গর্ভকালীন নিয়মিত চেক-আপ

নিরাপদ মাতৃত্ব ও শিশুর জন্য অপরিহার্য

নিরাপদ মাতৃত্ব ও শিশুর জন্য অপরিহার্য
প্রতীকী ছবি

গর্ভধারণ নারীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সময়। এ সময়ে শুধু গর্ভের শিশুরই নয়, মায়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হয়। একটি সুস্থ গর্ভাবস্থা এবং নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান উপায় হলো নিয়মিত গর্ভকালীন চেক-আপ। অনেকেই মনে করেন, শরীরে কোনো সমস্যা না থাকলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু গর্ভাবস্থার অনেক জটিলতা শুরুতে কোনো লক্ষণ ছাড়াই দেখা দিতে পারে। তাই নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা মা ও শিশুর জীবন রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

গর্ভকালীন চেক-আপের মূল উদ্দেশ্য

* মায়ের সার্বিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা।

* গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ সম্পর্কে অবগত হওয়া।

* উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা দ্রুত শনাক্ত করা।

* গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতা ও সংক্রমণ শনাক্ত করা।

* নিরাপদ প্রসবের পরিকল্পনা করা।

* প্রসব-পরবর্তী মা ও নবজাতকের যত্ন সম্পর্কে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া।

* মাকে সঠিক পুষ্টি, স্বাস্থ্যবিধি ও জীবনযাপন সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া।

কখন প্রথম চেক-আপ করা উচিত

গর্ভধারণ নিশ্চিত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব আদর্শভাবে প্রথম ১২ সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম গর্ভকালীন চেক-আপ করা উচিত। এতে গর্ভের বয়স নির্ধারণ, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ (ইডিডি) হিসাব করা এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা যায়।

গর্ভকালীন চেক-আপের সাধারণ সময়সূচি

১-২৮ সপ্তাহ : প্রতি চার সপ্তাহে একবার।

২৮–৩৬ সপ্তাহ : প্রতি দুই সপ্তাহে একবার।

৩৬ সপ্তাহ থেকে প্রসব পর্যন্ত : প্রতি সপ্তাহে একবার। তবে যাদের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী আরো ঘনঘন ফলো-আপের পরামর্শ দিতে পারেন।

প্রতিটি চেক-আপে কী কী তথ্য জানা যায়

রক্তচাপ (BP), ওজন বৃদ্ধি, প্রস্রাব পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, রক্তস্বল্পতা মূল্যায়ন, রক্তের শর্করার মাত্রা, শিশুর হৃৎস্পন্দন, জরায়ুর উচ্চতা, শিশুর অবস্থান ও নড়াচড়া, মায়ের হাত-পা ফুলে যাওয়া আছে কি না এবং প্রয়োজনে আল্ট্রাসনোগ্রাফি।

গর্ভাবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভাবস্থায় সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা (CBC), রক্তের গ্রুপ ও Rh টাইপিং, হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা, রক্তে শর্করা (Blood Sugar) পরীক্ষা, প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা, হেপাটাইটিস বি, এইচআইভি ও সিফিলিস স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজনে থাইরয়েড পরীক্ষা করা হতে পারে।

আল্ট্রাসনোগ্রাফির গুরুত্ব

আল্ট্রাসনোগ্রাফি গর্ভাবস্থার একটি নিরাপদ ও কার্যকর পরীক্ষা। এর মাধ্যমে গর্ভের বয়স নির্ধারণ, শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি, জন্মগত ত্রুটি শনাক্তকরণ ও প্লাসেন্টার অবস্থান জানা যায়। এ ছাড়া অ্যামনিয়োটিক তরলের পরিমাণ, যমজ বা একাধিক সন্তান আছে কি না এবং শিশুর প্রসবপূর্ব অবস্থান জানা যায়।

পুষ্টির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব

গর্ভাবস্থায় সুষম খাদ্য গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ডিম, মাছ, চর্বিহীন মাংস, ডাল, শাকসবজি, মৌসুমি ফল এবং সম্পূর্ণ শস্যজাত খাবার রাখা উচিত। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত চিনি ও লবণযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।

প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও ওষুধ

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড, আয়রন ট্যাবলেট, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি (প্রয়োজনে) নিয়মিত গ্রহণ করা উচিত।

মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নও জরুরি

গর্ভাবস্থায় হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা বা বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে। তাই পরিবারের সহযোগিতা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ইতিবাচক পরিবেশ এবং প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মায়ের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে

গর্ভাবস্থায় যোনিপথ দিয়ে রক্তপাত, পানি ভেঙে যাওয়া, শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া, তীব্র পেটব্যথা, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা, খিঁচুনি, উচ্চ জ্বর, শ্বাসকষ্ট, মুখ, হাত বা পা হঠাৎ ফুলে যাওয়া কিংবা বারবার বমি হওয়ার মতো যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

পরিবারের দায়িত্ব

একজন গর্ভবতী মায়ের সুস্থতার জন্য পরিবারের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের উচিত—

* নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া।

* পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা।

* মানসিকভাবে সাহস ও সমর্থন দেওয়া।

* জরুরি পরিস্থিতির জন্য নিকটস্থ হাসপাতাল ও যাতায়াতের ব্যবস্থা আগে থেকেই ঠিক রাখা।

* প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ, রক্তদাতা ও প্রয়োজনীয় অর্থের প্রস্তুতি রাখা।

নিরাপদ মাতৃত্বে সচেতনতার বিকল্প নেই

বর্তমানে অধিকাংশ গর্ভকালীন জটিলতা সময়মতো শনাক্ত করা গেলে সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। তাই কোনো ধরনের কুসংস্কার, অবহেলা বা অল্পশিক্ষিত ব্যক্তির পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে নিবন্ধিত চিকিৎসক বা দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধানে পুরো গর্ভকাল অতিবাহিত করা উচিত।

পরিশেষে বলা যায়, গর্ভকালীন নিয়মিত চেক-আপ কেবল একটি স্বাস্থ্যসেবা নয়; এটি মা ও অনাগত শিশুর জীবন রক্ষার অন্যতম কার্যকর বিনিয়োগ। সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সুষম খাদ্য, প্রয়োজনীয় টিকা, মানসিক সুস্থতা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার মাধ্যমে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব। একটি সুস্থ মা-ই একটি সুস্থ প্রজন্মের ভিত্তি। তাই গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই নিয়মিত চেক-আপকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন