মানবিকতার জায়গা থেকে নরসিংদীর অসহায়, প্রতিবন্ধী, রোগাক্রান্ত ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া। সরকারি নিয়মিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নীরবে বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় জেলার ১২০ জন অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের হাতে বিভিন্ন ধরনের সহায়তার চেক তুলে দেওয়া হয়েছে।
নরসিংদী সদর উপজেলার ঘোড়াদিয়া এলাকার ৭০ বছর বয়সী কেশ রানী তাদেরই একজন। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে। ছেলেরা বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন, মেয়েরাও স্বামীর বাড়িতে। ফলে স্বামীর ভিটায় একাই বসবাস করছেন বৃদ্ধা কেশ রানী। আশপাশের মানুষের সহায়তায় কোনো রকমে দিন কাটলেও দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পরও অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না তিনি।
চিকিৎসা সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন কেশ রানী। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি সহায়তা থেকে তাঁকে চিকিৎসার জন্য অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ফোন পেয়ে নির্ধারিত সময়ে সেখানে উপস্থিত হন তিনি। জেলা প্রশাসকের হাত থেকে সহায়তার চেক নেওয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বৃদ্ধা কেশ রানী। তাঁর চোখে পানি দেখে জেলা প্রশাসক নিজ হাতে চোখের পানি মুছে দেন।
এদিকে জেলার বিভিন্ন উপজেলার আরও ১১৯ জন অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের হাতে সহায়তার চেক তুলে দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে রায়পুরার মুছাপুর এলাকার ইমান আহমেদ লেখাপড়ার জন্য, পলাশের কর্তাতৈল এলাকার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত রাবিয়া চিকিৎসার জন্য, শিবপুরের অসহায় বৃদ্ধা হারেচা বেগম এবং রায়পুরার হাসনাবাদ এলাকার প্রতিবন্ধী তরুণী শান্তাসহ প্রতিবন্ধী, অসহায়, পক্ষাঘাতগ্রস্ত, চিকিৎসা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভোগা ব্যক্তিরা রয়েছেন।
শুধু চিকিৎসা বা শিক্ষা সহায়তাই নয়, অসহায় মানুষকে স্বাবলম্বী করতেও উদ্যোগ নিয়েছেন জেলা প্রশাসক। শিবপুর উপজেলার কারারচর এলাকার স্বামীহারা মালা আক্তার একমাত্র প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। সংসার চালাতে একটি চায়ের দোকান দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও পুঁজির অভাবে তা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে জেলা প্রশাসকের কাছে সহায়তার আবেদন করেন তিনি।
মালা আক্তারের প্রয়োজন অনুযায়ী চায়ের দোকান চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি দিয়ে তাঁকে সহায়তা করা হয়। জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে নগদ অর্থ হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। মালা আক্তার বলেন, সংসার চালানোর মতো কোনো অর্থই তাঁর হাতে ছিল না। এই সহায়তা তাঁর জীবনে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
মালা আক্তার, রাবিয়া, শান্তা, হারেচা ও ইমান আহমেদের মতো ১২০ জনের প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে সংগ্রামের ভিন্ন ভিন্ন গল্প। চলাফেরার সক্ষমতা থাকলে কিংবা আর্থিক সামর্থ্য থাকলে হয়তো তাঁদের অনেককেই সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আসতে হতো না। জেলা প্রশাসনের সহায়তায় তাঁরা এখন নতুন করে বাঁচার ও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
সহায়তা বিতরণকালে জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, দিনশেষে প্রতিটি ব্যক্তি একজন মানুষ। প্রত্যেক মানুষেরই মানবিকতা থাকা উচিত। সেই মানবিকতার জায়গা থেকেই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, জেলার সব মানুষের দুঃখ-দুর্দশার সমাধান করা হয়তো সম্ভব নয়। তবে যতগুলো পরিবারকে সম্ভব, তাদের জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে পারাটাই বড় কথা। কোনো একটি পরিবারও যদি এই সহায়তার মাধ্যমে ভালোভাবে চলতে পারে, সেটাই আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি।
জেলা প্রশাসনের এমন উদ্যোগে সহায়তা পাওয়া মানুষদের মধ্যে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার হয়েছে। তাদের অনেকেই মনে করছেন, সামান্য এই সহায়তাই তাদের জীবনে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ তৈরি করতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

