দ্বিগুণেরও বেশি দামে এলএনজি আমদানি

দ্বিগুণেরও বেশি দামে এলএনজি আমদানি
আমার দেশ গ্রাফিক্স

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণের বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে স্পট মার্কেট থেকে সরকার প্রতি মেট্রিক মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি ১০-১২ ডলারে কিনত। কিন্তু বর্তমানে কিনতে হচ্ছে ২৪ ডলারেরও বেশি দরে। ফলে ৪১০-৪৯০ কোটি টাকার প্রতি কার্গো এলএনজির দাম এখন পড়ছে হাজার কোটি টাকার ওপরে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানি করতেই সরকারের ব্যয় ৯০ হাজার কোটি থেকে এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারে সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য থেকে বাড়তি দামে দুই কার্গো এলএনজি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। গত ২৪ আগস্ট ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে খোলাবাজার থেকে এই এলএনজি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি পসকো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন থেকে কেনা হচ্ছে এক কার্গো এলএনজি । এজন্য দাম চূড়ান্ত হয়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪.৬২৫ ডলার। যুক্তরাজ্যের কোম্পানি টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে কেনা হচ্ছে আরো এক কার্গো এলএনজি। এই এলএনজির দাম পড়ছে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪.২৫ ডলার। এতে প্রতি কার্গোর পেছনে ব্যয় হচ্ছে এক হাজার ১৩ কোটি টাকা। যেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতির আগে স্পট মার্কেটে প্রতি কার্গোর স্বাভাবিক দাম ছিল ৪১০-৪৯০ কোটি টাকা। এ দুই কার্গো এলএনজি সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে দেশে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আগস্টের শুরুতে সিঙ্গাপুরের আরামকো ট্রেডিং থেকে ২১.৫৫ ডলার দরে এক কার্গো, বিপি সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে ২১.৮৭৮ ও ২১.৭৭৮ ডলার দরে দুই কার্গো এবং ১৯ আগস্ট আরামকো ট্রেডিংয়ের কাছ থেকে ২৩.৯৩ ডলার দরে আরো এক কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছিল।

বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথম এলএনজি আমদানি শুরু করে। তার আগে দেশে উৎপাদিত গ্যাস থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন

করা হতো। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৩ কার্গো এলএনজি আমদানি বাবদ ব্যয় হয় ১৮ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে এলএনজি বাবদ সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ২,৫০০ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ৪০ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানির পরিমাণ এক কার্গো কমলেও ব্যয় হয় আগের বছরের দ্বিগুণ, তথা ৪০ হাজার কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪০ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আমদানি করা হয় ৪৪ কার্গো এলএনজি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি হয় ৩৯ কার্গো এবং ব্যয় হয় ৩৫ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪০ কার্গো এলএনজির আমদানি ব্যয় পড়ে ৪২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায় এলএনজি আমদানি। সে বছর ৮৬ কার্গো এলএনজি আমদানির জন্য সরকারকে ব্যয় করতে হয় ৪০ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। আর সদ্যবিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১০৯-১১৩ কার্গো এলএনজির আমদানিতে ব্যয় হয় ৫৯ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা। এ বছর এলএনজির পেছনে সরকারকে ভর্তুকি গুনতে হয় ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

২০২৬ সালের বার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে মোট ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল জাতীয় বাজেটে সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেটে এলএনজি আমদানির জন্য প্রাথমিক ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয় ৬,৫০০ কোটি টাকা। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে অর্থবছরের প্রথম দেড় মাসেই বার্ষিক ভর্তুকি বরাদ্দের ৪৩ শতাংশ অর্থ শেষ হয়ে গেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় শীর্ষ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি অনিবার্য পরিস্থিতি ঘোষণা করে তাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রায় অর্ধেক সরবরাহ কমিয়ে দেয় । জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কাতার থেকে আটটি কার্গো এসেছিল। এরপর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ব্যাহত হওয়ায় সরকার স্পট মার্কেট থেকে জরুরি ভিত্তিতে কার্গো কেনা শুরু করে। যেমন—চলতি আগস্ট মাসেই গ্রিডে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ৯টি কার্গো আনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে বছরের প্রথম আট মাসে ৪০-৫০টির মতো এলএনজিভর্তি কার্গো দেশে এসে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান গতকাল আমার দেশকে বলেন, চলতি বছর ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও প্রকৃত আমদানি কিছুটা কম হতে পারে। কারণ, ভাসমান টার্মিনালগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। ইতোমধ্যে নানাবিধ কারণে সেগুলোর উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ১৫ কার্গো এলএনজি আমদানি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এলএনজি আমদানির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও যখন যে অর্থের প্রয়োজন হবে, যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয় সে অর্থ ছাড় করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জ্বালানি খাতে বিদ্যমান সংকট বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে বলে মতপ্রকাশ করেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা।

গত ১৭ বছরে জ্বালানি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশকে আমদানিনির্ভর করা হয়েছে মন্তব্য করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম আমার দেশকে বলেন, আমরা যদি নিজস্ব গ্যাসকূপ থেকে পর্যাপ্ত উত্তোলন করতাম, তবে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে এত এলএনজি আমদানি করতে হতো না।

ভৌগোলিকভাবেই বাংলাদেশ খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ দাবি করে তিনি বলেন, আমাদের মাটির নিচে প্রচুর তেল-গ্যাস মজুত আছে। কিন্তু বিদায়ী সরকার সেগুলো অনুসন্ধান বা উত্তোলন না করে আমদানির দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। দেশের বিজ্ঞানীদের বসিয়ে রেখে তেল-গ্যাস আমদানি করে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা নষ্ট করেছে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আর কখনো এমন জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে না চাইলে এখনই তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। সমতলে অনুসন্ধানে দেশি বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, গভীর সমুদ্রে যেহেতু আমাদের তেমন অভিজ্ঞতা নেই, সেখানে অনুসন্ধানের জন্য বিদেশিদের কাজে লাগানো যেতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন