আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জেলা প্রশাসকদের তালিকা (ডিসি ফিটলিস্ট) তৈরি করা হয়েছে। এ তালিকা করা হয়েছে ২৫, ২৭ ও ২৮তম ব্যাচের দেড়শ’ কর্মকর্তার সমন্বয়ে। ইতোমধ্যেই প্রধান উপদেষ্টা এ তালিকা অনুমোদন করেছেন। এদের মধ্য থেকে পর্যায়ক্রমে জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগ দেওয়া হবে, যারা আগামী নির্বাচনের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এবারের ডিসি ফিটলিস্ট তৈরির ক্ষেত্রে ২০১৪ সালের প্রার্থীবিহীন ভোট, ২০১৮ সালের রাতের ভোট এবং ২০২৪ সালের ডামি ভোটের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সামনের নির্বাচনটি কাঙ্ক্ষিত মানের স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার মতো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কর্মকর্তাদের ডিসি পদে পদায়নের জন্য তালিকায় রাখা হয়েছে। নির্বাচনের সময় তারা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। ডিসি পদায়নের পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাজানো হবে মাঠ প্রশাসন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন শাখা জানিয়েছে, বর্তমানে জেলা প্রশাসক পদে নিয়োজিত কর্মরতদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের ২৪তম ব্যাচের ২৬ জন, ২৫তম ব্যাচের ২৫ জন এবং ২৭তম ব্যাচের ১৩ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। ২৪তম ব্যাচের ২৬ জনের মধ্যে ২১ জনকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাসহ সবাইকে মাঠ থেকে তুলে আনা হবে। জেলা প্রশাসকের শূন্য পদগুলোতে ফিটলিস্ট থেকে ক্রমানুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হবে।
ডিসি ফিটলিস্ট তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২৫, ২৭ ও ২৮তম ব্যাচের প্রায় চারশ’ কর্মকর্তা ডিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগ্রহ দেখিয়ে ভাইবায় অংশ নিয়েছেন। এবার ভাইবা নেওয়ার সময় কর্মকর্তারা কতটা দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন এমন বিষয়গুলোকে খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে।
মাঠপ্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, ২৫তম ব্যাচের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে। তারা চাকরিতে যোগ দেন ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট। আর ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা চাকরিতে যোগ দেন ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়া ২৮তম ব্যাচের কর্মকর্তারা চাকরিতে যোগ দেন ২০১০ সালের ১ ডিসেম্বর।
প্রশাসন ক্যাডারের এ তিন ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে মাঠ প্রশাসন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন এমন কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মচারীদের পদায়ন নীতিমালা-২০২২ শিথিল করা হয়েছে এবারের ডিসি ফিটলিস্ট তৈরির ক্ষেত্রে। এ নীতিমালা অনুযায়ী ডিসি ফিটলিস্ট প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক, এডিসি, জেলা পরিষদের সচিব, পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ইউএনও উভয় পদে মোট ন্যূনতম দুই বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
এ নীতিমালা শিথিলের বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিগত সরকারের সময় যেসব কর্মকর্তা মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন তাদের সঙ্গে ওই সরকারের কোনো না কোনো পর্যায়ের যোগসাজশ থাকতে পারে। সব ধরনের যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকার পরও আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি অনুগত না থাকায় কেউ কেউ তখন মাঠ প্রশাসনে পদায়ন হতে পারেননি। এসব কারণে এবার ডিসি ফিটলিস্ট তৈরির সময় ২০২২ সালের নীতিমালা শিথিল করা হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, ২৫, ২৭ ও ২৮তম ব্যাচের মধ্যে জেলা প্রশাসক হিসেবে যারা এর আগে পদায়ন হয়েছে তাদের বাদ রেখে বাকি সবাইকে পরীক্ষায় ডাকা হয়েছিল। বর্তমানে তিন ব্যাচের প্রায় ৭শ’ কর্মকর্তা রয়েছেন। এদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন পাঁচ থেকে সাড়ে ৫শ’র মতো কর্মকর্তা। চূড়ান্তভাবে দেড়শ’ জনের তালিকা করা হয়েছে। যে জেলায় ডিসির পদ শূন্য হবে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ওই জেলার বিপরীতে কর্মকর্তার নাম লিখে পদায়নের জন্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সার-সংক্ষেপ পাঠাবে। প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনের পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
ফিটলিস্ট থেকে কবে নাগাদ জেলা প্রশাসকদের পদায়ন হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মুখলেস উর রহমান আমার দেশকে বলেন, আমাদের দায়িত্ব যতটুকু তা আমরা করেছি। বাকিটা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। সরকার যখন যে সিদ্ধান্ত দেবে, আমরা সেটাই বাস্তবায়ন করব।
নির্বাচনকালীন মাঠ প্রশাসন কেমন হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে এ সিনিয়র সচিব বলেন, আমাদের সামনে অতীতের বেশ কয়েকটি খারাপ উদাহরণ রয়েছে। কাজেই আমাদের সব বিষয় মাথায় রেখে মাঠ পর্যায়ে একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও নিষ্ঠাবান প্রশাসন গড়ায় পূর্ণ মনযোগ দিতে হচ্ছে।
আগামী জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে মাঠ পর্যায়ে একটি দক্ষ প্রশাসন গঠন জরুরি বলে মনে করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মো. ফিরোজ মিয়া আমার দেশকে বলেন, বিগত তিনটি নির্বাচনে দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। সামনের নির্বাচনে দেশের তরুণ ভোটাররাসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ভোট দিতে প্রবলভাবে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। ফলে সরকার ও প্রশাসনের ওপর অনেক চ্যালেঞ্জ ভোট সুষ্ঠু করার জন্য। নির্বাচনকালীন প্রশাসনে যেসব কর্মকর্তা ডিসির দায়িত্বে থাকবেন তাদের চিন্তায় সৎ হতে হবে। পাশাপাশি দক্ষ, যোগ্য, চৌকস ও নিরপেক্ষ হতে হবে। তারা কোনোভাবে নতজানু হলে চলবে না। ডিসিদের পাশাপাশি নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত অন্য কর্মকর্তাদেরও একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপর একটি বড় দায়িত্ব, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার বিষয়ে। সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে একটি দক্ষ ও যোগ্য মাঠ প্রশাসন। জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) নির্বাচনকালীন রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় একটি জেলার গোটা প্রশাসনের সব ক্ষমতার অধিকারী। কাজেই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার বিষয়ে একজন ডিসির ওপর অনেককিছু নির্ভর করে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে প্রশাসন সাজাতে পারবে, রাজনৈতিক সরকারগুলোর পক্ষে সেটা সম্ভব হয় না। কারণ রাজনৈতিক সরকারগুলো রাজনীতিটাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
বিগত তিনটি নির্বাচনের উদাহরণ টেনে বদিউল আলম জানান, গোটা দেশবাসী দেখেছে— ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন কেমন হয়েছে। ওই সময় ডিসিরা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করলেও সরকারের ইচ্ছা পূরণ করে গেছেন। জনগণের ভোটাধিকারের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি। বিগত তিনটি বিতর্কিত ও ভোটাধিকার হরণের নির্বাচনের বিষয়গুলোকে মাথায় রেখেই অন্তর্বর্তী সরকারকে ডিসি পদায়ন করতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


