উত্তর মেরু শীতল প্রান্ত

উত্তর মেরু শীতল প্রান্ত

পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তর দিকে অবস্থিত বিন্দু (৯০ ডিগ্রি অক্ষাংশ) হলো উত্তর মেরু। এর আরেক নাম সুমেরু। উত্তর মেরুর অবস্থান গ্রিনল্যান্ড থেকে ৭২৫ কিলোমিটার বা ৪৫০ মাইল দূরে। সুমেরুর বিপরীতে পৃথিবীর অপর (দক্ষিণ) প্রান্তে ‘কুমেরু’ নামে আরেকটি মেরু আছে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের যে বিন্দুতে এর ঘুরন্ত অক্ষ পৃষ্ঠতলের সঙ্গে মিলিত হয়, তাকে ‘উত্তর মেরু’ বলে। উত্তর মেরুতে সব দিক দক্ষিণ দিকে নির্দেশিত হয়।

দক্ষিণ মেরু যেখানে একটি বিশাল মহাদেশের কেন্দ্রভাগে অবস্থিত, সেখানে উত্তর মেরুর অবস্থান আর্কটিক মহাসাগরের মধ্যভাগে। মহাসাগরের এই অংশের পানি বছরের অধিকাংশ সময়েই সামুদ্রিক বরফে ঢাকা থাকে। এ কারণে দক্ষিণ মেরুতে সম্ভব হলেও উত্তর মেরুতে কোনো স্থায়ী স্টেশন স্থাপন করা সম্ভব নয়। অবশ্য রাশিয়ার এ অঞ্চলে মনুষ্যবাহী কয়েকটি স্থানান্তরযোগ্য স্টেশন স্থাপন করা হয়েছিল। এর কয়েকটি আবার উত্তর মেরু বা এর খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করে যেতে সমর্থ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

উত্তর মেরুতে সামুদ্রিক গভীরতা ১৩ হাজার ৪১০ ফুট (৪ হাজার ৮৭ মিটার)। এই মেরু থেকে নিকটতম স্থানটির নাম কাফেক্লুবেন দ্বীপ। এই দ্বীপটি গ্রিনল্যান্ডের নিকটতম সমুদ্র উপকূল থেকে ৪৪০ মাইল (৭০০ কিলোমিটার) দূরে অবস্থিত। অবশ্য এই বিন্দুর বেশ কাছে কিছু পাথুরে তীরভূমি রয়েছে।

উত্তর মেরুর দিন ও রাত : উত্তর মেরুতে দুটি মৌসুম—গ্রীষ্মকাল আর শীতকাল। গ্রীষ্মকাল পুরোটাই দিন আর দিনের সংখ্যা ১৮৭। শীতকালের ১৭৮ দিনের পুরোটাই রাত। এ কারণে উত্তর মেরুতে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘড়ির সময় নেই এবং পৃথিবীর মতো কোনো সময় অঞ্চল নেই। তীব্র হিমেল হাওয়া ও বরফের কারণে এখানে কোনো জনবসতি গড়ে ওঠেনি। শীতকালে গড় তাপমাত্রা –৩৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এবং গ্রীষ্মকালে গড় তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এখানকার প্রধান প্রাণী হলো মেরু ভাল্লুক আর বরফের নিচে পানিতে থাকা কিছু মাছ।

অভিযান প্রসঙ্গ : উত্তর মেরু জয়ের ইতিহাস খুবই রোমাঞ্চকর। কিন্তু কে সর্বপ্রথম উত্তর মেরুতে পা রেখেছিলেন, তা নিয়ে এখনো বিভ্রান্তি আছে। ফ্রেডরিক অ্যালবার্ট কুক নামে এক আমেরিকান অভিযাত্রী তার দুজন সহযাত্রী নিয়ে ১৯০৮ সালের ২১ এপ্রিল সর্বপ্রথম উত্তর মেরুতে পা রাখেন বলে দাবি করেন। কিন্তু কুক তার দাবির পক্ষে কোনো সন্তোষজনক প্রমাণ দেখাতে পারেননি বলে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তবে উত্তর মেরুজয়ের কৃতিত্ব যাকে দেওয়া হয়, তিনি হলেন আমেরিকার নেভি ইঞ্জিনিয়ার রবার্ট পিয়েরি। পিয়েরি দাবি করেন, তিনি ১৯০৯ সালের ৬ এপ্রিল সর্বপ্রথম উত্তর মেরুতে পা রাখেন। অবশ্য তার দাবিও বিতর্কিত। কারণ তার যাত্রাপথের প্রাথমিক পর্যায়ে পাঁচজন সহযাত্রী থাকলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে তার সঙ্গে কেউ ছিল না এবং তিনি যে রুট, সময় ও গতিতে উত্তর মেরু পৌঁছার কথা বলেন, তা তার প্রাথমিক সহযাত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না। তবু ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত রবার্ট পিয়েরিকেই সর্বপ্রথম উত্তর মেরুজয়ী ধরা হয়। কিন্তু ওই সালেই ব্রিটিশ অভিযাত্রী ওয়ালি হার্বার্ট চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ঘোষণা করেন, পিয়েরি আর তার দলবল আসলে ভুল তথ্য দিয়েছেন এবং তারা প্রকৃতপক্ষে উত্তর মেরু পৌঁছাননি। এরপর ২০০৫ সালে পিয়েরিকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসেন আরেক ব্রিটিশ অভিযাত্রী টম এভারি। তিনি পিয়েরির বর্ণনা অনুযায়ী রুটে কুকুরবাহী স্লেজে চড়ে যাত্রা শুরু করেন এবং ৩৬ দিন ২২ ঘণ্টা পর তিনি উত্তর মেরু পৌঁছান। এ সময় পিয়েরির বর্ণনাকৃত সময় অপেক্ষা পাঁচ ঘণ্টা কম। কাজেই এভারি ঘোষণা করেন, রবার্ট পিয়েরি আধুনিক দিকনির্দেশনা যন্ত্র ছাড়াই প্রকৃত উত্তর মেরুতে না পৌঁছাতে পারলেও এর সবচেয়ে কাছাকাছি গিয়েছিলেন, তাই তিনিই প্রথম উত্তর মেরুজয়ী।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন