নেপালে ভয়াবহ ভোতেকোশি আকস্মিক বন্যার সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, তিব্বতে আঘাত হানা একটি ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহে ধস নেমে পানির ঢল সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর এটি নেপালের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ বলে মনে করা হচ্ছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বুধবার পার্লামেন্টে জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে এবং এর তিন মিনিট পর সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যার খবর পাওয়া যায়। তবে এই সময়ের সম্পর্ক আরও যাচাই করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বতের ভূখণ্ডে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল গোসাইনকুণ্ড থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) প্রাথমিক গবেষণায় স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নেপাল-চীন সীমান্তে রাসুওয়াগাধি সীমান্ত পয়েন্টের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে একটি হিমবাহ ও পাথরের ধসের পর ধ্বংসাবশেষসহ পানির ঢল লেন্দে নদীতে প্রবেশ করে। পরে সেই পানি তিমুরে হয়ে ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে।
তবে নেপাল ও চীন—দুই দেশের কর্তৃপক্ষই এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলতে পারেনি কী কারণে এত বড় বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। বন্যায় সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস এবং বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বন্যার উৎস ও কারণ নির্ধারণে চীনা কর্তৃপক্ষ এবং নেপালের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। খারাপ আবহাওয়ার কারণে সীমান্ত এলাকায় অবস্থানরত কারও কাছ থেকেও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
লাসায় নেপালের কনসাল জেনারেল লক্ষ্মী প্রসাদ নিরাউলা বলেন, বন্যার কারণ সম্পর্কে কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও চীনা কর্তৃপক্ষও এর উৎস ও কারণ নিশ্চিত করতে পারছে না। বন্যায় যোগাযোগব্যবস্থা, সড়ক ও ইন্টারনেট সেবা ব্যাপকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, হিমবাহ থেকে হঠাৎ পানি বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। তিব্বতের কর্মকর্তারা স্যাটেলাইটের ছবি ও স্থানীয় সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দুর্যোগের কারণ খুঁজছেন।
নিরাউলা আরও জানান, মঙ্গলবার মানসারোবর ও আলি এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছিল। এর ফলে আকস্মিক বন্যা বা হিমবাহ থেকে পানির ঢল সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চীনা কর্তৃপক্ষ এ সম্ভাবনাও তদন্ত করছে।
নেপাল-চীন সীমান্তে আকস্মিক বন্যার পর দুই দেশের মধ্যে সীমান্তবর্তী এলাকায় বন্যা, ভূমিধস ও হিমবাহ-হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।
গত বছরের জুলাইয়ে চীনের পার্বত্য এলাকায় একটি হিমবাহের ওপর তৈরি হওয়া হ্রদ ভেঙে রাসুওয়াগাধি সীমান্তের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উজানে আকস্মিক পানির ঢল নামে। সেই ঢল লেন্দে খোলা ও ভোতেকোশী নদী দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার স্রোতের দিকে এলাকার জনপদ ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করে। ওই ঘটনায় অন্তত ১১ জন নিহত হন এবং রাসুওয়াগাধির মিতেরি বা ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।
ওই ঘটনার পর দুই দেশ সীমান্তবর্তী বন্যা ও ভূমিধসের তাৎক্ষণিক তথ্য এবং হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক পানি নিঃসরণের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য বিনিময়ে সম্মত হয়েছিল। তবে এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি।
এদিকে বুধবার রাসুওয়ায় বন্যার পর নেপাল সরকার ভোতেকোশী, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের একাধিক সতর্কবার্তা দিয়েছে। আরও বন্যার আশঙ্কায় তাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সূত্র: দ্য কাঠমুন্ডু পোস্ট
এমএমআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


