চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বিশ্বব্যাপী দক্ষ জনশক্তির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। রোবটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বায়োটেকনোলজি, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক উৎপাদন খাতে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তবে আনুষ্ঠানিক কারিগরি প্রশিক্ষণ পেয়েছে দেশের মোট শ্রমশক্তির মাত্র ১৫ শতাংশের কিছু বেশি । বড় আকারের তরুণ জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে পিছিয়ে রয়েছে দেশ। ফলে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে খোদ শিক্ষাবিদদের মধ্যে।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার মান ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদরা। তারা জানান, এ অবস্থার থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে শুধু বক্তৃতা-বিবৃতি কিংবা বড় বড় কথায় সীমাবদ্ধ না থেকে নিতে হবে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। তাহলেই মানসম্মত শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে।
দেশের তৈরি পোশাকশিল্প এখনো বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি চামড়া, জাহাজ নির্মাণ, আইসিটি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রতিবছর ১০ লাখের বেশি মানুষ বৈদেশিক কর্মসংস্থানে গেলেও তাদের বড় অংশ অদক্ষ। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশগামী কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো গেলে রেমিট্যান্স আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
দেশে বর্তমানে ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক, ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ এবং শতাধিক বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে। তারপরও প্রশিক্ষণের মান, অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষক এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সংযোগের ঘাটতি রয়ে গেছে।
উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করেই দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব। জার্মানির ডুয়াল সিস্টেমে শিক্ষার্থীরা সপ্তাহের একাংশ ভোকেশনাল স্কুলে এবং বাকি সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নেয়। সরকার, শিল্পমালিক ও শ্রমিক সংগঠন যৌথভাবে এ ব্যবস্থা পরিচালনা করে।
ফিনল্যান্ডে সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষাকে সমান মর্যাদা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা প্রকল্পভিত্তিক কাজ, আধুনিক ওয়ার্কশপ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করে। সিঙ্গাপুরে শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী
কারিগরি কোর্স পরিচালিত হয়। কর্মজীবীদের জন্যও নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়াও কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। সরকার ও শিল্পগোষ্ঠীর অংশীদারত্বে সেখানে কারিগরি কলেজ ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
দেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার বড় অংশ এখনো সাধারণ ও সনদনির্ভর। ফলে একদিকে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প খাতে দক্ষ কর্মীর সংকট দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ভোকেশনাল শিক্ষা পরিচালনার অনুমোদন পাওয়া ৩,৪৪০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬২১টিতে দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি অথবা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪৩টি প্রতিষ্ঠানে এসএসসি ভোকেশনাল এবং ১৭৮টিতে দাখিল ভোকেশনাল কার্যক্রমের অনুমোদন রয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানে টানা পাঁচ বছর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি।
অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। কোথাও আধুনিক ল্যাবরেটরি ও যন্ত্রপাতির সংকট, কোথাও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত। ফলে কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাস্তবে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আব্দুর রাহিম সাকি বলেন, বিদ্যমান কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে সক্রিয় করতে হবে। ৩২৯টি উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ২৬৮টি উপজেলায় এসব কেন্দ্র রয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালুর আশা করা হচ্ছে।
এদিকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা উন্নয়নে বাংলাদেশকে ১৫ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এ কর্মসূচিতে মেকানিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল, তথ্যপ্রযুক্তি, সিভিল এবং খাদ্য ও কৃষি—এই পাঁচটি প্রযুক্তি ক্লাস্টারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। কর্মসূচির আওতায় অন্তত ১০ হাজার টিভিইটি শিক্ষকের দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে, যা আড়াই লাখের বেশি শিক্ষার্থীর ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পের চাহিদাভিত্তিক করতে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চীনের মতো বাংলাদেশেও শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি কোনো মডেল হুবহু অনুসরণ না করে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা প্রয়োগ করতে হবে। প্রথমে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং শিল্পভিত্তিক ইন্টার্নশিপ নিশ্চিত করা জরুরি।
কারিগরি শিক্ষাকে সামাজিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতেও উদ্যোগ প্রয়োজন। বৃত্তি, চাকরির সুযোগ, উদ্যোক্তা তহবিল এবং নারীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ চালু করা গেলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে বৈষম্য দূর করে দুটিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ শুধু সনদ নয়, হাতে-কলমে দক্ষতাই ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, শিল্পোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি।
উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে দেশের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মোহাম্মদ মনিরুল হাসান বলেন, বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে বিদ্যালয় পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ; ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলকভাবে বেসিক ট্রেড, ডিজিটাল লিটারেসি এবং উদ্যোক্তা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা; শিল্প ও শিক্ষার সমন্বয়; জার্মানির মতো প্রতিটি পলিটেকনিকের সঙ্গে নিকটবর্তী শিল্প এলাকার চুক্তি করা; শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ নিশ্চিত করা; আধুনিক অবকাঠামো, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ উপযোগী ল্যাব, থ্রিডি প্রিন্টার, সিএনসি মেশিন, সোলার প্যানেল স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া শিক্ষকদের মানোন্নয়নে শিল্প থেকে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে আনা এবং শিক্ষকদের বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা; পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়নে এনএসডিএর মাধ্যমে প্রতি দুই বছর পরপর পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা; আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন যেমন এনভিকিউ, সিটি অ্যান্ড গুইল্ডসর সঙ্গে সমন্বয়; সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিÑকারিগরি শিক্ষাকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ করার জন্য বৃত্তি, চাকরির নিশ্চয়তা এবং উদ্যোক্তা তহবিলের ব্যবস্থা করা; নারীদের অংশগ্রহণে নারীদের জন্য আলাদা ট্রেড যেমন গার্মেন্ট টেকনোলজি, হেলথ কেয়ার, আইটি সাপোর্টে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ আমার দেশকে বলেন, দেশ স্বাধীনের ৫৫ বছর পর ২০২৬ সালে এসে কেন আমরা এখনো সাক্ষরতা নিয়ে কথা বলব; এ সময়ে তো আমাদের কথা বলার কথা সার্টিফিক, ডিজিটাল কিংবা আর্টিফিশিয়াল লিটারেসি নিয়ে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য; আমরা এখনো বহুদূর পিছিয়ে আছি।
তিনি বলেন, আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা সব সময় দেখবেন শিক্ষা নিয়ে ভালো কথা বলেন, বাস্তবে তাদের ভূমিকা খুবই প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ তাদের কারণেই শিক্ষা এগোচ্ছে না; তারা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ভালো শিক্ষক তৈরি মনোভাব নেই। শিক্ষার বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে শিক্ষার ব্যয় যৎসামান্যই বাড়ানো হয়েছে। সেহেতু, বড় বড় কথা না বলে শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে প্রকৃত সফলতা আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে শিক্ষা অধিকার সংসদের সদস্য সচিব এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক শাহনেওয়াজ খান চন্দন বলেন, দক্ষ-মেধাবী শিক্ষক ও যথাযথ পাঠদান ছাড়া দক্ষ জনশক্তি ও বেকারত্ব দূর করার পরিকল্পনা অর্থহীন। এজন্য স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

