প্রকৃতিতে শরৎ এসেছে সেই কবে। ভাদ্রের আকাশে তার নীলচে আভাস, মাঠের কিনারে কাশের সাদা শির, বাতাসে শরতের নরম ছোঁয়া। তবু বর্ষা পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। আকাশের মেজাজে তার রেশ রয়েই গেছে। এক মুহূর্তে রোদে ঝলসে ওঠে চারদিক, পরক্ষণেই কোথা থেকে কালো মেঘ এসে সূর্যের মুখ ঢেকে ফেলে। দূরের দিগন্ত প্রথমে ধূসর হয়, তারপর গাঢ় নীল-কালো। বাতাস ভারী হয়ে আসে। গাছের পাতাগুলো উল্টে গিয়ে রুপালি পিঠ দেখায়। পাখিরা হঠাৎ নিচু হয়ে উড়ে। তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আকাশ ভেঙে নামতে থাকে বৃষ্টি।
ভাদ্র মাসে শরৎ নরম পায়ের মৃদু শব্দে হেঁটে বেড়ায়। ভোরের আলোয় আকাশের নীল একটু একটু করে স্বচ্ছ হয়। সকালের বাতাসে বর্ষার স্যাঁতসেঁতে গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকে অচেনা এক নির্মলতা। মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের সেই চিরচেনা পঙ্ক্তি—
‘আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে
কী জানি পরান কী যে চায়।’
সত্যিই তো, শরতের এই আলোয় মানুষের মনও কি একটু বদলে যায় না? কোনো কারণ ছাড়াই মন কেমন উদাস হয়ে থাকে। মনে হয়, কোথাও যেতে হবে; অথচ কোথায়? তা জানা নেই। কোনো অচেনা সৌন্দর্যের দিকে মন ছুটে যেতে চায়।
রোদের ফাঁকে কাপড় মেলে দিয়ে ঘরে ফিরতে না ফিরতেই ঝমঝম বৃষ্টিতে ছাদ ভরে যায়। টিনের চালে বৃষ্টির আঘাত একটানা তীব্র হয়ে বেজে ওঠে। আম, কাঁঠাল, শিরীষের পাতায় জল ছিটকে পড়ে। উঠোনের ধুলো মুহূর্তে কাদায় গলে যায়। জানালার ওপারে বৃষ্টির পর্দা নামে। তার ভেতর দিয়ে গাছগুলো আবছা, ঘরগুলো মলিন, পথগুলো যেন হঠাৎ কোথাও হারিয়ে যায়।
বৃষ্টির শব্দের ভেতর তখন পৃথিবীকে অন্যরকম মনে হয়। চারপাশের পরিচিত শব্দগুলো থেমে যায়; শুধু বৃষ্টি কথা বলে। কখনো টিনের চালে, কখনো পাতার ওপর, কখনো মাটির বুকে। মাটির বুক থেকে উঠে আসে সেই গভীর, কাঁচা গন্ধ, ভেজা পৃথিবীর নিজস্ব ঘ্রাণ। সেই গন্ধে কত পুরোনো বিকাল, কত হারিয়ে যাওয়া উঠোন, কত শৈশবের স্মৃতি যেন একসঙ্গে ফিরে আসে।
বৃষ্টি থামলে দৃশ্যটি আবার বদলে যায়। পাতার ডগায় স্বচ্ছ জলবিন্দু কাঁপতে থাকে। কোথাও টুপ করে পড়ে, কোথাও আরেকটি পাতায় গড়িয়ে যায়। ভেজা ঘাসের ওপর নরম আলো পড়ে। দূরের মাঠে জমে থাকা পানিতে আকাশের ছেঁড়া নীল ভেসে থাকে। কাশবনের সাদা ফুলগুলো বাতাসে একসঙ্গে দুলে ওঠে—মনে হয়, মাটির ওপর ছোট ছোট ঢেউ উঠেছে।
আর তখনই শরৎকে সবচেয়ে কাছের মনে হয়।
