এই মুহূর্তে কেন ইসরাইলে হামলা চালাল ইরান

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

এই মুহূর্তে কেন ইসরাইলে হামলা চালাল ইরান
সোমবার ভোরে উত্তর ইসরাইলে এসে পড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রের অংশবিশেষ। ছবি: রয়টার্স

লেবাননে ইসরাইলি হামলার জবাবে তেহরানের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপকে প্রথম দেখায় একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ মনে হতে পারে, যা একটি বিধ্বংসী আঞ্চলিক যুদ্ধকে আবারও উসকে দিতে পারে। তবে ইরানের জন্য এসব হামলা ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং এটি দেশটির নতুন শাসকদের একটি আক্রমণাত্মক কৌশলগত পরিবর্তনের অংশ। নতুন এই নেতৃত্বের কাছে যুদ্ধের শিক্ষা হলো—কঠোর প্রতিশোধমূলক অবস্থানই তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করেছে, এমনকি শক্তিশালী শত্রুদের বিরুদ্ধে একধরনের সুবিধাজনক অবস্থান এনে দিয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ফরেন পলিসি থিংক ট্যাংক ডনের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ওমিদ মেমারিয়ান বলেন, ‘ইরান মূলত নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে চায় এবং দেখাতে চায় যে যুদ্ধ পরিস্থিতি বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে। তারা এই বার্তা দিচ্ছে যে প্রয়োজনে তারা আবারও যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত।’

বিজ্ঞাপন

সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অধীনে গত এক দশকে তেহরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলে হামলার ক্ষেত্রে বেশ সতর্ক ছিল। ২০২০ সালে মার্কিন হামলায় শীর্ষ সামরিক নেতা কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর ইরান খুবই সীমিত প্রতিশোধ নিয়েছিল। এমনকি গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধেও তাদের প্রতিশোধ ছিল কাতারে অবস্থিত একটি মাত্র মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানি কর্মকর্তারা তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলি হামলা অনেকটাই সহ্য করেছেন। তবে তারা এই হামলার সমালোচনা করে সতর্ক করেছিলেন যে, গত এপ্রিলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে হওয়া আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে শিয়া প্রতিরোধ এই বাহিনীকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। যতক্ষণ ইসরেইলের হামলা দক্ষিণ লেবাননের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, ততক্ষণ ইরান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।

কিন্তু ইরান আগেই সতর্ক করেছিল, ইসরাইল যদি লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলিতে (যেখানে হিজবুল্লাহর শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে) হামলা সম্প্রসারিত করে, তবে সমীকরণ বদলে যাবে। গত রোববার ইসরাইল ঠিক সেই কাজটিই করে।

ইরানের নীতি নির্ধারণী ও উপদেষ্টা পরিষদ 'এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল'-এর চেয়ারম্যান সাদেক লারিজানি বলেন, ‘লেবাননের প্রতিরক্ষায় ইরানের এই হামলা কেবল কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়া ছিল না, এটি ছিল একটি কৌশলগত ডকট্রিনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিরোধ অক্ষের (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স) যেকোনো উপাদানের ওপর হামলা হলে তার প্রতিক্রিয়া ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে যাবে এবং তা অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করে দেবে।’

এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান দেখাতে চায় যে তারা তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের রক্ষায় কতটা আন্তরিক। ২০২৪ সালে ইসরাইলি হামলায় হিজবুল্লাহর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং দলটির ক্যারিশম্যাটিক নেতা হাসান নাসরুল্লাহ নিহত হওয়ার পর ইরানের তৎকালীন নেতারা প্রতিশোধ না নেওয়ায় তেহরানের অবস্থান ক্ষুণ্ন হয়েছিল।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইসরাইল-মার্কিন যুদ্ধে খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ তৎকালীন নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত হওয়ার পর দেশটির নতুন শাসকরা মনে করছেন, তাদের আক্রমণাত্মক কৌশল, যেমন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবরোধ করা বা পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালানো, বেশ সফল হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই আক্রমণাত্মক নীতির কারণেই তারা ওয়াশিংটন ও ইসরাইলের হামলা থেকে কেবল টিকেই থাকেনি, বরং বিশ্বজুড়ে তেল-গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পেরেছে এবং কৌশলগত সুবিধা আদায় করেছে।

ইরানের নতুন নেতারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও তাদের এই আক্রমণাত্মক কৌশলের প্রতি সাড়াদানকারী হিসেবে পেয়েছেন। গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইসরাইলকে বৈরুতে হামলা না করার জন্য রাজি করিয়েছিলেন। সোমবার বৈরুতের শহরতলিতে ইসরাইলি হামলা এবং ইরানের পাল্টা জবাবের পর তিনি উভয় পক্ষকেই পিছু হটার আহ্বান জানান। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) দ্রুত হামলা স্থগিতের ঘোষণা দেয়। তবে তারা স্পষ্ট করেছে, ইসরাইল যদি দক্ষিণ লেবাননে আবারো হামলা চালায় (যা প্রায় নিশ্চিত), তবে তারা আবারো হামলা করতে পারে।

বিশ্লেষক ওমিদ মেমারিয়ান মনে করেন, এই ধরনের হামলা ইরানকে ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার সম্পর্ক পরীক্ষা করার সুযোগ করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তারা বোঝে যে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি দূরত্ব রয়েছে এবং তারা ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরি করতে চায়।’

তবে হিজবুল্লাহর প্রতিরক্ষা কেবল কৌশলগত অবস্থান বা পরীক্ষা করার বিষয় নয়। জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স-এর ইরানি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজি বলেন, ‘ইরান মনে করে উত্তর ইসরাইলে হিজবুল্লাহর ক্রমাগত হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইরানকে তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। ফলে হিজবুল্লাহকে আরো দুর্বল হতে দেওয়া ভবিষ্যতের অনিবার্য সংঘাতে ইরানের জন্য বড় সামরিক ক্ষতির কারণ হবে।’

আজিজি আরো বলেন, ‘ইরান এই পাল্টা হামলাকে প্রয়োজনীয় মনে করেছে কারণ তারা ইসরাইলের এই আক্রমণকে মার্কিন-ইসরাইলি কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে।

তারা মনে করছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের আলোচনা চলাকালীনই এই যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত ইরানের কৌশলগত সুবিধাগুলো গোপনে ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে।

কয়েক সপ্তাহ ধরে মার্কিন বাহিনী গোপনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ এসকর্ট বা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ কমানোর একটি মার্কিন চেষ্টা, যার মাধ্যমে তারা ইরানি জাহাজের ওপর নিজস্ব অবরোধ জোরদার করে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চায়।

ইরান আশঙ্কা করছে, হিজবুল্লাহকে দুর্বল করার ইসরাইলি প্রচেষ্টাও এই কৌশেরই আরেকটি অংশ।

আজিজি বলেন, ‘ইরানিরা বিশ্বাস করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধবিরতিকে এমনভাবে ব্যবহার করছে যাতে এই যুদ্ধে ইরানের অর্জিত সুবিধাগুলো নষ্ট হয়ে যায়।’

ইরানের এই তীব্র প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছা আরো একটি বিষয় ফুটিয়ে তোলে। তারা মনে করছে ট্রাম্পের পক্ষে এই মুহূর্তে নতুন করে যুদ্ধে জড়ানো অসম্ভব। কারণ ট্রাম্পের সামনে আসন্ন ওয়ার্ল্ড কাপের আয়োজন রয়েছে এবং চলতি শরতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেশটিতে গভীর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট চলছে।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের ইরান বিশ্লেষক ফারজান সাবেত বলেন, ‘তারা মনে করে না যে ট্রাম্প যুদ্ধে যাবেন। তবে তিনি যদি যানও, ইরানিরা বেশ আত্মবিশ্বাসী যে তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে।’

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন