দেশে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৬০টি ইঞ্জিনচালিত নৌযান থাকলেও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অধীনে নিবন্ধিত মাত্র ২২ হাজার ২৯৮টি। ফলে ৯০ শতাংশেরও বেশি নৌযানই কার্যত ‘অবৈধ’। এসব নৌযান অনুমোদিত নকশা, সরঞ্জাম এবং জনবলের নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়া ছাড়াই চলাচল করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন বিস্ফোরক তথ্য নৌপথে একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে ৯০ শতাংশ নৌযান নিবন্ধন না হওয়ায় সরকার হারাচ্ছে বিপুল অংকের রাজস্ব।
সম্প্রতি নৌপথে চলাচল করা নৌযানের সংখ্যা শনাক্ত করতে পরিচালিত ‘নৌযান শুমারি’তে প্রাথমিকভাবে এমন বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে। জরিপের এই প্রাথমিক তথ্য নৌপথের নিরাপত্তা সমস্যাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। নৌপথে প্রায়ই অবৈধ নৌযানের সংঘর্ষের খবর আসলেও সরকারকে তা নিয়ে মাথা ঘামাতে দেখা যায় না। তবে গত ঈদুল ফিতরের সময় সদরঘাটে দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চের সংঘর্ষে দুই ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যুর পর নতুন সরকার নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নড়েচড়ে বসে— এমন এক প্রেক্ষাপটে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বড় ধরনের এই জরিপ পরিচালিত হলো।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের ‘নৌযানের ডাটাবেইজ তৈরি ও নৌযান ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ’ প্রকল্পের আওতায় এই জরিপটি পরিচালনা করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। ইঞ্জিনচালিত সব নৌযানের সংখ্যা একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুতের জন্য গত ৪ থেকে ১৭ মে সারাদেশে জরিপের ‘লিস্টিং অপারেশন’ পরিচালিত হয়। এতে প্রায় ২৫ ধরনের নৌযানের তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— কার্গো, বাল্বহেড, যাত্রীবাহী লঞ্চ, স্পিডবোট, ট্রলার, প্রেজার, ফেরি এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যবহৃত নানাপ্রকার ইঞ্জিনচালিত নৌযান।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৮৫৪টি যাত্রীবাহী লঞ্চ, ৭৮৪টি যাত্রীবাহী নৌযান, ৩ হাজার ৮৫৮টি পণ্যবাহী নৌযান, ৮ হাজার ৪১৫টি বালুবাহী নৌযান, ১ হাজার ৫১৭টি স্পিডবোট, ৬৭৬টি বার্জ, ২ হাজার ৪০৯টি ড্রেজার এবং ৭টি ভাসমান হাসপাতাল রয়েছে।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শফিকুর রহমান আমার দেশকে বলেন, ১০ ব্রেক হর্স পাওয়ারের বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন সব মোটরচালিত নৌযান তাদের দ্বারা নিবন্ধিত হয়ে থাকে। পন্টুন ও বার্জের মতো অন্যের দ্বারা চালিত অ-মোটরচালিত নৌযানগুলোও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন বিধি অনুসারে নিবন্ধিত হয়।
তবে পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাঠ পর্যায়ের সংগৃহীত প্রাথমিক তথ্য বলছেন, দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌযান ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৬০টি, ঘাটভিত্তিক নৌযানের সংখ্যা ১ লাখ ৭৩ হাজার ৯৪৪টি এবং খানাভিত্তিক নৌযানের সংখ্যা ৭০ হাজার ৭১৬টি। তবে পার্বত্যসহ কিছু দুর্গম এলাকার নৌযানের তথ্য সংগ্রহের কাজ এখনো বাকি থাকায় এই সংখ্যা সামান্য বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি নৌযান তৈরির আগে নকশার অনুমোদন নিতে হয়। সেখানে নৌ পরিবহনের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়া ছাড়াই ছাড়াই অনেক নৌযান তৈরি হচ্ছে এবং তা যথারীতি চলাচলও করছে। এমন নৌযানগুলোকে নিরাপত্তার দিক দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মীর তারেক আলী আমার দেশকে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, রেজিস্টারড নৌযান এবং রেজিস্টারড যোগ্য কিন্তু রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আসে নাই— এর সংখ্যা জানতে হলে অবশ্যই একটা শুমারি করতে হবে। এখন দেশে প্রথমবারের মতো নৌযান শুমারি হওয়া অবশ্যই একটা ইতিবাচক বিষয়।
পরিসংখ্যান ব্যুরো ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সারা দেশে নৌযানের তালিকাভুক্তির কার্যক্রমে মোট ১ হাজার ২৯৩ জন তথ্য সংগ্রহকারী কাজ করেছেন। তথ্য সংগ্রহের গুণগত মান নিশ্চিত করতে ৮৫ জন উপজেলা শুমারি সমন্বয়কারী, ৬৩ জন জেলা শুমারি সমন্বয়কারী এবং ৮ জন বিভাগীয় শুমারি সমন্বয়কারী কর্মকর্তা পুরো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


স্থানীয় সরকারে ‘রক্তপাতহীন’ ভোট করতে চায় ইসি