রাজনৈতিক সংঘাতমুক্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এজন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন এবং নির্বাচনে সহযোগিতার বিষয়ে তাদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার আদায় করতে চায়।
এই কৌশল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়ে সফলভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করায় ইসি এবারও একই পথ বেছে নিয়েছে। ইসির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
জানতে চাইলে ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ আমার দেশকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসির সংলাপ চলমান রয়েছে এবং মঙ্গলবার জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। তবে অন্য দলগুলোর সঙ্গে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন ইস্যুতে সংলাপ হবে কি না—সেটি সম্পূর্ণ কমিশনের সিদ্ধান্ত। তিনি উল্লেখ করেন, এ মুহূর্তে পাঁচ সদস্যের কমিশনের দুজন ছাড়া বাকিরা সফরে রয়েছেন।
ইসি সূত্র জানায়, কমিশন এ মুহূর্তে তফসিল ঘোষণার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। অলস বসে না থেকে কাজের মধ্যে থাকাকে শ্রেয় মনে করেই কমিশন সংক্ষিপ্ত নোটিসে সংলাপের এই উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে এ তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে ইসির দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, তখন হঠাৎ সংলাপকে সামনে আনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ রয়েছে। স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হলেও এতে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনীত প্রার্থীরাই অংশ নেন। অনেক ক্ষেত্রে একই দল থেকে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় এবং সমর্থনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র দ্বন্দ্ব ও সংঘাত তৈরি হয়, যা অনেক সময় জাতীয় নির্বাচনের সহিংসতাকেও ছাড়িয়ে যায়। ফলে সংলাপের মাধ্যমে নিবন্ধিত দলগুলোর সঙ্গে বসে অনৈক্যের জায়গাগুলো চিহ্নিত করে দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারলে তা ইসির জন্য সুফল বয়ে আনবে।
শুধু রাজনৈতিক দলই নয়, প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী, প্রশাসন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার, আমলা, এনজিও, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং শিক্ষকদের সঙ্গেও সংলাপ করার কথা ভাবছে ইসি।
সূত্র জানায়, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের জন্য কমিশনে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী জোটবদ্ধভাবে বড় ও ছোট দলে বিভক্ত করে, কিংবা এককভাবে প্রতিটি দলের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করা হতে পারে। এককভাবে সংলাপ করতে ১৩ দিন, জোটগতভাবে ৬-৭ দিন এবং সমমনা ও বিপরীতমুখী দলগুলোকে নিয়ে একদিনে (সকাল-বিকাল) এ কার্যক্রম শেষ করা সম্ভব। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমমনা দলগুলোকে এ সংলাপে আমন্ত্রণ নাও জানানো হতে পারে।
এ সংলাপে স্থানীয় সরকারের সবস্তরের (সিটি করপোরেশন, জেলা ও উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা) চূড়ান্ত আচরণবিধিমালা এবং সংশ্লিষ্ট আইনগুলো পর্যালোচনা করা হতে পারে। যেমন—এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের লাভজনক পদে বিবেচনা করে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার বিষয়টি স্থানীয় সরকারের আইনে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও জাতীয় সংসদের মূল আইনে এই বিধান নেই। এ নিয়ে সংসদের বিরোধী দল ও ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে আপত্তি রয়েছে।
ইসির এক কর্মকর্তা জানান, সংলাপের আলোচনার ভিত্তিতে এ ধারাটি বাদ দেওয়া হতে পারে। তবে প্রধান উদ্দেশ্য হলো সংঘাতমুক্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নেওয়া।
সিনিয়র সচিব সংলাপে কিছু অনিশ্চয়তার কথা জানালেও নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ভিন্ন আশাবাদের কথা জানান। আমার দেশকে তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচনের পর কমিশন এবার তুলনামূলক বড় পরিসরে নির্বাচন করতে যাচ্ছে, যেখানে সংলাপের মাধ্যমে সবার চাওয়া-পাওয়া স্পষ্ট হবে। কোনো আলোচনাই কখনো বিফলে যায় না। দলীয় ফোরাম থেকে যদি নির্বাচনি আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়, তবে মাঠে থাকা প্রার্থীরাও তা আমলে নেবেন। এর মাধ্যমে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনও সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। সময়স্বল্পতার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একদিনের মধ্যেই সংলাপ শেষ করা হতে পারে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, সাবেক কমিশন, কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বসার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি মাসের শেষদিকে এই সংলাপ আয়োজনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা—এ দুটি নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকারের ভোট শুরু হতে পারে। অক্টোবরের শেষদিকে অথবা নভেম্বরের শুরুতে তফসিল ঘোষণা করে ডিসেম্বরে ভোট গ্রহণের সময় নির্ধারণ করা হতে পারে, যাতে স্কুল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর প্রার্থীরা পুরোদমে প্রচারে নামতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় কোনো বিঘ্ন না ঘটে। এর আগে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ, অর্থ বিভাগ ও ইসির মধ্যে শিগগির সমন্বয় সভা হওয়ার কথা রয়েছে।
বর্তমানে দেশে ৪,৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে, যার মধ্যে চলতি বছরে ৩,৯৮১টি নির্বাচন উপযোগী হবে। বাকিগুলোতে নির্বাচন হবে ২০২৭ ও ২০২৮ সালে। দেশের ৩৩০ পৌরসভার মধ্যে ৩২০টি নির্বাচন উপযোগী হলেও আইনি জটিলতার কারণে ১০টিতে ভোট আটকে আছে। এছাড়া নতুন পাঁচটিসহ দেশে মোট ৫০০টি উপজেলা রয়েছে এবং সবগুলোই বর্তমানে নির্বাচন উপযোগী।
সম্প্রতি গঠিত নতুন উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে—বগুড়ার শিবগঞ্জ ভেঙে মোকামতলা, কক্সবাজারের চকরিয়া ভেঙে মাতামুহুরী, ঠাকুরগাঁও সদর ভেঙে রুহিয়া ও ভুল্লী এবং লক্ষ্মীপুর সদর ভেঙে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা।
অন্যদিকে নতুন বগুড়া সিটি করপোরেশনসহ দেশে মোট সিটি করপোরেশন ১৩টি। যার সবগুলোই এখন নির্বাচন উপযোগী। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ বাদে অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানই প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


