সৌদিতে কীভাবে এত কার্যকর হামলা চালাচ্ছে হুথিরা

সৌদিতে কীভাবে এত কার্যকর হামলা চালাচ্ছে হুথিরা
ছবি: রয়টার্স

ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী হুথিরা গত সপ্তাহে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও বিশ্বের বৃহত্তম তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর সদর দপ্তরে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্বলতা । একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও তেলনির্ভরতা কমানোর সৌদি পরিকল্পনাও ঝুঁকিতে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সহায়তায় হুথিদের উন্নত অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা-এই তিনটি বিষয় হুথিদের হামলা কার্যকর করে তুলছে।

বিজ্ঞাপন

ইরানের সহায়তায় অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হুথিদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে ইরান। তবে তেহরান জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে হুথিদের অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও লেবাননের হিজবুল্লাহর সদস্যরা প্রথমদিকে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা ও প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়। বর্তমানে স্থানীয় প্রকৌশলী ও প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় হুথিরা নিজেরাই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করছে।

ইরানের সাবেক এক উপদেষ্টার মতে, তেহরান হুথিদের শুধু অস্ত্র দেয়নি; বরং অস্ত্র তৈরির কৌশলও শিখিয়েছে। ফলে ইরান থেকে সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ হলেও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি দুর্বল করা কঠিন হবে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের দাবি, তারা হুথিদের ছোড়া বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে এবং তাদের ১২৭টি অস্ত্রের গুদাম ও উৎক্ষেপণকেন্দ্র ধ্বংস করেছে। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, আঞ্চলিক পক্ষগুলোর সহায়তায় হুথিরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিস্ফোরকবাহী দ্রুতগতির নৌযানসহ উন্নত সামরিক প্রযুক্তি অর্জন করেছে।

অস্ত্রের যন্ত্রাংশ সংগ্রহে বিকল্প উৎস

হুথিদের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, অস্ত্র তৈরির জন্য তারা শুধু ইরানের ওপর নির্ভরশীল নয়। সংঘাতবিষয়ক গবেষণা সংস্থা কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন থেকে পাঠানো যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে মাঝারি পাল্লার উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে হুথিরা। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এ ধরনের একটি চালান জব্দ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন বাণিজ্যিক যন্ত্রাংশের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, সামরিক প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ সহায়তা এবং বাণিজ্যিকভাবে সহজে পাওয়া যায় না—এমন যন্ত্রাংশ সরবরাহে ইরানের ভূমিকা রয়েছে।

অস্ত্রের কার্যকারিতা বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও ব্যবহার করছে হুথিরা । এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক গত মাসে জানিয়েছে, উত্তর ইয়েমেনে সক্রিয় একদল ব্যক্তি তাদের ক্লড এআই সহকারীর সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত রকেট, দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি পাল্লার সম্ভাব্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাইপারসনিক প্রযুক্তিযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্রের সফটওয়্যার তৈরির চেষ্টা করেছে।

ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুত কমেছে

গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে। নিজেদের ঘাঁটি, ইসরাইল ও উপসাগরীয় মিত্রদের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এতে সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ফারজান সাবেতের মতে, সামরিক প্রযুক্তি ও সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দিক থেকে সৌদি আরব এখনো ইসরাইল বা ইউক্রেনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দেশটির বিশাল আয়তনের কারণে আকাশপথে হামলা ঠেকানোও তুলনামূলক কঠিন।

যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় আরো দক্ষ হুথিরা

২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করছে হুথিরা। ২০২২ সালে সংঘাতটি অনিশ্চিত যুদ্ধবিরতিতে গড়ায়। তবে ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের হামলার পর হুথিরা ইসরাইল লক্ষ্য করে রকেট ছোড়া এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হামলা শুরু করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর আঞ্চলিক সংঘাত হুথিদের সামরিক অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নতুন করে তীব্র হওয়ার সময়ের মধ্যে তাদের অস্ত্রের সক্ষমতাও বেড়েছে।

ফারজান সাবেত বলেন, হুথিরা বসে থাকেনি; তারা অস্ত্র সংগ্রহের উৎস বৈচিত্র্যময় করেছে এবং যুদ্ধ পরিচালনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অস্ত্রের প্রযুক্তি আরো উন্নত করেছে।

সব মিলিয়ে, ইরানের প্রযুক্তিগত সহায়তা, বিকল্প উৎস থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, স্থানীয়ভাবে অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ—এই সমন্বিত পরিস্থিতিই হুথিদের হামলাকে আরো কার্যকর করে তুলছে।

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন