আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

অসুস্থতা ও নিরাশার মধ্যে গাজার শরণার্থী জীবন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অসুস্থতা ও নিরাশার মধ্যে গাজার শরণার্থী জীবন
ছবি: সংগৃহীত

গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন শুরুর পর ১৭ বারের বেশি বাস্তুচ্যুত হয় আবু আমর পরিবার। প্রতিটি নতুন বাসস্থান পরিবর্তনেই তাদের সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে। বর্তমানে গাজা শহরের রিমাল অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আবর্জনার স্তূপের পাশে তাঁবুতে বাস করছেন তারা। দূষণ, অসুস্থতা ও অসম্মানের বিরুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে থাকাই এখন তাদের দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উত্তর গাজার বাইত লাহিয়ার বাসিন্দা ছিলেন তারা। ইসরাইলি হামলায় সেখান থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে গাজা শহরে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। পরিবারের সদস্য ৬৪ বছর বয়সি সায়াদা আবু আমর বলেন, ‘আমরা সব সময় বলছি, দুটি যুদ্ধ থেকে আমরা বেঁচে ফিরেছি। একটি বোমা বর্ষণের মাধ্যমে হত্যা করছে, আরেকটি আবর্জনা থেকে মৃত্যু ঘটাচ্ছে। আমি হাঁপানির রোগী এবং সব সময় আমাকে ইনহেলার ব্যবহার করতে হয়। রাতে বালিশের নিচেই তা রেখে দিই। আবর্জনার গন্ধে যখন আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, তখন এটি বারবার ব্যবহার করি।’

বিজ্ঞাপন

সায়াদার পুত্রবধূ সুরাইয়া আবু আমর জানান, মৌলিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। ৩৫ বছর বয়সি পাঁচ সন্তানের এ মা আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমরা পরিচ্ছন্নতার সরঞ্জাম ব্যবহার করছি কিন্তু সবকিছুই পরিচ্ছন্নতায় খরচ করতে পারছি না। আবর্জনার পাশে থেকে জিনিসপত্র পুরোপুরি পরিষ্কারও হয় না, বিশেষ করে পানিস্বল্পতার মধ্যে। মাসের মধ্যে কয়েকবারই আমরা গ্যাস্ট্রিকে আক্রান্ত হই।’

তিনি বলেন, ‘একবার গ্যাস্ট্রিকের ব্যথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণায় পড়েছিলাম। আমাকে হাসপাতালে বলা হয়েছে, অপরিচ্ছন্ন পয়ঃনিষ্কাশনের কারণে এ অবস্থা হয়েছে।’

সুরাইয়া জানান, কীভাবে বহু লোকের সঙ্গে একই টয়লেট ব্যবহার করতে তিনি বাধ্য হয়েছেন।

কিন্তু তাদের অবস্থা কখনোই এ ধরনের ছিল না। সুরাইয়া জানান, যুদ্ধের শুরুতে তার জীবনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ছিল মৌলিক বিষয়। তিনি বলেন, ‘দিনের মধ্যে কয়েক দফা আমি আমার ঘর পরিষ্কার করতাম। যুদ্ধের আগে পরিচ্ছন্নতা ছিল আমার আসক্তির পর্যায়ের। কখনো কল্পনাও করিনি এ দুঃস্বপ্নের মধ্যে আমাকে জীবন-যাপন করতে হবে।’

গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন এ জনপদের বাসিন্দাদের ওপর আতঙ্ক সৃষ্টিকারী প্রভাব ফেলেছে। দুই বছরের বেশি আগ্রাসনে ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার সব স্থাপনাই হয় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, না হয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের মতে, গাজাকে বসবাসের অযোগ্য করতেই এ ধরনের ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হয়েছে।

এর ফলে গাজার ফিলিস্তিনিদের কাছে সবকিছুর বদলে বেঁচে থাকাটাই এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে। সুরাইয়ার স্বামী ৪০ বছর বয়সি সালেম জানান, হতাশা থেকেই তারা আবর্জনার স্তূপের পাশে অবস্থান নিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সন্তানরা শীত ও গ্রীষ্মে এর জন্য প্রচণ্ড দুর্ভোগে পড়েছে। খাবার খাওয়ার সময় যখন আবর্জনার দুর্গন্ধ আসে, আমরা খেতে পারি না। মনে হয় বমি করে দেই। পতঙ্গ ও মশার কারণে আমাদের দুর্ভোগ হয়। আমার দুই সপ্তাহ বয়সি মেয়ে সাবার মুখ মশার কামড়ে ভরে গেছে।’

সালেম জানান, ঝড় হলে প্রায়ই পয়ঃনিষ্কাশনের পানি তাঁবুর ভেতরে ঢুকে যায়। তিনি বলেন, ‘ঝড়ের সময় ময়লা পানি তাঁবুতে ঢুকে পড়ে এবং কখনো কখনো তাতে আমাদের কাপড় ভিজে যায়। আমাদের পরিচ্ছন্ন অতিরিক্ত পোশাক নেই। বাইত লাহিয়ার বাড়ি থেকে কোনো কাপড় ছাড়াই আমরা এখানে এসেছি। ময়লা কাপড়েই আমাকে নামাজ পড়তে হয়। আমার আর কোনো উপায় নেই। অর্থ নেই, পানি নেই আবার শীত হওয়ায় কাপড় শুকাতেও দিন চলে যায়।’

আমেরিকার মধ্যস্থতায় বর্তমানে গাজায় দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতির প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু বিধ্বস্ত উপত্যকাটিতে পুনর্নির্মাণের কাছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এখনো বাধা দিয়ে আসছে। এর ফলে বিশেষ করে পুরো উপত্যকায় পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার শঙ্কা করছেন ফিলিস্তিনিরা। তারা মনে করছেন, শিগগিরই তাদের জীবনে পরিবর্তন আসছে না। অপরিচ্ছন্ন অবস্থাতেই তাদের থাকতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...