ক্ষয়ক্ষতি ভুলে যেভাবে পুনর্গঠিত হলো হিজবুল্লাহ

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ক্ষয়ক্ষতি ভুলে যেভাবে পুনর্গঠিত হলো হিজবুল্লাহ
ফাইল ছবি

ওয়াশিংটনে মার্কিন মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরাইল সরকারের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নবায়ন এবং একটি সামগ্রিক সমাধানের লক্ষ্যে চুক্তি ঘোষণার পর হিজবুল্লাহ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বোমাবর্ষণ ও সামরিক অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কেবল হিজবুল্লাহকে তাদের হামলা বন্ধ করতে বলা হয়েছে।

লেবাননের এই প্রতিরোধ গোষ্ঠীটি আলোচনাকে ‘অযৌক্তিক, অপমানজনক ও আপত্তিকর’ আখ্যা দিয়ে তা দ্রুত প্রত্যাখ্যান করেছে।

বিজ্ঞাপন

২০২৬ সালের মার্চ মাসে শুরু হওয়া 'রমজান যুদ্ধ' নামে পরিচিত সাম্প্রতিক এই লড়াইয়ে হিজবুল্লাহ ১০ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইসরাইলের নতুন আক্রমণের বিরুদ্ধে ড্রোন ও বিশেষায়িত ছোট ইউনিটের ওপর ভরসা করে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ক্ষয়ক্ষতিমূলক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। লড়াইয়ের প্রায় ৭০ দিন পর এটি স্পষ্ট যে, ২০২৪ সালের বাহিনীর তুলনায় বর্তমান হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক সংগঠন, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রস্তুতি ও পরিচালনগত নমনীয়তার দিক থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে আলাদা। ২০২৩ সালের 'সমর্থন যুদ্ধ' (হার্ব আল-ইসনাদ) এবং ২০২৪ সালের ৬৬ দিনের যুদ্ধের তুলনায় এবার তাদের কমান্ড মেকানিজম, যুদ্ধনীতি এবং বাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রে গভীর পরিবর্তন এসেছে।

কমান্ড ও কন্ট্রোল পুনর্গঠন

২০২৪ সালের ৬৬ দিনের যুদ্ধে হিজবুল্লাহর প্রধান দুর্বলতা ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থায় ত্রুটি এবং হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের ইউনিটের সমন্বয়ের অভাব। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধে একাধিক ফ্রন্টে একসঙ্গে অভিযান চলছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে সদরদপ্তরের যোগাযোগ নিরবচ্ছিন্ন রয়েছে। এমনকি ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিলের তীব্র হামলার মুখেও তাদের কমান্ড চেইন ভেঙে পড়েনি। বর্তমানে বাহিনীতে যুদ্ধক্ষেত্রের ভিডিও ধারণ ও প্রকাশের কাজটিও সুশৃঙ্খলভাবে করা হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে হিজবুল্লাহর নতুন নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় কমান্ড নীতি কাজ করছে। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের বহুস্তর বিশিষ্ট প্রক্রিয়া কমিয়ে তরুণ ও অনুপ্রাণিত কমান্ডারদের দায়িত্ব বাড়িয়েছেন। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোর কেন্দ্রীয় সদরদপ্তরের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে মধ্যম সারির কমান্ডারদের যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে।

সংখ্যার চেয়ে যোগ্যতার ওপর জোর

দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে হিজবুল্লাহ এখন যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুল সেনা মোতায়েন বা ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঢালাও অস্ত্রশক্তি ব্যবহারের মডেল থেকে সরে এসেছে। তারা এখন সংখ্যার চেয়ে যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই কারণে বর্তমান যুদ্ধের মূল ভার বহন করছে ড্রোন ইউনিট, ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী, ট্যাংক-বিধ্বংসী ইউনিট এবং নতুনভাবে গঠিত ফার্স্ট-পারসন ভিউ (এফপিভি) ড্রোন ইউনিট। সাধারণ পদাতিক ও অ-বিশেষায়িত বাহিনীকে এখন রিজার্ভ বা বাড়তি হিসেবে রাখা হচ্ছে, যাতে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায় এবং শত্রুর ভূখণ্ডের গভীরে আরো কার্যকরভাবে আঘাত করা যায়।

যুদ্ধনীতিতে পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি লড়াই

২০২৪ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লাহর মূল নীতি ছিল যেকোনো মূল্যে নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা করা এবং শত্রুর অগ্রসর হওয়া ঠেকানো, যার ফলে তাদের ভারী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তবে বর্তমানে তারা শত্রুর ওপর ক্রমাগত ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়ার নীতিতে স্থানান্তরিত হয়েছে।

এই নীতি অনুযায়ী, সাময়িকভাবে ভূখণ্ড হাতছাড়া হওয়াকে তারা পরাজয় হিসেবে দেখছে না, বরং লিটানি নদীর দক্ষিণাঞ্চলের সম্পূর্ণ পতন ঘটলেও তা কৌশলগত পরাজয় হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকের মতো এটি দখলদারিত্ববিরোধী সামাজিক বৈধতা বাড়াবে এবং এফপিভি ড্রোনকে হাতিয়ার করে ইসরাইলের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের পথ তৈরি করবে।

অভ্যন্তরীণ সংকট ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

সমর্থন যুদ্ধের ব্যর্থতার গ্লানি, ৬৬ দিনের যুদ্ধের ভারী ক্ষয়ক্ষতি, ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতিকালে শত শত সদস্যের মৃত্যু এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যার পর হিজবুল্লাহর মাঠপর্যায়ের যোদ্ধা ও সামাজিক ঘাঁটিতে যে মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল, তা এখন প্রতিরোধে নতুন অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। যুদ্ধক্ষেত্রে এফপিভি ড্রোনের ফুটেজ তাদের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল ফিরিয়ে এনেছে।

তবে হিজবুল্লাহর জন্য প্রধান হুমকি এখন যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বরং লেবাননের ভঙ্গুর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। শরণার্থী সংকট, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় এবং বর্তমান লেবানন সরকারসহ কিছু অভ্যন্তরীণ পক্ষের রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার চেষ্টা হিজবুল্লাহর যুদ্ধক্ষেত্রের পারফরম্যান্স এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে, যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে লেবাননের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের গতিপ্রকৃতিই শেষ পর্যন্ত হিজবুল্লাহর টিকে থাকার ক্ষেত্রে বেশি নিষ্পত্তিমূলক হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন