নেপালের ভয়াবহ বন্যায় পরিবারহারা শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

নেপালের ভয়াবহ বন্যায় পরিবারহারা শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় শুধু ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়নি, অসংখ্য শিশুর জীবনও তছনছ হয়ে গেছে। অনেক শিশু বাবা-মা কিংবা ভাইবোনকে হারিয়েছে, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের নিখোঁজ হওয়ার পর আশ্রয়কেন্দ্রে একা হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, বন্যায় নেপালের অন্তত ১৭ হাজার শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাসুয়া জেলার ১৬ বছর বয়সী সমীর তামাং এখন লহরেপাওয়ার একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যার খবর শুনে সেদিন সে স্কুল থেকে পালিয়ে বাঁচে। তার ছোট বোন পার্বতীর হাতে আঘাত লেগেছিল। তাকে দেখাশোনার জন্য বড় বোন প্রিয়া বাড়িতে থেকে গিয়েছিল। কিন্তু বন্যার পর থেকে প্রিয়া ও পার্বতীর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। সমীরের বাড়িও ভেসে গেছে। কোনোভাবে বেঁচে গেছেন তার বাবা সূর্য। তার মা চেসাং কাজ করেন কুয়েতে।

বিজ্ঞাপন

রাসুয়ার আরেক বাসিন্দা রঞ্জু তামাংয়ের পরিবারের অবস্থাও একই রকম। বন্যার পর তার মা, বড় ভাই ও ভাইপোর কোনো খোঁজ নেই। একই পরিবারের পিসি, কাকা এবং কাকার এক বছরের শিশুসন্তানও নিখোঁজ। পাঁচ বছর আগে বাবাকে হারানো রঞ্জুর সামনে এখন আরও বড় অনিশ্চয়তা।

১৪ বছর বয়সি আকাশ তামাং তখন স্কুলে ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে খেলার সময় হঠাৎ বানের শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা প্রাণ বাঁচাতে জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যায়। আকাশ বলেছে, সেদিকে না পালালে হয়তো তারা বাঁচতে পারত না। কিন্তু তার আট বছরের ভাই ও ১১ বছরের বোন অন্য স্কুলে পড়ত। বন্যার পর থেকে তাদের কোনো সন্ধান নেই।

বন্যার ভয়াবহতা এতটাই ব্যাপক যে নেপালে মৃতের সংখ্যা এখন ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে এবং হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারীরা এখনো বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত কাউকে পাওয়া যায় কি না, সে আশায় অভিযান চালাচ্ছেন।

এই দুর্যোগে শিশুদের সংকট শুধু খাদ্য, পানি ও আশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার হারানো, স্বজনদের নিখোঁজ হওয়া এবং ভয়াবহ বন্যার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার কারণে তাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব শিশু বাবা-মাকে হারিয়েছে বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তাদের নিরাপদ আশ্রয়, মানসিক সহায়তা, শিক্ষা এবং পরিচয় নিশ্চিত করা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। ইউনিসেফও বন্যাকবলিত শিশুদের জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছে।

তবে ধ্বংসের মধ্যেও কিছু ঘটনা মানুষের মনে আশার আলো জাগিয়েছে। বন্যার প্রায় ১০ দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। চারতলা বাড়ির ধ্বংসাবশেষের ভেতরে তৈরি হওয়া ছোট একটি ফাঁকা জায়গায় আটকে ছিলেন তিনি। তার কান্নার শব্দ শুনে উদ্ধারকারীরা দীর্ঘ অভিযান চালিয়ে তাকে জীবিত বের করে আনেন।

নেপালের এবারের দুর্যোগ তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের গল্প নয়; এটি হাজারো পরিবারের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার গল্প। ধ্বংস হওয়া বাড়ি ও সড়ক পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হলেও বাবা-মা হারানো শিশুদের জীবনের শূন্যতা পূরণ করা সহজ নয়। তাদের জন্য জরুরি ত্রাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা, শিক্ষা ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করাই এখন সবচেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব।

সূত্র: আনন্দবাজার, রয়টার্স ও ইউনিসেফ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন