কয়েক সপ্তাহের আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছেছে, তবে যুদ্ধের অবসান ঘটানো কতটা জটিল হবে- সেই চ্যালেঞ্জগুলোর দিকেই এখন দৃষ্টি যাচ্ছে।
জ্যেষ্ঠ একজন মার্কিন কর্মকর্তা বুধবার সাংবাদিকদের, যাদের মধ্যে বিবিসি-ও ছিল, ১৪ অনুচ্ছেদের একটি সমঝোতা স্মারক পড়ে শোনান।
চুক্তিটি শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল। তবে তার আগেই ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এই চুক্তিতে সই করেছেন বলে তেহরান নিশ্চিত করেছে।
জানানো হয়েছে, এই সমঝোতার পর এখন ৬০ দিনের মধ্যে 'চূড়ান্ত চুক্তি' নিয়ে আলোচনার পথ তৈরি হবে এবং পারস্পরিক সম্মতিতে সময় বাড়ানোও যাবে।
এতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার শুরু করা এবং ইরানের ওপর 'সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা' প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা শুরু করার অঙ্গীকার রয়েছে।
সমঝোতা স্মারকে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার (৩০ হাজার কোটি) তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি তেহরানের পক্ষ থেকে পুনরায় অঙ্গীকার করা হয়েছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রাথমিক চুক্তি চূড়ান্ত নয় এবং এটি ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার বোমা বর্ষণে ফিরে যেতে পারে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ, যিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে এই চুক্তিতে সম্মত হয়েছেন, তিনি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তার অবিশ্বাস রয়ে গেছে এবং ইরানের আঙুল ট্রিগারের ওপরই আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আলোচনাকে বিপন্ন করতে পারে এমন তিনটি অন্যতম বড় হুমকি নিচে দেওয়া হলো।
ইসরাইলের লেবানন অভিযান
প্রাথমিক চুক্তি ঘোষণার সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, উভয় পক্ষ লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে।
বুধবার পড়ে শোনানো এই চুক্তিতে লেবাননকেও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে তার ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব’ নিশ্চিত করা হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সে জি-সেভেন সম্মেলনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে লেবাননের বিষয়ে আরো দায়িত্বশীল হওয়ার কথা বলার পরও ইসরাইল লেবাননে তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে।
বুধবার ইসরাইলি যুদ্ধবিমান নাবাতিয়েহ আল-ফাওকা এলাকা এবং পাশের কফর তেবনিতের উপকণ্ঠে হামলা চালিয়েছে বলে লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি বা এনএনএ জানিয়েছে।
এছাড়া মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, যদিও লেবানন যুদ্ধবিরতির কাঠামোর মধ্যে রয়েছে, তবুও লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহার এই চুক্তির শর্ত নয়।
তারা আরো বলেন, ইসরাইল আত্মরক্ষার অধিকার বজায় রাখবে।
কিন্তু ইরান বলেছে, লেবাননের যুদ্ধের অবসান ‘যুদ্ধ শেষ করার চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ’।
লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহও এই অবস্থান সমর্থন করেছে। হেজবুল্লাহর
জনসংযোগ দপ্তর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, ইরান তাদের মিত্রকে আশ্বস্ত করেছে, আলোচনার পরবর্তী ধাপে তারা লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানাবে।
ইসরাইলও স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা এই চুক্তি সম্পর্কে ইরানের ব্যাখ্যায় নিজেদের বাধ্য মনে করে না।
দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, ইসরাইলি বাহিনী লেবাননে নিরাপত্তা অঞ্চলে ‘সময়সীমা ছাড়া’ অবস্থান করবে এবং তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, লেবানন ইস্যুতে ইরান ইসরাইলের ওপর হামলা চালালে তারা ‘পূর্ণ শক্তি দিয়ে আঘাত হানবে’।
শান্তি প্রচেষ্টায় তেল আভিব ‘প্রধান বাধাদানকারী’ হিসেবে কাজ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের গবেষণা সংস্থা রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এইচ. এ. হেলিয়ার।
তিনি যুক্তি দেন,‘ইসরাইলি সামরিক অভিযান, তা ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত হোক বা লেবাননে চলমান ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে হোক, কূটনৈতিক অগ্রগতির জন্য এটা সবচেয়ে বড় একক হুমকি।’
তেহরান সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে ‘পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে প্রকৃতপক্ষে আলোচনা শুরুর আগেই’ প্রক্রিয়াটি ভেঙে পড়তে পারে বলে হেলিয়ার মনে করেন।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন প্রাথমিক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং বলেছেন, তার আশা এটি ‘এমন বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেবে যা সহিংসতার চক্রকে স্থায়ীভাবে শেষ করবে’।
লেবাননের জন্যও এই যুদ্ধের প্রভাব ভয়াবহ হয়েছে। ৩ হাজার ৭০০ বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বড় অংশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি
আরেকটি জটিল বিষয় হলো ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, যদিও ট্রাম্প বলেছেন এটি জব্দ করার কোনো তাড়াহুড়া নেই।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পর্যন্ত ইরান প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম জমা করেছিল। একটি পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির মাত্রা প্রায় ৯০ শতাংশ হয়।
তেহরান ধারাবাহিকভাবে দাবি করে এসেছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং চুক্তিতে তারা পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না।
তবে বিদ্যমান সমৃদ্ধ পদার্থের ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে- এটাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো এখনো একটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে জমাকৃত সমৃদ্ধ পদার্থ কীভাবে পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সম্মত হয়েছে। ন্যূনতমভাবে, ইউরেনিয়াম ‘ডাউনব্লেন্ড’ করা হবে, অর্থাৎ এর মান কমানো হবে এবং তা আইএইএ'র তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট স্থানেই সম্পন্ন হবে।
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে, যা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় আলোচনা হয়েছিল, তেহরান সমৃদ্ধি ৩.৬৭ শতাংশ পর্যন্ত সীমিত রেখেছিল। ২০১৮ সালে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের সাবেক উপপ্রধান ডারিন সেলনিক বিবিসি রেডিও ফোর-এর টুডে অনুষ্ঠানে বলেন, ইরান আবারও যদি অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে শুরু করে বলে মনে হয়, তাহলে প্রেসিডেন্ট ‘সম্ভবত আবার সামরিক অভিযান শুরু করবেন’।
এ মুহূর্তে, ৬০ দিনের আলোচনা চলাকালে উভয় পক্ষ 'স্থিতাবস্থা' বজায় রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্ভবত ইরান তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করবে না, আর যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি থেকে বিরত থাকবে।
হরমুজ প্রণালি
সমঝোতা চুক্তিটির লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, যা ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে আছে। যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে যেত।
এতে বলা হয়েছে, শুক্রবার চুক্তি স্বাক্ষরের পর সমুদ্রপথটি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। এই নৌপথের প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাজনিত বাধা, যার মধ্যে ইরানের পক্ষ থেকে মাইন অপসারণও রয়েছে, দূর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, প্রাথমিক ৬০ দিনের জন্য প্রণালিটি ‘পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং এর বিপরীত দিকেও’ টোলমুক্ত থাকবে।
এতে আরো বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমুদ্রপথের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক পরিষেবা নিয়ে ওমানসহ অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করবে ইরান।
এর ফলে ভবিষ্যতে কিছু ফি আরোপের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত হতে পারে।
তেহরান ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রণালি পরিচালনায় তারা আরো বড় ভূমিকা চায়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে তারা সেবা ফি নেবে। তবে এসব ফি কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করবে তা স্পষ্ট নয়।
আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে যাতায়াতের জন্য টোল নেওয়া অনুমোদিত নয়, যদিও নির্দিষ্ট কিছু সেবার জন্য চার্জ নেওয়া যেতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আলোচনার পর প্রণালিটি টোলমুক্তই থাকবে বলে তারা আত্মবিশ্বাসী।
মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরান তাদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরতে চাইতে পারে, কিন্তু উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এমন কোনো ব্যবস্থা মেনে নেবে না যা টোলমুক্ত প্রবেশাধিকার সীমিত করে।
ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ‘সাধারণ বিবেচনাবোধ’ ব্যবহার করবে এবং ফি আরোপ করবে না, কারণ এমন পদক্ষেপ আরো সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ভবিষ্যতে টোলভিত্তিক কোনো ব্যবস্থা 'কখনোই' মেনে নেবে না।
এখনো বাস্তব কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি বলেছেন, মাইন অপসারণে ‘কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস’ সময় লাগতে পারে।
জাহাজ চলাচলকারী কোম্পানিগুলো যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হচ্ছে কি-না সে বিষয়ে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সতর্কভাবে এগোবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংকট ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইওএস রিস্ক গ্রুপ-এর মার্টিন কেলি বিবিসি ভেরিফাই-কে বলেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে হলে অত্যন্ত সাহসী কোনো অধিনায়ক লাগবে।’
তবে হেলিয়ার সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করার এই চুক্তিটি এখনো কেবল ‘একটি সমঝোতা স্মারক- আলোচনার কাঠামো, কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘কঠিন কাজ এখনো শুরুই হয়নি।’
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