কোথাও শেফালি ফুটেছে কি না, জানি না; তবু মনে হয়, বাতাসের ভেতর তার গন্ধ লুকিয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের গানটি যেন সেই মুহূর্তে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
‘ওই শেফালির শাখে
কী বলিয়া ডাকে বিহগ বিহগী
কী যে গায় গো।’
খোলা মাঠে বসে আকাশ দেখতে ভালো লাগে। বিলের ধারে বসলে আরো ভালো লাগে। বর্ষার পানি এখনো অনেকটা জমে আছে। তার ওপর মেঘের ছায়া ধীরে ধীরে সরে যায়। কোথাও শাপলার পাতা, কোথাও জলের বুক চিরে ওঠা ছোট মাছের বৃত্তাকার ঢেউ। দূরে কোথাও কাদামাটির বাঁধ, তার ওপারে তালগাছের সরু কালো অবয়ব। বাতাস এলে বিলের পানি কেঁপে ওঠে, আর সেই কাঁপুনিতে ভেঙে যায় আকাশের প্রতিবিম্ব।
সেই মুহূর্তে মনে হয়, প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকা আসলে নিজের মনের ভেতরে তাকিয়ে থাকা। এই মেঘ, এই বৃষ্টি, এই হঠাৎ রোদ—সবকিছুর মধ্যেই মানুষের মনের কোনো না কোনো ছায়া লুকিয়ে থাকে। কখনো মনও তো এমন হয়; একটু আলোয় ভরা, পরক্ষণেই মেঘে ঢাকা। আবার কোনো এক অজানা হাওয়ায় সেই মেঘ সরে যায়, আলো আসে।
নদীর পাড়ের দৃশ্য আরো বিস্তৃত। স্রোতের ওপর ভাঙা রোদের টুকরো ছুটে বেড়ায়। দূরে একটি নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়; তার পেছনে জলের শরীরে দীর্ঘ দাগ কেটে থাকে। ওপারের চর কুয়াশার মতো আবছা। কোনো অচেনা পাখি ডেকে ওঠে। বাতাসে কাশের গন্ধ, কাদার গন্ধ, জলের সোঁদা গন্ধ মিশে থাকে।
তখন মনে হয়,
‘আজি মধুর বাতাসে হৃদয় উদাসে,
রহে না আবাসে মন হায়
কোন কুসুমের আশে কোন ফুলবাসে
সুনীল আকাশে মন ধায় গো।’
ভাদ্র-প্রকৃতি এমনই। স্থির নয়, অথচ অপূর্ব; একসঙ্গে বর্ষার বিদায় আর শরতের আগমন বহন করে। রোদ তার শরীরে আগুন জ্বালে, মেঘ এসে সেই আগুন ঢেকে দেয়; বৃষ্টি মাটিকে ভিজিয়ে দেয়, আবার সেই ভেজা মাটির বুকেই জন্ম নেয় নতুন সবুজ।
শরৎ তাই শুধু নির্মেঘ নীল আকাশের ঋতু নয়। শরৎ কখনো আসে বর্ষার ভেজা হাত ধরে, কখনো কালো মেঘের ফাঁক গলে, কখনো কাশফুলের সাদা দোলায়। ভাদ্রের এই ভেজা-রৌদ্রোজ্জ্বল দিনগুলোতেও সে নিঃশব্দে নিজের আগমন লিখে যায় কাশফুলের সাদা অক্ষরে, শেফালির গন্ধে, ভেজা মাটির ঘ্রাণে, বিলের জলে কেঁপে ওঠা আকাশে।
আর মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে সেই আগমনের সামনে—কখনো মাঠের ধারে, কখনো নদীর পাড়ে, কখনো জানালার পাশে। কোনো উত্তর খোঁজে না। শুধু দেখে ও শোনে। আর অকারণেই মনে হয়, প্রকৃতি যখন ঋতু বদলায়, মানুষের মনেও যেন অদৃশ্য কারণে ঋতু বদলে যায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

