আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিএনপি দেবে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের রূপরেখা

জাহিদুল ইসলাম

বিএনপি দেবে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের রূপরেখা

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, এবারের ইশতেহার শুধু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির দলিল নয়—বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও মানবসম্পদ রূপান্তরের একটি সমন্বিত রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। এতে তরুণ ও যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠন ও তরুণ প্রজন্মকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন–২০৩০, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১ দফা, জুলাই জাতীয় সনদ ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা—এই চার স্তম্ভের আলোকে ইশতেহারটি প্রস্তুত করা হচ্ছে। সব দিক সমন্বয় করে এমন একটি দলিল তৈরির চেষ্টা চলছে, যা আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেবে।

বিজ্ঞাপন

ইতিমধ্যে ইশতেহারের অংশ হিসেবে দেশ গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে একটি কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে বিএনপি। গত ৭ থেকে ১৩ ডিসেম্বর আটটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে দলটি অঙ্গসংগঠন থেকে শুরু করে মূল দলের নেতাকর্মীদের জন্য ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। এই কর্মসূচি একদিকে ছিল প্রশিক্ষণমূলক কর্মশালা, অন্যদিকে এসব কর্মশালার মধ্য দিয়ে জনপরিসরে বিএনপি দল হিসেবে জনগণের জন্য কী করতে চায়, তার একটি সামগ্রিক রূপরেখা তুলে ধরা হয়। এ উপলক্ষে প্রকাশিত ৯টি লিফলেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী, কৃষক, কর্মসংস্থান, ক্রীড়া, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, জলবায়ু ও কৃষি, দুর্নীতি দমনসহ বিভিন্ন খাতে বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একজন উপদেষ্টা জানান, এবার ইশতেহারে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পরামর্শে তরুণ প্রজন্মকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সবার মতামতের ভিত্তিতে সংযোগ-বিয়োজন করছি। তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য ইশতেহারের চূড়ান্ত ভাষায় প্রতিফলিত হবে। নির্বাচনি প্রচার শুরুর পর একটি বড় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।

‘তারুণ্যের রূপরেখা’ মূল গুরুত্ব

এবারের ইশতেহারে তরুণ প্রজন্মকে আলাদা অধ্যায়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যার শিরোনাম রাখা হচ্ছে—‘তারুণ্যের রূপরেখা’। সারা দেশে বিএনপির আয়োজিত তারুণ্য সেমিনার ও মতবিনিময় সভা থেকে উঠে আসা প্রস্তাব ও প্রত্যাশা ইশতেহারে সংযুক্ত করা হয়েছে। তরুণদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা গড়ে তোলা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে তাদের সম্পৃক্ত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এতে স্থান পাচ্ছে।

ইশতেহারে ঘোষণা আসছে— ক্ষমতায় গেলে প্রথম ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। একই সঙ্গে চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষিত বেকারদের বেকার-ভাতা দেওয়া হবে। প্রতিটি জেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) গড়ে তোলার জন্য আর্থিক সহায়তা, স্টার্টআপ ফান্ড, আইটি ও আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ, বিদেশে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।

অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত

বিএনপি মনে করছে, প্রতি বছর দেশে প্রায় ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ ও প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎপাদন বাড়লেও কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। ফলে কৃষি খাত থেকে মানুষ শিল্প ও সেবা খাতে প্রবেশ করছে। এই বিশাল কর্মসংস্থান চাহিদা পূরণ করতে হলে শিল্পায়ন, আইটি ও অন্যান্য সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। এজন্য ইশতেহারে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে স্থিতিশীলতা আনার ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যারা ইতোমধ্যে দেশে বিনিয়োগ করেছেন, শিল্পকারখানা স্থাপন করেছেন তাদের আস্থা ফেরানো হবে, যাতে তারা পুনরায় বিনিয়োগে উৎসাহিত হন এবং একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা যায়।

কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ একে অপরের পরিপূরক। তাই ইশতেহারে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ই-কমার্স ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যে আলিবাবা ও অ্যামাজনের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের উদ্যোগ, ফ্রিল্যান্সারদের বৈধ লেনদেন নিশ্চিতে পেপ্যাল ও ওয়াইজ চালুর প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

