হরমুজ এড়িয়ে জ্বালানি পরিবহনে নতুন পথ, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সিরিয়া

হরমুজ এড়িয়ে জ্বালানি পরিবহনে নতুন পথ, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সিরিয়া

হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে তেল পরিবহনের বিকল্প পথ হিসেবে আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সিরিয়া। ইরাক থেকে তেল সড়কপথে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর বাণিয়াসে নেওয়া হচ্ছে। এতে দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরির সুযোগ পাচ্ছে।

বর্তমানে ইরাকের বসরা এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক তেলবাহী ট্রাক সিরিয়ার মধ্য দিয়ে বাণিয়াস বন্দরের দিকে যাচ্ছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির সমুদ্রপথ ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় এই স্থলপথের গুরুত্ব বেড়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার তেলবাহী ট্রাক এই পথ ব্যবহার করছে।

বিজ্ঞাপন

সিরিয়ার অবস্থান এ ক্ষেত্রে বড় সুবিধা দিচ্ছে। দেশটি ইরাক, তুরস্ক, জর্ডান এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যে একটি ভৌগোলিক সংযোগ তৈরি করেছে। দেশটির মরুভূমির একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দিয়ে এখন পূর্ব দিক থেকে তেলবাহী ট্রাক পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরের দিকে যাচ্ছে। একই পথে উত্তর দিকে তুরস্ক এবং দক্ষিণে জর্ডানের সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে।

সিরিয়ার কর্মকর্তাদের মতে, দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে অবস্থিত। দীর্ঘদিনের যুদ্ধের কারণে এই ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু বর্তমানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় বাণিজ্যিক যানবাহন ও তেলবাহী ট্রাক চলাচল বাড়ছে।

তেল পরিবহনে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা

ইরাকের জন্য এই পথের গুরুত্ব আরও বেশি। দেশটির তেল রপ্তানির বড় অংশ ঐতিহ্যগতভাবে পারস্য উপসাগরীয় সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধ ও জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি হওয়ায় বিকল্প রুটের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

সিরিয়া হয়ে বাণিয়াস বন্দরে তেল নিয়ে গেলে সেখান থেকে ভূমধ্যসাগরীয় সমুদ্রপথ ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো যায়। এ কারণে সিরিয়া এখন শুধু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ নয়, বরং সম্ভাব্য আঞ্চলিক জ্বালানি ও পরিবহন করিডোর হিসেবেও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তবে এই ব্যবস্থা এখনো বড় ধরনের অবকাঠামোগত সমস্যার মুখে রয়েছে। সিরিয়ার অনেক সড়ক ভাঙাচোরা। অতিরিক্ত তেলবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে দুর্ঘটনাও বাড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এই পথকে কার্যকর রাখতে সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।

পাইপলাইন তৈরির পরিকল্পনা

শুধু ট্রাকের ওপর নির্ভর না করে ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যে নতুন পাইপলাইন তৈরির সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। এমন পাইপলাইন চালু হলে বিপুল পরিমাণ তেল দ্রুত ও কম খরচে পরিবহন করা সম্ভব হবে। তবে এর জন্য বড় বিনিয়োগ, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা প্রয়োজন।

সিরিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর অবস্থাও বড় বাধা। দেশটির আল-ওমর তেলক্ষেত্রের উৎপাদন যুদ্ধ ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে আগের সর্বোচ্চ উৎপাদনের মাত্র এক-দশমাংশে নেমে এসেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিরও নতুন যন্ত্রপাতি ও বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার নতুন সুযোগ

প্রায় এক দশকের সংঘাত সিরিয়ার অর্থনীতি ও অবকাঠামোকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন হরমুজ সংকট দেশটির সামনে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। তেল পরিবহনের পাশাপাশি সড়ক, বন্দর, গুদাম, পাইপলাইন ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সিরিয়া আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

তবে এই সম্ভাবনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হলে সিরিয়াকে নিরাপত্তা, অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।

হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট চলতে থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোও বিকল্প পরিবহনপথ খুঁজতে আরও আগ্রহী হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইরাক-সিরিয়া স্থলপথ এবং বাণিয়াস বন্দর ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট হয়ে উঠতে পারে।

ফলে একদিকে হরমুজ প্রণালির সংকট বিশ্ব জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে সেই সংকটই যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার সামনে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে।

সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন