অপরাজিতা! কী অসাধারণ সুন্দর এক নাম! আর নামের মতোই তার অপরূপ সৌন্দর্য। সে যেন সবাইকে হার মানিয়ে দেয় তার রূপ আর সুন্দরের আলোকচ্ছটায়। যেকোনো সৌন্দর্যপিপাসু মানুষ এই ফুলকে ভালোবাসে আর বাড়ির শোভাবর্ধনেও অপরাজিতা ফুল লাগিয়ে থাকেন। সাদা ও বেগুনি রঙের মিশ্রণ এই ফুলকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। এর সৌন্দর্য দেখে থমকে দাঁড়ায় সবাই আর নিমিষেই চোখ ধাঁধিয়ে যায় সবার।
অপরাজিতা ফুলের পুরো অংশই নীল বর্ণের হওয়ায় এটিকে অনেকে নীলকণ্ঠ নামে অভিহিত করে থাকেন। তবে অপরাজিতা সাদা, হালকা নীল ও বেগুনি রঙের হয়ে থাকে। সাধারণত নীল অপরাজিতা বেশি দেখা যায়। অপরাজিতা বহুবর্ষজীবী গুল্ম প্রকৃতির একটি উদ্ভিদ। এর পাতা অনেকটা উপবৃত্তাকার। পাঁচ-সাতটি পাতা একটি ডালে সারিবদ্ধভাবে থাকে। ফুলে অনেক সময় একটি পাঁপড়ি আবার কখনো কখনো দুটি পাঁপড়িও থাকে। এটি এক ধরনের লতানো উদ্ভিদ, যা সাধারণত নীল রঙের হয়ে থাকে, তবে সাদা ও হালকা বেগুনি রঙের অপরাজিতাও দেখা যায়। বীজ অনেকটা মটরের মতো হওয়ায় এর নামকরণ করা হয়েছে Butterfly Pea। সাধারণত জুন-মার্চ মাসে অপরাজিতা গাছে ফুল ও ফল আসে। বীজের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার হয়ে থাকে। অপরাজিতা বাংলাদেশের সব জেলায় বুনো ফুল হিসেবে পরিচিত। উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের তথ্য মতে, ‘অপরাজিতার বৈজ্ঞানিক নাম Clitoria ternatea। অপরাজিতা শুধু সুন্দর ফুলই না, এর রয়েছে বিভিন্ন ভেষজ গুণও। এর মূল মূত্রবর্ধকরূপে কাজ করে। এর পাতার রস লবণের সঙ্গে মিশিয়ে কানে দিলে কানের ব্যথা অনেকটা উপশম হয়। শূল ব্যথায়, গলগণ্ড, ঘন ঘন পেশাব, মেধা বৃদ্ধিতে, স্বরভঙ্গে, শুকনো কাশিতে, খোসপাঁচড়ায় অপরাজিতা দাওয়াই হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। অপরাজিতা ফুলের চা খুব জনপ্রিয় একটি চা। স্বাস্থ্যসচেতনদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে অপরাজিতা ফুলের এই চা। এটি নীল চা নামেও পরিচিত, যা ক্যাফেইনমুক্ত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-সমৃদ্ধ ভেষজ চা, যা হজমে সাহায্য করে, রক্তের শর্করার মাত্রা ও ওজন নিয়ন্ত্রণ করে। শরীরে জ্বালাপোড়া কমায়, অ্যাজমা প্রতিরোধে সহায়ক। তাছাড়া অপরাজিতা চা রক্তনালিকে শিথিল করে, যা রক্তচাপ কমাতে ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে । এই চা লিভারের এনজাইমের মাত্রা সাহায্য করে থাকে। ফলে লিভার সুরক্ষা পায়। অপরাজিতা ফুল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এর থেকে তৈরি নীল চা অ্যালার্জি ফুসকড়ি ও প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। নীল চা মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। মনকে শান্ত করে। ফুল থেকে চা তৈরি করলে চা পান করার সময় পানির রঙ নীল হয়, যা দেখতে মনোমুগ্ধকর। এছাড়া গাছটির বীজ, পাতা, ফুল আর মূল আধুনিক হারবাল আর ইউনানি চিকিৎসায় দারুণ ভূমিকা রাখছে। সবুজপাতার মধ্যে নীল ফুল যেন তার সৌন্দর্য বিলিয়ে দিচ্ছে। অপরাজিতা ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মানুষ এটিকে ব্যালকুনিতে, বারান্দায়, ছাদে ও গেটে লাগিয়ে থাকেন। নীল রঙ পছন্দকারীদের কাছে নীল অপরাজিতার গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অনেক বেশি। এই ফুলের কোনো সুবাস না থাকলেও তার বাহারি রঙ যে কাউকেই খুব সহজেই মুগ্ধ করে।
অপরাজিতার নীলে হারিয়ে গিয়ে রূপসি বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেনÑ
‘আকাশ চলিয়া গেছে কোথায় আকাশে
অপরাজিতার মতো নীল হয়েÑআরো নীল হয়ে
আমি যে দেখিতে চাই।’
নিজেকে অপরাজিতা ভেবে কবি কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছেন,
‘আমি বিজন বনের অপরাজিতা
আমার কথা কহি গানে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