রাষ্ট্র সংস্কার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার

ইশতেহারে ৩১ দফার আলোকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার রক্ষা ও দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি থাকছে। সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাতিল, পেপার ব্যালটে ভোট, জুডিশিয়াল কমিশন গঠন ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনঃপ্রবর্তনের কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিগত ১৫ বছরের অর্থপাচার ও দুর্নীতির তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা থাকছে।

কৃষি, পরিবেশ ও নদী পুনরুদ্ধার

কৃষি খাতকে কেন্দ্র করে ইশতেহারে বড় পরিকল্পনা যুক্ত করা হচ্ছে। বিএনপি মনে করে কৃষিনির্ভর দেশে কৃষিকে অর্থনীতিতে গুরুত্ব দিয়ে বড় পরিসরে কাজ করতে হবে। কৃষিপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেলে তার রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই লক্ষ্যে কৃষকদের কৃষি কার্ড, উপকরণের দাম কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, কৃষিঋণ সহজ করা, ধান-চাল কেনার স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনরুদ্ধার, সম্প্রদায়ভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন এবং আধুনিক তিস্তা ও গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ, ‘অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং’ ধান চাষ পদ্ধতি সম্প্রসারণ; প্রতিটি জেলায় কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাতে কোল্ড স্টোরেজ সংখ্যা বাড়ানো; জাতীয় সার্কুলার ইকোনমি’ মডেলে রিসাইক্লিং হাব, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র ও প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য ও কৃষিবর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে উৎপাদনে রূপান্তর করা; উন্নত মানের বীজ, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি সরাসরি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে যুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।

নারী, সংখ্যালঘু ও সামাজিক সুরক্ষা

নারী নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, নারী উদ্যোক্তা তহবিল, মাতৃত্বকালীন ভাতা বৃদ্ধি ও সহিংসতা প্রতিরোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রতিশ্রুতি থাকছে। প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। যা পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে দেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ডে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার পণ্য পাবে নারীরা। এছাড়া বয়স্ক ভাতা বৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, নিরাপত্তা সেল, ধর্মীয় উৎসবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকারও থাকছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মৌলিক পরিবর্তন

ইশতেহারে শিক্ষা খাতে আমূল পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো, স্কুল থেকেই ব্যবহারিক ও কারিগরি শিক্ষা চালু যেমন স্কুল পর্যায়ে আইটি, খেলাধুলা, আর্ট কালচার, ডেন্টাল হাইজিন, মেডিকেল টেকনিশিয়ান, প্রাইমারি থেকে বাংলা-ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, জার্মান, ফরাসি, জাপানি ও চীনা ভাষা চালু, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, হলের আবাসন সংকট নিরসন, লাইব্রেরি আধুনিকায়নসহ ইশতেহারে নানা প্রতিশ্রুতি থাকছে।

ইশতেহারে স্বাস্থ্যখাত নিয়ে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস-এনএইচসির আদলে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা’ প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বিনামূল্য প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির পাঁচ শতাংশের বেশি বরাদ্দ; প্রতিটি গ্রামে একাধিক পল্লী চিকিৎসক নিয়োগ, চিকিৎসা গবেষণা সুবিধা নিশ্চিত, ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন, জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও বিশেষায়িত স্তরের স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ, চিকিৎসা সেবা আরো উন্নত করার লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদি (এক থেকে তিন বছর), মধ্যমেয়াদি (এক থেকে পাঁচ বছর) এবং দীর্ঘ মেয়াদি (১০ বছর পর্যন্ত) প্রতিশ্রুতি থাকছে। এছাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সারাদেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। যেখানে প্রাধান্য পাবে নারীরা।

ইশতেহারের সংক্ষিপ্ত লিফলেটে পৌঁছাবে জনগণের কাছে

বিএনপি মনে করছে, বড় ইশতেহার সাধারণ মানুষের কাছে পুরোপুরি পৌঁছায় না। তাই মূল বিষয়গুলো সংক্ষেপে লিফলেট আকারে আগেভাগে জনগণের কাছে তুলে ধরা হবে। নির্বাচনি প্রচার শুরুর পর ইশতেহার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।

ইশতেহার প্রণয়ন নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার তৈরির কাজ চলমান আছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এটি নিয়ে কাজ করছেন। দেশবাসীর সামনে এটা দলের আগামীর দিনের প্রতিশ্রুতি। ইশতেহার তৈরির কাজ শেষ হলে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা করে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন