দিন গড়াচ্ছে আর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইচ্ছাপূরণে ইরান একটি আত্মসমর্পণ নাটকের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে তথাকথিত যুদ্ধজয় উদ্যাপনের সুযোগ করে দেবে তার কোনো সম্ভাবনাই নেই। হামলা-পাল্টা হামলা জোরদারের পাশাপাশি যুদ্ধের ভয়াবহতা দিনে দিনে বাড়ছে।
ইরানের সরকার বদলের পাশাপাশি পরমাণু প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছে খোদ মার্কিন সমরবিদরা। এমনই এক জটিল পরিস্থিতিতে ইরানে স্থল অভিযানের কথা বিবেচনা করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এনবিসিসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ট্রাম্পের প্রবল ঝুঁকিপূর্ণ এই পরিকল্পনাটি প্রকাশ করেছে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে এখনো কোনো প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়া হয়নি। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্টের টেবিলে সব অপশনই রাখা হয়েছে। এদিকে ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছেÑ ট্রাম্প ইরানে স্থল অভিযানের সিদ্ধান্তটা নিকÑ আমরা এটার জন্যই অপেক্ষা করছি।
এনবিসি নিউজ এবং দ্য ইনডিপেন্ডেন্টের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সীমিত আকারে হলেও ব্যক্তিগতভাবে ইরানে একটি স্থল অভিযান চালানোর ব্যাপারে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছেন। এছাড়া বড় ধরনের আক্রমণের বদলে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বা কৌশলগত স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে ছোট ছোট সেনাদল পাঠানোর কথা ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ দুজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ইরানের অভ্যন্তরে স্থল সৈন্য মোতায়েন করতে চান। ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে তার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের বাইরে রিপাবলিকান নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ইরানে স্থল সৈন্য মোতায়েনের বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পরিকল্পনার ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, আমরা ভেনিজুয়েলাতে যা করেছি, ইরানের ক্ষেত্রেও তেমন কিছু করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য হলোÑ ইরানের পরমাণু প্রকল্প তথা ইউরেনিয়ামকে নিরাপদ রাখা। একই সঙ্গে ইরানে এমন একটি শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যারা তেল উৎপাদনে আমাদের সহযোগিতা করবে। ওই কর্মকর্তারা আরো জানান, ইরানে স্থল অভিযানের ব্যাপারে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো নির্দেশ দেননি। তবে প্রেসিডেন্টের চিন্তায় স্থল সৈন্য পাঠানোর বিষয়টি জোরালোভাবেই আছে।
এদিকে পেন্টাগনের একাধিক কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করে বলেছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ছয়জন মার্কিন সৈন্য নিহত হয়েছে। বর্তমানে বিমান ও মিসাইল হামলার মধ্যেই যুদ্ধ সীমাবদ্ধ রয়েছে। এখন যদি ইরানে কোনো রকমে মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হয়Ñ তা যুদ্ধের মাত্রা ও পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি মার্কিন বাহিনীর ওপর ঝুঁকির মাত্রাও অনেক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরানে মার্কিন সৈন্য মোতায়েনের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে প্রেসিডেন্টকে। আমাদের সামনে যদি, এমন লক্ষ্যবস্তু থাকে যা একেবারেই ধ্বংস বা হ্রাস করার প্রয়োজন হয়, সে ক্ষেত্রে আপনাকে স্থল অভিযানের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হতেই পারে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জোয়েল রেবার্ন বলেছেন, পরিস্থিতি এমন হতে পারে যে, আপনি আপনার লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ করবেন, এরপর অভিযান শেষ করে আপনি আবার বেরিয়ে যাবেন। তবে এই ধরনের পদক্ষেপ নিশ্চিতভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, ঠিক এই মুহূর্তে স্থল অভিযানের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে তা আমি মনে করি না।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের ইরান প্রোগ্রামের সিনিয়র পরিচালক বেহনাম বেন তালেবলু বলেছেন, ইরানি শাসনব্যবস্থার পতনের ক্ষেত্রে ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ কার্যকর করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কারণ, এখানে সরকার বদলের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু ইস্যুটি যুক্ত রয়েছে। আপনি নিশ্চিয়ই চাইবেন নাÑ ইরান একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের পারমাণবিক বাজারে পরিণত হোক।
ওয়াশিংটনভিত্তিক অন্যতম প্রধান থিংকট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের ইরান স্ট্র্যাটেজি প্রজেক্টের সিনিয়র ফেলো ও পরিচালক নেট সোয়ানসন বলেছেন, ইরান যদি মনে করে তারা যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তার সামরিক বিকল্পগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এই ধরনের পরিস্থিতি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানে স্থল বাহিনী মোতায়েন করতে বা ইরানি শাসনব্যবস্থার বিরোধীদের অস্ত্র সহায়তা দিতে নিশ্চিতভাবে উৎসাহিত করবে। তিনি আরো বলেন, আমার জানামতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে বিরোধীদের অস্ত্র দেওয়ার কথা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছেন।
সম্প্রতি ইরানবিরোধী ছয়টি কুর্দি গোষ্ঠী একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করেছে। এই জোটের প্রধান উদ্দেশ্যÑ ইরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটানো। এই রাজনৈতিক জোটে রয়েছেÑ কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি, কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইরান, কুর্দিস্তান ফ্রি-লাইফ পার্টি, কুর্দিস্তান স্ট্রাগল অরগানাইজেশন অব ইরান, কুর্দিস্তান শ্রমিক সংগঠন কমালা এবং কমালা পার্টি অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তান।
এই গোষ্ঠীগুলোর নেতারা বিবিসিকে বলেছেন, তাদের পরিকল্পনা হলো সীমান্ত পার হয়ে ইরানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা। তারা বলেন, আমাদের ইরানের অভ্যন্তরে প্রবেশের পরিকল্পনা নতুন নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। আমরা এখন ইরানের অভ্যন্তরে যেতে চাই। আমাদের যোদ্ধারা প্রস্তুত রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের যোদ্ধারা অগ্রসর হয়নি। ওই নেতারা আরো বলেন, আমরা আমাদের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে আমাদের সামনে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরা দেখতে চাইÑ ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছে। তা ছাড়া ইরানের যে বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার রয়েছে, তাও ধ্বংস করতে হবে। এটা না হলে আমাদের প্রত্যাশিত অভিযানটি আত্মঘাতী হতে পারে।
উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি জনগণ বিশেষ করে কুর্দিদের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছেÑ কুর্দিদের এই রাজনৈতিক জোট গঠন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনারই অংশ। বিরোধী কুর্দিদের প্রশিক্ষণসহ অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে মার্কিন ও ইসরাইল গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরাসরি যুক্ত রয়েছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক করে তাদের এক গোপন প্রতিবেদনে বলেছে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের আক্রমণ করলেও দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ও ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা সম্ভব না-ও হতে পারে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এই গোপন প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, যুদ্ধ হয়তো সবে শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে পুরোপুরি সরিয়ে দিয়ে দেশটিতে নিজের পছন্দমতো শাসক বসানোর যে পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন তা সফল হতে পারবে কি নাÑ তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম।
এদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময় বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সব অপশন খোলা রাখেন। ইরানে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েন একটি বিকল্প, যা প্রেসিডেন্টের টেবিলে রয়েছে। যদিও এটা এখন পর্যন্ত অভিযানের মূল পরিকল্পনার অংশ নয়।
ইরানে স্থল অভিযান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জন্য মহাবিপর্যয় টেনে আনবে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘছি। তিনি এনবিসি নিউজকে বলেছেন, আমরা চাইÑ তারা এই সিদ্ধান্তটি নিক। আমরা স্থল পথে মার্কিন সেনাদের অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত। তাদের অপেক্ষায় আছি। আমরা সত্যিই তাদের জন্য অপেক্ষা করছি। আমি নিশ্চিতÑ তারা যদি ভুল করেও ওই পথে অগ্রসর হয়, তাহলে তাদের ওপর আমরা মহাবিপর্যয় চাপিয়ে দেব।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

