নেতানিয়াহু যেকারণে ট্রাম্পের ‘ইরান চুক্তি’ ভেঙে দিতে চান

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

নেতানিয়াহু যেকারণে ট্রাম্পের ‘ইরান চুক্তি’ ভেঙে দিতে চান
ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের প্রবেশপথে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এমন কোনো সমঝোতা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য স্বস্তিদায়ক নাও হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক সামি আল-আরিয়ান।

তিনি বলেন, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে, ইরানকে আঞ্চলিকভাবে দুর্বল না করা পর্যন্ত তিনি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধানকে কার্যকর মনে করবেন না।

বিজ্ঞাপন

আরিয়ানের মতে নেতানিয়াহু বিশ্বাস এমন যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটগুলোর পেছনে মূল ভূমিকা রয়েছে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর। এছাড়া গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ কিংবা অন্যান্য ইরানঘনিষ্ঠ শক্তিকে দুর্বল না করে এই অঞ্চলে স্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বিশ্লেষকের ভাষ্য, নেতানিয়াহু এমন একটি আঞ্চলিক বাস্তবতা দেখতে চান যেখানে ইসরাইল হবে প্রধান প্রভাবশালী শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত নিরাপত্তা সহযোগী হিসেবে পাশে থাকবে।

মিডল ইস্ট আইয়ের নিবন্ধে বলা হয়েছে, গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ইরানকে ঘিরে যে সংঘাত চলছে, সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার অংশ। লেখকের মতে, দীর্ঘ সামরিক অভিযান ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরও ইসরাইল এখনো তার প্রত্যাশিত রাজনৈতিক লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি। তবে নেতানিয়াহু এটিকে ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে আরও কঠোর কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখছেন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও আগের তুলনায় বদলে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক বাস্তবতার মুখে রয়েছেন, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিরোধিতা দেশটির ভেতরে ক্রমশ বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের বহু ভোটার বিদেশে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান নিয়ে আগ্রহ হারিয়েছেন।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন—কেন মার্কিন জনগণকে অন্য দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য অর্থনৈতিক ও সামরিক মূল্য দিতে হবে। তাদের মতে, বিদেশি সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পায়, অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যায়।

এ ছাড়া সামনে থাকা মধ্যবর্তী নির্বাচনও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি নতুন কোনো বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং তার নেতিবাচক প্রভাব অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পড়ে, তাহলে কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। এতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের বড় অংশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় সেখানে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

লেখক আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এতে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জামের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।

সামি আল-আরিয়ানের মতে, এসব বাস্তবতা ওয়াশিংটনকে বুঝতে বাধ্য করছে যে শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে সব রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কূটনৈতিক পথই বেশি কার্যকর হতে পারে।

নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যাতে দেশটি তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে বাধ্য হয় এবং আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে আনে। তবে লেখকের মতে, সেই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। একইভাবে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করতে পারেনি বা অঞ্চল থেকে তাদের প্রভাব সম্পূর্ণ সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়নি। ফলে উভয় পক্ষ এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছেছে, যেখানে কেউই পূর্ণ বিজয় নিশ্চিত করতে পারছে না।

এই প্রেক্ষাপটে ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকা এবং নিজস্ব নীতিগত স্বাধীনতা বজায় রাখা। লেখকের মতে, কোনো যুদ্ধবিরতি বা রাজনৈতিক সমঝোতা যদি ইরানকে ধ্বংসের মুখে না ঠেলে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেয়, তাহলে সেটিকে তেহরানের জন্য কৌশলগত সাফল্য হিসেবেই দেখা হবে। আর এই কারণেই এমন সমঝোতা নেতানিয়াহুর জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ ও কূটনৈতিক পক্ষের মাধ্যমে সম্ভাব্য একটি সমঝোতা কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে অন্তত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল করা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি তৈরির মতো বিষয় থাকতে পারে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য রেখে দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

লেখকের মূল্যায়নে, এমন কোনো সমঝোতা কার্যকর হলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। তবে তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক মিত্রদের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হবে না। ফলে এই ধরনের সমঝোতা ইসরাইলের বর্তমান নেতৃত্বের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

সবশেষে সামি আল-আরিয়ান বলেন, মধ্যপ্রাচ্য এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা রয়েছে, অন্যদিকে আরও বড় ও বিধ্বংসী আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তার মতে, শুধুমাত্র সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে কোনো রাষ্ট্র আঞ্চলিক আধিপত্য ধরে রাখতে পারে না। তাই সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার পথ বেছে নেওয়া হলে তা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে উত্তেজনা আরও বাড়লে মধ্যপ্রাচ্য নতুন করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা সংকটে পড়তে পারে।

এমএমআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন