জাপানে একদিকে কমছে সমুদ্রসৈকতে মানুষের আনাগোনা, অন্যদিকে ভয়াবহ ভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে বালুময় সৈকত। ফলে দেশটির বহু জনপ্রিয় সৈকত বন্ধ করে দিতে হচ্ছে।
টোকিওর উত্তর-পূর্বে ইবারাকি প্রদেশের ওতাকে কোস্ট হোকোতা সৈকত একসময় ‘ইবারাকির গোল্ড কোস্ট’ নামে পরিচিত ছিল। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকতে প্রতি গ্রীষ্মে হাজার হাজার মানুষ সাঁতার, সূর্যস্নান ও সার্ফিং করতে আসতেন। কিন্তু তীব্র ভাঙন ও সমুদ্র প্রতিরক্ষা বাঁধের ক্ষতির কারণে ২০২৬ সালে তৃতীয় বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো সৈকতটি আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা হয়নি।
শুধু হোকোতা নয়, জাপানের বিভিন্ন এলাকায় একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ওসাকার তোকিমেকি সৈকতে পর্যটকের সংখ্যা ২০১৬ সালের ১ লাখ ১ হাজার থেকে কমে ২০২৫ সালে ৩৩ হাজারে নেমে এসেছে। মিয়াজাকি প্রদেশের কুমানোয়ে সৈকতে ২০০৫ সালে যেখানে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ গিয়েছিলেন, ২০২৫ সালে সেখানে পর্যটকের সংখ্যা মাত্র ১ হাজারে নেমে আসে।
জাপানের সমুদ্রসৈকতে মানুষের যাতায়াত গত কয়েক দশকে নাটকীয়ভাবে কমেছে। ১৯৮৫ সালে বছরে প্রায় ৩ কোটি ৭৯ লাখ মানুষ সমুদ্রসৈকতে যেতেন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৪ লাখে—প্রায় ৯০ শতাংশ পতন। একই সময়ে গ্রীষ্মে খোলা অনুমোদিত সৈকতের সংখ্যাও ১৯৯৩ সালের ১ হাজার ৩৭৯টি থেকে কমে ২০২৫ সালে ৯৬৬টিতে নেমেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, তীব্র গরম এবং সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবেশগত কারণও রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্যাপক শিল্পায়নের সময় জাপানে নদীতে বাঁধ নির্মাণ, কংক্রিটের বাঁধ ও নদীর বালু উত্তোলনের কারণে সমুদ্রতীরে স্বাভাবিকভাবে বালি পৌঁছানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। গত দুই দশকে জাপানের উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে গড়ে ৩ দশমিক ৪ মিলিমিটার করে বেড়েছে। গবেষকদের আশঙ্কা, উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলেও ২১০০ সালের মধ্যে ১৯৯০ সালে জাপানে থাকা বালুময় সৈকতের ৬০ শতাংশের বেশি পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লে দেশটির ৯০ দশমিক ৩ শতাংশ বালুময় উপকূল বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৈকত রক্ষায় সরকার বালি এনে উপকূলে ফেলার উদ্যোগ নিলেও তা ব্যয়বহুল এবং স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। হোকোতা সৈকতে ২০২৫ সালে প্রায় ৪ কোটি ইয়েন খরচ করে ১২ হাজার ঘনমিটার বালি ফেলা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সমুদ্রের ঢেউ সেই বালি সরিয়ে নেয়। ফলে প্রতি বছর একইভাবে বালি ফেলার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপান শুধু বিনোদনের স্থান হারাচ্ছে না; সমুদ্রকেন্দ্রিক দেশটির দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি ও উপকূলীয় জনজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: দ্য স্ট্রেইটস টাইমস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


