জলবায়ু সংকটে বাংলাদেশের শহরগুলো কতটা প্রস্তুত

জলবায়ু সংকটে বাংলাদেশের শহরগুলো কতটা প্রস্তুত
এআই দ্বারা নির্মিত ছবি।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম দেশ। একসময় জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা মানেই ছিল উপকূলীয় এলাকা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা নদীভাঙনের গল্প। কিন্তু আজ পরিস্থিতি বদলে গেছে। জলবায়ু সংকট এখন শুধু উপকূলের বিষয় নয়, এখন এটি ঢাকার যানজট, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা, সিলেটের আকস্মিক বন্যা, রাজশাহীর তীব্র তাপপ্রবাহ এবং খুলনার লবণাক্ততার মধ্যেও সমানভাবে উপস্থিত। বাংলাদেশের শহরগুলো এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম সারির ভুক্তভোগী। সেজন্য এখন সবার কাছে একটি প্রশ্ন হলো—আমাদের শহরগুলো কি এই সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত?

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। শহরাঞ্চলে কংক্রিটের বিস্তার, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত সবুজ জায়গা কমে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব আরো তীব্র হচ্ছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও তাপমাত্রা স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় বেশি থাকায় শিশু, বয়স্ক এবং খোলা আকাশের নিচে কর্মরত মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। অন্যদিকে কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই বড় শহরগুলোয় জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনা। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল দখল, জলাধার ভরাট এবং পরিকল্পনাহীন নির্মাণকাজের কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হয় না। এর ফলে যানজট, ব্যবসায়িক ক্ষতি, শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং জনদুর্ভোগ বেড়েই চলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যখন স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে, তখন নগর অবকাঠামোকে সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরো বেড়েছে। এ বছরের বর্ষাতেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যায় লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবানসহ বিভিন্ন জেলায় ভারী বর্ষণে প্রাণহানি, ভূমিধস, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা গেছে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, চরম আবহাওয়া আর কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে আমাদের নতুন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসন। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও নদীভাঙনের কারণে অনেক মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন। এই জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসন শহরগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও কর্মসংস্থানের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে সেবার বিস্তার ঘটছে না। ফলে বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলো আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। পরিবেশগত দিক থেকেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। শহরের জলাভূমি ও খোলা স্থান দ্রুত কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে গাছপালা কমে যাওয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বায়ুর মানের অবনতি ঘটছে। নগর পরিকল্পনায় পরিবেশগত ভারসাম্যকে অগ্রাধিকার না দিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে। অবশ্য ইতিবাচক কিছু উদ্যোগও রয়েছে। বিভিন্ন শহরে খাল পুনরুদ্ধার, বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসনে অবকাঠামো নির্মাণ এবং দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তুতির প্রশ্নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নগরের সবুজায়ন। একটি শহরে গাছ শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, বায়ুর মান উন্নত করে এবং বৃষ্টির পানি ধারণে সহায়তা করে। কিন্তু এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর। বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত নগর জলবায়ু পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের শহরগুলোকে জলবায়ু-সহনশীল করে তুলতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রথমত, নগর পরিকল্পনায় জলাভূমি, খাল ও উন্মুক্ত সবুজ স্থান সংরক্ষণকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, গণপরিবহন ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। চতুর্থত, নতুন ভবন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব নকশা ও জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করতে হবে। সবশেষে, নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য অর্জন করতে পারবে না।

জলবায়ু সংকট আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। সেজন্য দুর্যোগের পর ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে আগাম প্রস্তুতি, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিতামূলক বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাই বাংলাদেশের শহরগুলো প্রস্তুত করার কাজ আগামীকাল নয়, শুরু করতে হবে আজই।

লেখক: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন