মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ইসরাইলের স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ইসরাইলের স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ
ছবি : রয়টার্স

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটা এবং দেশটির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে দমন করতে ব্যর্থ হওয়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিয়ে ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্ধারণ করেছিলেন, তা কার্যত ভেস্তে গেছে।

বিজ্ঞাপন

গত ২৫ বছরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নানা সামরিক হস্তক্ষেপের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ পরিস্থিতিকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো পরিস্থিতি এখানে ঘটেনি, বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা নসাৎ করে টিকে গেছে। মূলত অব্রাহাম অ্যাকর্ডসের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে এবং সৌদি আরব চুক্তি স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।

ট্রাম্পের নীতি পরিবর্তন নেতানিয়াহুর বিপর্যয়

ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসেবে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহুর জন্য বড় বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য এই যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে সরে আসা ছিল রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিং ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমে গেছে এবং নিজের দলের ভেতরেই তিনি বিরোধিতার মুখে পড়েছেন। এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্থবিরতা ট্রাম্প পরিবারের ওপরও আর্থিক প্রভাব ফেলছিল। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় ট্রাম্প দ্রুত একটি ভেনেজুয়েলা-শৈলীর বিজয় চেয়েছিলেন, কিন্তু ইরান সহজে আত্মসমর্পণ না করায় তিনি এই পথ থেকে সরে আসেন।

ইসরাইলের ভেতরেও এই চুক্তি নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। চ্যানেল ১৩-এর সামরিক সংবাদদাতা অ্যালন বেন ডেভিড জানিয়েছেন, এই যুদ্ধের পর অঞ্চলটিতে মার্কিন সমর্থনে ইসরাইল শীর্ষ সামরিক শক্তি থাকার বদলে ইরান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে হিলারি হারেৎজের সামরিক বিশ্লেষক আমোস হারেল লিখেছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার পর ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের এই চুক্তি নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা।

ফ্রান্সে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইসরাইলের কোনো অস্তিত্ব থাকত না এবং চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র দুই ঘণ্টা আগে বৈরুতে ইসরাইলি হামলার ঘটনাটি তিনি পছন্দ করেননি।

ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূমিকায় ইসরাইলি নীতি নির্ধারকদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। উগ্র-ডানপন্থি এবং বিরোধী দলগুলো এখন ইসরাইলকে ‘এককভাবে’ চলার আহ্বান জানাচ্ছে।

বিরোধীদলীয় নেতা আভিগডোর লিবারম্যান ইসরায়েলকে একটি ব্যালিস্টিক মিসাইল ফোর্স তৈরি এবং মোসাদকে ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতে একক মনোযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

এমনকি নেতানিয়াহুর মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক ইয়িনন মাগাল মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনার এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

কৌশলগত পরিবর্তন ওয়াশিংটনে প্রভাব

গাজা, দক্ষিণ লেবানন এবং সিরিয়ায় ইসরাইলের দখলকৃত ভূমি এবং আবুধাবির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা চুক্তি টিকে থাকলেও, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন হারানো নেতানিয়াহুর জন্য বড় ক্ষতি। ওয়াশিংটনে ইসরাইলের সামরিক মিত্র হিসেবে নির্ভরযোগ্যতা হ্রাস পেয়েছে এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে আইপ্যাক-এর মতো ইসরাইলি লবিং গ্রুপগুলোর গ্রহণযোগ্যতা কমছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইসরাইলি লবি মার্কিন কংগ্রেসে ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট (এনডিএএ) এবং ইন্টেলিজেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট (আইএএ)-এর মাধ্যমে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিমালার সঙ্গে স্থায়ীভাবে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, যাতে কংগ্রেসকে বাইপাস করে অস্ত্র সরবরাহ বজায় রাখা যায়।

আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে ইরানের উত্থান

এই চুক্তির ফলে ইরান একটি প্রধান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগ করলেও ইরান তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান বজায় রেখেছে। আইএইএ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ইরানের কোনো পারমাণবিক বোমা তৈরির কর্মসূচি ছিল না। একই সঙ্গে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বহর মার্কিন বাহিনীর সবচেয়ে ভারী ও নিখুঁত হামলা থেকেও সুরক্ষিত থেকেছে, যা একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং অঞ্চলের অন্যান্য অ-রাষ্ট্রীয় মিত্রদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আরো জোরদার হয়েছে। যুদ্ধের ফলে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা (জিসিসি) কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছে এবং আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও কাতারের মতো দেশগুলো এখন ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করে চলার নীতি বেছে নিচ্ছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই ইরানের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

গাজা পরিস্থিতি ভবিষ্যৎ

আঞ্চলিক ক্ষেত্রে ধাক্কা খাওয়ার পর নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা আরো জোরদার করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল পুরো গাজা পুনর্দখল করলেও হামাস বা হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণ মেনে নেবে না। গাজার সামাজিক কাঠামো সমস্ত নিপীড়ন সত্ত্বেও ভেঙে পড়েনি। নেতানিয়াহু যদি গাজায় পুনরায় আক্রমণ চালান, তবে বিশ্বজুড়ে ইসরাইলি পণ্য ও ব্যবসা বর্জনের ডাক তীব্র হবে, যা ইসরাইলের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করা কঠিন হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের এই সম্প্রসারণবাদী নীতি শেষ পর্যন্ত তাদের সামরিক ক্ষমতার সীমানায় পৌঁছে দিয়েছে এবং এটি ইসরাইলের জন্য একটি বড় ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন