রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অন্যতম ঘাতক মেজর (অব.) মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেনকে। গত বুধবার গভীর রাতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে গ্রেপ্তার করে। যে ফ্ল্যাট থেকে মোজাফফরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেটি তার শ্বশুরের কাছ থেকে পাওয়া। ভবনের চতুর্থ তলায় থাকতেন মোজাফফর। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এই চাঞ্চল্যকর খবরটি প্রকাশ্যে আসতেই দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
জানা গেছে, সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া শেষে মোজাফফরকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের একটি দলের কাছে যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে হস্তান্তর করা হয় বলে রাতে ডিএমপির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
গ্রেপ্তার ও সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি প্রধান) শফিকুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, বনানীর ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে বুধবার রাতে পলাতক মুজাফফরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা করা হয় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়াউর রহমানকে। মামলার তদন্ত এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় কতিপয় সেনা কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে আসে। সে সময়কার বিচারে পলাতক মেজর মোজাফফর হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই পলাতক এই আসামির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই ও গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে তার অবস্থান নিশ্চিত হলে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় মোজাফফর দেশে আসেন। তারপর থেকে নির্বিঘ্নে জীবন কাটিয়ে যাচ্ছিলেন।
যেভাবে ধরা পড়লেন ঘাতক
দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যার কোনো হদিস পাচ্ছিল না, সেই মোজাফফরকে ধরতে ডিবি পুলিশকে বিছাতে হয়েছিল এক নিপুণ জাল। দীর্ঘদিন ধরে তার গতিবিধি ও যোগাযোগের ওপর ছায়া নজরদারি চালাচ্ছিল ডিবির একটি বিশেষ টিম। অবশেষে গত বুধবার মধ্যরাতে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বনানী ডিওএইচএসের ওই বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ।
অভিযান-সংশ্লিষ্ট ডিবির সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, গ্রেপ্তারের মুহূর্তে মোজাফফর চরম বিভ্রান্ত ও অপ্রস্তুত ছিলেন। বৃদ্ধ বয়সের সুযোগ নিয়ে এবং অত্যন্ত সাধারণ পোশাক পরে তিনি সেখানে শ্বশুরের দেওয়া ফ্ল্যাটে ছদ্মবেশে অবস্থান করছিলেন। এ বিষয়ে ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে কৌশল অবলম্বন করা হয়। বলা হয়, আগতরা তার মেয়ের অফিস কলিগ। মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন তারা। তখন মোজাফফর বলেন, ‘মেয়ের সঙ্গে কী কথা, তা আমার সঙ্গে বলুন।’ তখন ডিবির কর্মকর্তা বললেন, আমি আপনার কাছে বলতে পারি না। আপনি কে—জিজ্ঞেস করলে মোজাফফর বলেন, আমি তার বাবা। এরপরই ডিবি নিশ্চিত হয় তিনিই সেই পলাতক মোজাফফর।
পাশাপাশি মোজাফফরের নাকের পাশে একটি এবং নিচে একটি কালো আঁচিল থাকার বিষয়ে তথ্য ছিল ডিবির কাছে। সে অনুযায়ী সার্বিক বর্ণনা ও তথ্য মিলে গেলে ওই বাড়ির নিচেই অবস্থান করা ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ডিবি টিম ভবনের চতুর্থ তলা (লিফট-৪) থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে।
অবশ্য পুলিশ যখন তার আসল পরিচয় জানতে চায়, তিনি প্রথমে তা অস্বীকার করার চেষ্টা করেন এবং নিজেকে একজন সাধারণ ব্যবসায়ী হিসেবে জাহির করতে চান। কিন্তু ডিবির কাছে থাকা অকাট্য ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ ও পুরোনো ছবির সঙ্গে চেহারা মিলে গেলে তিনি পুরোপুরি ভেঙে পড়েন। কোনো ধরনের প্রতিরোধ গড়ার সুযোগ না পেয়ে তিনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। এ সময় বাসায় থাকা তার মেয়ে কিছুটা সময় চেষ্টা করেছিলেন তার বাবাকে ছাড়াতে। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত রাত সোয়া ১০টার দিকে ওই বাসা থেকে মোজাফফরকে গ্রেপ্তার করে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বুধবার রাতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম ও ডিএমপি কমিশনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট চ্যানেলে সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি জানান। পরে যথাযথ চ্যানেলের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর কাছেও জানানো হয়।
ভারতে অবস্থান, ছদ্মনামের আড়ালে ঘাতক
গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮১ সালের ওই হত্যাকাণ্ডের পর যখন সেনাবাহিনী পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়, তখন সুচতুর মোজাফফর কৌশলে সীমান্ত পাড়ি দেন। তিনি ভারতে দীর্ঘ সময় ধরে আত্মগোপনে ছিলেন। ভারতে থাকা অবস্থায় তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, ভারতে অবস্থানকালে গ্রিল কারখানার ব্যবসা করতেন ঘাতক মোজাফফর।
দেশে ফেরা ও ফ্যাসিবাদী সরকারের ছত্রছায়া
মোজাফফর যে শুধু ভারতেই ছিলেন তা নয়। বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের আমলে রাজনৈতিক সমীকরণের সুযোগ নিয়ে তিনি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বিগত দিনে তিনি দেশের ভেতরেই বেশ সুরক্ষিতভাবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর চোখের সামনেই নির্বিঘ্ন জীবনযাপন করে আসছিলেন। প্রশাসনের উপর মহলের পরোক্ষ উদাসীনতা বা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের কারণেই তিনি এতদিন রাজধানীতে বহাল তবিয়তে লুকিয়ে থাকতে পেরেছিলেন বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।
যেহেতু তিনি একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং সামরিক আদালতের সাজাপ্রাপ্ত আসামি, তাই ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের পর কোনো কালক্ষেপণ না করে সেনাবাহিনীর হেফাজতে পাঠিয়েছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লে. কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, সেনাবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করেই এই পলাতক মেজরের ক্ষেত্রে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
নেট দুনিয়ায় ঝড় : ইতিহাসের দায়মুক্তি
মোজাফফর হোসেনের গ্রেপ্তারের খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফেসবুক এবং ইউটিউবে আসার পর থেকে নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ফেসবুকের বিভিন্ন সংবাদভিত্তিক পেজ ও গ্রুপে হাজার হাজার মানুষ নানা মন্তব্য করছেন। অনেকেই লিখেছেন, পাপ কখনো বাপকেও ছাড়ে না, ৪৫ বছর পর হলেও কাঙ্ক্ষিত বিচার দেখতে পাচ্ছি। ইউটিউবের বিভিন্ন রাজনৈতিক টকশো এবং বিশ্লেষকদের ভিডিওতে এই গ্রেপ্তারকে দেশের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মতে, এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অন্যতম অন্ধকার ও অমীমাংসিত অধ্যায়ের আংশিক দায়মুক্তি ঘটল। এখন পুরো দেশ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সামরিক আদালতের মাধ্যমে এই ধুরন্ধর ও নৃশংস খুনির চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকরের দৃশ্য দেখার জন্য।
অনেকেই এটিকে দীর্ঘদিনের একটি বহুল আলোচিত মামলার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। একইসঙ্গে পুরো ঘটনার বিচারিক পরিণতি এবং সামরিক আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়েও নানা আলোচনা চলছে। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন—হত্যাকাণ্ডের সাড়ে চার দশক পর এই মূল আসামি ধরা পড়া কেবল একটি অমীমাংসিত মামলার অগ্রগতিই নয়, বরং ইতিহাসের দায়মুক্তির পথেও এক বড় মাইলফলক। নেটিজেনদের অনেকে বলেন, জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেনাদরবারে এই পলাতক খুনির চূড়ান্ত আইনি পরিণতি কী হয়, তা দেখার জন্য।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


