২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়েন মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা। এরপর থেকে ভারতে পলাতক হাসিনা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য চালিয়েছেন দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র।
এর মধ্যে চলতি বছরের ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক কর্মসূচি ও শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। ভারতীয় বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যমে হাসিনার দেওয়া সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ।
গত আগস্টে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য কর্মসূচি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা থাকলেও গত দুই মাসে দলটির প্রকাশ্য তৎপরতা তুলনামূলক কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র। মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের কর্মসূচির খবর কম পাওয়া গেলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এজন্য তারা বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে মিটিং করছেন।
গত এক মাসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নামে পরিচালিত বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্টের পোস্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে। ডিসেম্বরেই হাসিনা ফিরছেন এ ধরনের প্রচার চালাচ্ছে এসব সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে দলীয় অবস্থান এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারা যেকোনো উপায়ে ডিসেম্বরে হাসিনাকে দেশে ফেরাতে তৎপর।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম রাসেল বলেন, একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ করতে পারিনি কিন্তু এবার ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ফেরাতে যুদ্ধ করব।
ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে ফেরানোর গুঞ্জন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, কুমিল্লা সীমান্ত ব্যবহার করে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মী অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে যান।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লার গডফাদার বাহার পালিয়ে গেলেও এখনো তার রাজত্বের ছায়া রয়ে গেছে কুমিল্লা নগরজুড়ে। কুমিল্লার বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা এমপি বাহারের পালানোর কাজে সহযোগিতা করেছিল বলে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য রয়েছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, কুমিল্লা বিএনপির রাজনীতিতে বাহারের আধিপত্যের ছায়া রয়েছে। আওয়ামী লীগ ফিরলে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা হামলা মামলা থেকে বাঁচার তাগিদেই বাহারের সুদৃষ্টিতে থাকার চেষ্টা করছেন।
আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন অন্যান্য জেলার তুলনায় কুমিল্লায় পলাতক এমপি বাহারের নেতাকর্মীরা খুবই শক্তিশালী। এজন্য হাসিনা যদি কোনো কারণে স্থলপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন তাহলে ত্রিপুরা কুমিল্লা সীমান্তটি বেছে নিতে পারেন বলে ধারণা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ম্যাসাকারের পরিকল্পনা
দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। সব রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু এই মহাসড়ক। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কজুড়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কজুড়ে তাণ্ডব চালানোর পরিকল্পনাও করছেন পলাতক হাসিনা।
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি আসনের সাবেক এমপি ও মন্ত্রীদের নেতৃত্বে আন্দোলনে নামবে নেতাকর্মীরা। এজন্য গঠন করা হয়েছে বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক টিম। এসব টিম মাঠে কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
অর্থ জোগান দেবে আওয়ামীপ্রেমী ব্যবসায়ীরা
ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অর্থের জোগান দিতে গত ১৭ বছরের আওয়ামী সুবিধা নেওয়া বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবির খবর পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, বিদেশি বিভিন্ন মোবাইল নম্বর থেকে মেসেজ পাঠিয়ে ডিসেম্বরের আন্দোলনের জন্য অর্থ চাচ্ছে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনলাইন পেজ।
বিএনপি জামায়াত এনসিপির অবস্থান
১৭ বছর বাংলাদেশের মানুষের টুটি চেপে ধরা ফ্যাসিবাদী শক্তি আওয়ামী লীগের পতন ঘটানো সব রাজনৈতিক দলের অবস্থান কী হতে পারে—এ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে অরাজকতা করার চেষ্টা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ডিসেম্বর বলেন, নভেম্বর বলেন, জানুয়ারি বলেন—হাসিনা কখনো দেশে ফিরবে না।
কুমিল্লা উত্তর জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল মতিন বলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আসবে এটা আমি বিশ্বাস করি না। হাসিনা মৃত্যুকে খুব বেশি ভয় পায়। আর তার নেতাকর্মীরাও ডিসেম্বরে মাঠে নেমে অরাজকতা করবে—এমন ক্ষমতা তাদের নেই। আমরা প্রস্তুত আছি তাদের মোকাবিলা করার জন্য।
নেতাকর্মীদের আগামী দুই মাস রাজপথে সদা প্রস্তুত ও সক্রিয় থাকার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কুমিল্লা মহানগর সদস্য সচিব মাসুমুল বারী কাওসার বলেন, ডিসেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের যেকোনো ষড়যন্ত্র, অরাজকতা এবং দেশবিরোধী, জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে এনসিপি কুমিল্লা মহানগর।
তিনি বলেন, দেশ ও জনগণকে অস্থিতিশীল করতে চাইলে এনসিপির নেতাকর্মীরা ফ্যাসিস্ট দোসরদের একচুলও ছাড় দেবে না। জনগণের জানমাল রক্ষা এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদের যেকোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে আমরা রাজপথে আছি এবং থাকব। কুমিল্লায় কোনো ধরনের অরাজকতা হতে দেওয়া হবে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি কেমন
পলাতক ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ডিসেম্বরে দেশে, বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার বিভিন্ন অংশে অরাজকতা করতে পারে। এ বিষয়ে কোনো গোয়েন্দা তথ্য আছে কি না জানতে চাইলে কুমিল্লা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, আমাদের গোয়েন্দা টিম এ বিষয়ে কাজ করছে। যেকোনো অরাজক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা প্রস্তুত রয়েছি।
সব মিলিয়ে ডিসেম্বরকে ঘিরে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক তৎপরতা, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কুমিল্লার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা বাড়ছে।
এমই
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


