নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইশার) রিফিলের নামে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সংগ্রহ করে ড্রাই কেমিক্যাল পাউডার পরিবর্তন না করেই সেগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে। এরপর ময়মনসিংহের ‘দ্য সেফ মার্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে নকল স্টিকার লাগিয়ে রিফিল ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ করা হচ্ছে। কোনো কোনো স্টিকারে রিফিলকারীর স্বাক্ষরও নেই বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ওপর আস্থা রেখেই তারা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রিফিলের জন্য দিয়ে থাকেন। এ জন্য প্রতিটি যন্ত্রের বিপরীতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হলেও কোনো ভাউচার দেওয়া হয় না। ফলে যন্ত্রের ভেতরের রাসায়নিক আদৌ পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করার সুযোগ থাকে না তাদের।
মোহনগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, কামরুজ্জামান সুমনের মূল কর্মস্থল পাশের খালিয়াজুরী উপজেলা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে। স্টেশনটি বর্তমানে চালু না থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তিনি মোহনগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দায়িত্বও পালন করছেন। ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে তিনি দুই উপজেলার স্টেশন অফিসারের দায়িত্বে রয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ম অনুযায়ী, ডিজেল, পেট্রোল ও এলপিজি বিক্রির প্রতিষ্ঠান, কারখানা, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এসব প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা তদারকি ও ফায়ার লাইসেন্সের বিষয়টিও ফায়ার সার্ভিসের আওতাভুক্ত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঁচ শতাধিক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রয়েছে।
যন্ত্র নিয়ে যান ফায়ার সার্ভিসের লোকজন:
মোহনগঞ্জ বাজারের ২০ থেকে ২৫ জন ব্যবসায়ী জানান, প্রতিবছর অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ড্রাই কেমিক্যাল পাউডারের মেয়াদ শেষ হলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে সেগুলো নিয়ে যান। পরে টাকা নিয়ে রিফিল করা হয়েছে জানিয়ে যন্ত্রগুলো ফেরত দেওয়া হয়। ফেরত দেওয়া যন্ত্রের গায়ে ‘দ্য সেফ মার্ট’ লেখা স্টিকার থাকে। সেখানে রিফিলের তারিখ এবং পরবর্তী মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখও উল্লেখ করা হয়।
তবে স্টিকারগুলো আসল কি না, তা কখনো যাচাই করেননি তারা। ফায়ার সার্ভিসের লোকজনই বিষয়টি দেখভাল করছেন—এমন বিশ্বাস থেকেই তারা নিশ্চিন্ত ছিলেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
মোহনগঞ্জের মাইলোড়া এলাকার রাবেয়া এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার আইনুল হক বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে দুটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রয়েছে। কয়েক মাস আগে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সেগুলো নিয়ে গিয়ে রিফিল করে ফেরত দেন। দুটি যন্ত্রের জন্য ২ হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হলেও কোনো ভাউচার দেওয়া হয়নি।
আইনুল হক বলেন, ফায়ার সার্ভিসের লোকজন নিয়ে যায়, আবার তারাই রিফিল করে দিয়ে যায়। তাই আমরা তাদের ওপরই ভরসা করি। আসল-নকল যাচাই করার কথা কখনো মাথায় আসেনি।
ফারহা এন্টারপ্রাইজের মালিক রেজাউল হকও একই ধরনের অভিযোগ করেন।
শাহ জালাল (র.) ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মাহবুব আলম সেলিম বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের দুটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কামরুজ্জামান সুমন নিয়ে গিয়ে রিফিল করে দিয়েছেন। এ জন্য টাকা দেওয়া হলেও কোনো ভাউচার পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, তিনি ময়মনসিংহ থেকে রিফিল করেন, নাকি নিজেই স্টিকার লাগিয়ে দেন—আমরা জানি না। আমরা তো তার ওপর ভরসা করি। যদি রিফিল না করে পুরোনো কেমিক্যাল রেখে দেওয়া হয়, তাহলে আগুন লাগলে সেটা কোনো কাজেই আসবে না। বিষয়টি তদন্ত হওয়া দরকার।
সরেজমিনে মিলেছে ‘সেফ মার্টের’ স্টিকার :
গত দুই দিনে মোহনগঞ্জ পৌরশহরের কয়েকটি ডিজেল-পেট্রোল বিক্রির প্রতিষ্ঠান এবং অন্তত ২০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ডিজেল-পেট্রোল বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে থাকা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সরেজমিনে দেখা হয়। প্রায় সব কটি যন্ত্রেই ‘দ্য সেফ মার্ট’ লেখা স্টিকার পাওয়া গেছে। স্টিকারগুলোতে রিফিলের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ রয়েছে। কয়েকটি স্টিকারে রিফিলকারীর স্বাক্ষরও ছিল না।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের কাছেও রিফিলের কোনো ভাউচার পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে অন্তত ১০টি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের স্টিকারের ছবি ‘দ্য সেফ মার্ট’-এর স্বত্বাধিকারী ও ফায়ার সার্ভিসের সাবেক কর্মকর্তা দুলাল মিয়াকে পাঠানো হয়। ছবিগুলো দেখে তিনি জানান, এর মধ্যে মাত্র দুটি সিলিন্ডার তাঁদের প্রতিষ্ঠান থেকে রিফিল করা হয়েছে। অন্য সিলিন্ডারগুলোর স্টিকার তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নয় বলে দাবি করেন তিনি।
দুলাল মিয়া বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ড্রাই কেমিক্যাল আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। কেউ যদি রিফিল না করে এমন স্টিকার লাগিয়ে থাকে, তাহলে তা প্রতারণা। এমন কাজ হয়ে থাকলে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
স্থানীয় ছাপাখানা থেকে নকল স্টিকার তৈরির অভিযোগ :
কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মোহনগঞ্জ পৌরশহরের একটি ডিজিটাল প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান থেকে ‘দ্য সেফ মার্টের’ স্টিকার হুবহু নকল করে ছাপিয়ে নিয়েছেন। পরে ওই স্টিকার অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।
নওহাল এলাকার দুই বাসিন্দা দাবি করেন, তাদের সামনেই সুমন ওই দোকান থেকে স্টিকার ছাপিয়েছেন। দোকানের কর্মচারী প্রথমে রাজি না হলেও পরে তাকে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হয় বলে তাদের দাবি। নকল স্টিকার তৈরির একটি প্রিন্ট কপিও তাঁরা প্রতিবেদকের কাছে দিয়েছেন।
তবে ওই প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনার প্রথমে স্টিকার ছাপানোর বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে প্রমাণ দেখানো হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রিফিলের নামে নেওয়া হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রিফিলের জন্য ১ হাজার, ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের সংখ্যাও ভিন্ন। কোনো প্রতিষ্ঠানে ১০টি, কোথাও পাঁচটি, আবার কোথাও দুটি কিংবা ছোট প্রতিষ্ঠানে একটি করে যন্ত্র রয়েছে।
আদর্শ ল্যাবের ইমরান হোসেন বলেন, “প্রতি সিলিন্ডার রিফিলের জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। কোনো ভাউচার দেওয়া হয়নি।”
মডেল ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মনির হোসেন বলেন, “আমরা রিফিলের টাকা ফায়ার সার্ভিসের লোকজনকে দিই। তাঁরা নিয়ে গিয়ে রিফিল করে স্টিকার লাগিয়ে দিয়ে যান। নতুন একটি সিলিন্ডারও তাদের কাছ থেকে ৭ হাজার টাকা দিয়ে নিয়েছি।”
রোকেয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক রুবেল মিয়াসহ আরো কয়েকজন ব্যবসায়ীও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।
আগেও সুমনের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগ :
কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে এর আগেও মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার কথা জানা গেছে। ২০২১ সালে রংপুরে স্টেশন অফিসারের দায়িত্বে থাকার সময় তার ফেনসিডিল সেবনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। একই সময়ে ফায়ার সার্ভিসের সরকারি মালামাল বিক্রির অভিযোগও ওঠে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পেয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তখন সুমনের বক্তব্য ছিল, তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ফেনসিডিল সেবন করানো হয়েছিল।
পরে তাকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তখন উপর মহলে বিপুল টাকা খরচ করে শাস্তি এড়িয়ে বদলির মাধ্যমেই বিষয়টি সমাধান করেন সুমন।
বর্তমানে মোহনগঞ্জে যোগদানের পরও তার বিরুদ্ধে ইয়াবা সেবনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি। তাদের দাবি, স্টেশন ও আশপাশের দোকানে বসে তাঁকে ইয়াবা সেবন করতে দেখেছেন তারা।
‘আমরা কোনো যন্ত্র নিই না’:
তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহনগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার কামরুজ্জামান সুমন।
তিনি বলেন, “আমরা রিফিল করার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নিই না। যাদের এসব যন্ত্র রয়েছে, তারা আমাদের কাছে রিফিলের বিষয়ে পরামর্শ চাইলে আমরা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের কথা বলে দিই। পরে তারা নিজেরাই সেখানে গিয়ে রিফিল করে আনেন।”
নকল স্টিকার ছাপানোর অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তার ভাষ্য, আমরা কখনো দুই নম্বরি কাজ করি না।
মেয়াদোত্তীর্ণ কেমিক্যাল দিয়ে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কার্যকর হবে না—এমন কথা স্বীকার করে সুমন বলেন, “যাদের কাছে রিফিল করা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রয়েছে, তাদের জিজ্ঞাসা করেন কাজ করছে কি না। কাজ করলেই হলো।
তার বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা এড়িয়ে যান।
তদন্তের আশ্বাস ফায়ার সার্ভিসের :
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নেত্রকোনা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মো. জাকির হোসেন বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা সাধারণত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রিফিলের বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তা রিফিল করে।
তিনি বলেন, অবৈধভাবে স্টিকার ছাপিয়ে রিফিলের নামে প্রতারণা করা অপরাধ। অভিযোগের তথ্য-প্রমাণগুলো আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালে তদন্ত করে দেখা হবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হবে।
কামরুজ্জামান সুমনের আগের মাদক সেবনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘটনাটি শুনেছি। এ-সংক্রান্ত সংবাদ দেখিনি।
অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মতো জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম রিফিলের নামে যদি পুরোনো রাসায়নিক রেখে দেওয়ার অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে তা শুধু আর্থিক প্রতারণার বিষয় নয়; অগ্নিকাণ্ডের সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রোগী ও কর্মচারীদের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

