সময়ে রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা দেশটির নিরাপত্তা-ভাবমূর্তির জন্য বড় ধাক্কা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট বাতিল করলে ব্যবসায়ী, পর্যটক ও বিনিয়োগকারীদের যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে।

ইউরোপীয় ইনস্টিটিউট অব পিসের উপদেষ্টা ও সংঘাত বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি মনে করেন, হুথিদের হামলা বিমানবন্দরেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; তেল পাইপলাইন ও জ্বালানি অবকাঠামোও তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বেসামরিক বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার দৃশ্যমান প্রভাব এবং জনমনে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া হুথিদের আরও হামলায় উৎসাহিত করতে পারে। সৌদি আরবের কাছ থেকে বাড়তি রাজনৈতিক বা কৌশলগত ছাড় আদায় করাও তাদের লক্ষ্য হতে পারে।

তবে হামলার প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুর পেছনে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে হুথিদের সামরিক পদক্ষেপ, তাদের প্রকাশ্য বক্তব্য এবং যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

সংঘাতের প্রভাব ছড়াতে পারে বিশ্ব অর্থনীতিতে

সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো বা পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে পারে।

বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হলে জ্বালানি পরিবহন ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে গেলে পরিবহন ব্যয় ও বীমা খরচও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব জ্বালানির দাম এবং বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সৌদি আরবের জন্য সংকটটি আরো জটিল, কারণ দেশটি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে পর্যটন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অন্যান্য খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা সেই পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এদিকে রিয়াদে আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত আয়োজন চলার মধ্যেই হামলাগুলো ঘটেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব আয়োজন চালু রেখে স্বাভাবিক পরিস্থিতির বার্তা দিতে চাইলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে কিছু জ্যেষ্ঠ ব্যবসায়ী সরাসরি অংশ নেননি বা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েছেন।

ইয়েমেনে পাল্টা অভিযান, বাড়ছে প্রাণহানি

সৌদি আরবের ওপর হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের ভেতরেও সংঘাত তীব্র হয়েছে। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ এবং আশপাশের এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। সৌদি বিমানবাহিনী হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে। রোববারের সংঘর্ষে উভয় পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৬০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।

তাইজের গভর্নর নাবিল শামসান শহরটিতে হুথিদের অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। ওষুধের সংকটের কারণে জরুরি অস্ত্রোপচার ও নিবিড় পরিচর্যা সেবা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন। হুথিদের দাবি, রোববার সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে ১২৪টি হামলা চালিয়েছে। তবে এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

অন্যদিকে সৌদি আরব হুথিদের সর্বোচ্চ নেতা আবদুল মালিক আল-হুতিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। তার অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ গোয়েন্দা তথ্য সৌদি কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র জড়ালে পাল্টা আঘাতের হুমকি

সংঘাতের বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সৌদি আরবের পক্ষে হুথিদের বিরুদ্ধে হামলায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনার কথা বলেছেন।

এর জবাবে হুথি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিলে ওয়াশিংটনকে দ্রুত ও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও স্থাপনাও হামলার লক্ষ্য হতে পারে।

হুথিদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে কর্মরত ব্যক্তিদেরও এসব এলাকা থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। গোষ্ঠীটি এসব স্থাপনাকে তাদের হামলার বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে বলে দাবি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সংঘাতটি ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। তবে ওয়াশিংটন কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তের তথ্য নেই।

মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে ইরান

সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও চলছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে কথা বলেছেন। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে তেহরান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে পারে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের সমর্থন দিয়ে আসছে। ফলে গোষ্ঠীটির সঙ্গে তেহরানের যোগাযোগকে সম্ভাব্য সমঝোতার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। হুথি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য আল-বুখাইতির দাবি, সৌদি আরব ইরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছিল এবং প্রথমে এক মাস, পরে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে হুথিরা উভয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

আল-বুখাইতির বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সংঘাত আগের লড়াইগুলোর মতো নয় এবং পরিস্থিতি বদলে গেছে। তার দাবি, সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে রিয়াদ ও সানার মধ্যে বিস্তৃত সমঝোতা প্রয়োজন। অন্যথায় সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ক্ষয়ক্ষতি তত বাড়বে। এদিকে মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে হুথিদের বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

দক্ষিণ ইয়েমেনের শক্তিগুলোও সক্রিয় হচ্ছে

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) নির্বাসিত নেতা আইদারুস আল-জুবাইদি দক্ষিণাঞ্চলের বাহিনীগুলোকে শুধু সাবেক দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমান্ত রক্ষায় নয়, বরং সব ফ্রন্টে লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ-স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার হুথিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে পুরো দেশ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য সামনে আনার পর তার এই বক্তব্য এসেছে। সৌদি আরবও ওই সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে।

এসটিসি এমন একটি স্বাধীন দক্ষিণ ইয়েমেন প্রতিষ্ঠার পক্ষে, যা ১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান পৃথক রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার সমতুল্য হবে। শীতল যুদ্ধের অবসানের পর ইয়েমেন একীভূত হলেও সম্পদ বণ্টন ও রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়ে গেছে। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যেও কর্তৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হলেও ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা, ইয়েমেনে পাল্টা সামরিক অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে হুথিদের হুমকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে রিয়াদকে নিজেদের আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে ইয়েমেনের সংঘাতের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হচ্ছে। কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল না হলে সংঘাতের বিস্তার, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন আরো বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন