বিশ্বমঞ্চে ভারতকে যেভাবে ধরাশায়ী করছে পাকিস্তান

আমার দেশ অনলাইন

বিশ্বমঞ্চে ভারতকে যেভাবে ধরাশায়ী করছে পাকিস্তান
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের খেলায় কেবল অর্থনৈতিক শক্তি বা সামরিক সক্ষমতাই শেষ কথা নয়; বরং কোন রাষ্ট্র নিজেকে কতটা “অপরিহার্য” করে তুলতে পারে, সেটিই নির্ধারণ করে তার প্রকৃত কৌশলগত অবস্থান। এই বাস্তবতায় পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করে আসছে—যেখানে সীমাবদ্ধতাকেই সম্পদে রূপান্তর করা হয়। বিপরীতে ভারত, বৃহৎ অর্থনীতি ও বৈশ্বিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও, অনেক ক্ষেত্রে সেই অপরিহার্যতা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক ঘটনাগুলো এই বৈপরীত্যকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরব-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এই ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বহু দশকের নীরব সামরিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই চুক্তি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় অবস্থানকেও নিশ্চিত করে। এই অঞ্চলে ভারতের বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থ—প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিটেন্স, জ্বালানি নির্ভরতা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক—থাকা সত্ত্বেও, নয়াদিল্লি কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি, স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি বা যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। ফলে অর্থনৈতিক প্রভাব থাকলেও নিরাপত্তা স্থাপত্যে ভারত প্রান্তিকই থেকে গেছে।

বিজ্ঞাপন

এই কৌশলগত অবস্থানের সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায় চলমান পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-এর মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন ভূমিকা সাধারণত সেই রাষ্ট্রগুলিই পায়, যাদের ছাড়া সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিকল্প কম থাকে। পাকিস্তান সেই অবস্থান তৈরি করেছে তার সামরিক যোগাযোগ, আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বহুমুখী সম্পর্কের মাধ্যমে—যেখানে একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখা হয়।

ঐতিহাসিকভাবে এই ধারা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে হেনরি কিসিঞ্জার-এর গোপন চীন সফরের পেছনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাই ছিল মূল চালিকা শক্তি, যার মাধ্যমে রিচার্ড নিক্সন প্রশাসন চীন-এর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথ পায়। ১৯৮০-এর দশকে আফগান যুদ্ধে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সমর্থন আফগান মুজাহিদদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। এমনকি ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধেও পাকিস্তান একসঙ্গে সহযোগী ও চ্যালেঞ্জ—দুই ভূমিকাতেই থেকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখে। এই ধারাবাহিকতা দেখায়, পাকিস্তানের কৌশল কোনো একক সরকারের নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি।

পাকিস্তানের এই অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে তার পারমাণবিক সক্ষমতা। ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য আমূল বদলে যায়। ভারতের প্রচলিত সামরিক আধিপত্য কার্যত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, কারণ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকি উভয় পক্ষের জন্যই বিপর্যয়কর হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের ভারতের সাথে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়, যেখানে পাকিস্তান সামরিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েও সংঘাতকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ফলে পারমাণবিক প্রতিরোধ শুধু নিরাপত্তা নয়, কূটনৈতিক দরকষাকষিরও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তির একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্ভাব্য “পারমাণবিক ছাতা”। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ প্রথমে এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিলেও দ্রুত তা প্রত্যাহার করেন। তবে এই ঘটনাই দেখায়, পাকিস্তান ইচ্ছাকৃতভাবে একটি কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রাখছে—যেখানে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি না দিয়েও সম্ভাব্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ইঙ্গিত রাখা হয়। এই ধরনের অস্পষ্টতা সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রগুলোর কাছে পাকিস্তানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে, বিশেষত এমন সময়ে যখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশ অনিশ্চিত।

ভৌগোলিক অবস্থান পাকিস্তানের এই কৌশলকে আরও শক্তিশালী করে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং চীন-এর সংযোগস্থলে অবস্থান করায় এটি একটি প্রাকৃতিক করিডোরে পরিণত হয়েছে। চীনের জন্য এটি অর্থনৈতিক করিডোরের শেষ প্রান্ত, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঐতিহাসিক নিরাপত্তা অংশীদার, আর সৌদি আরবের জন্য নির্ভরযোগ্য সামরিক সহযোগী। ফলে বিভিন্ন শক্তির স্বার্থ এক জায়গায় এসে মিলে যায়—আর সেই কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পাকিস্তান।

অন্যদিকে ভারতের শক্তিই অনেক ক্ষেত্রে তার সীমাবদ্ধতায় পরিণত হয়েছে। বৃহৎ অর্থনীতি, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং “কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন”-এর নীতি ভারতকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিলেও, তা তাকে ঝুঁকিপূর্ণ বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিরাপত্তা ভূমিকায় যেতে নিরুৎসাহিত করে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-এর নেতৃত্বে ভারত বিশ্বজুড়ে সম্পর্ক বিস্তার করলেও, সেই সম্পর্কগুলোকে নিরাপত্তা নির্ভরতায় রূপান্তর করতে পারেনি। ফলে ভারত অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, কিন্তু অপরিহার্য নয়।

সবশেষে দেখা যায়, পাকিস্তান তার অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, নিরাপত্তা নির্ভরতা এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত সম্পদে পরিণত করেছে। অন্যদিকে ভারত তার শক্তির কারণে অপেক্ষাকৃত সতর্ক ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায়, যেখানে আঞ্চলিক সংঘাত, শক্তির প্রতিযোগিতা এবং জোট রাজনীতি নতুনভাবে গড়ে উঠছে, পাকিস্তান সেই শূন্যস্থানগুলো কাজে লাগিয়ে নিজেকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তাকে উপেক্ষা করা যায় না—এবং সেখানেই কৌশলগতভাবে ভারতকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন নিউজ কমেন্টারি ওয়েবসাইট এবং পডকাস্ট প্ল্যাটফর্ম ওয়ার অন দ্য রকসের বিশ্লেষণ

এমপি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...