যুবদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে একের পর এক খুন

যুবদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে একের পর এক খুন

রাজধানী ঢাকা থেকে খুলনা, মাগুরা ও নারায়ণগঞ্জেÑসাম্প্রতিক সময়ে যুবদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে একের পর এক হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে। কোথাও গুলি করে হত্যা, কোথাও কুপিয়ে, আবার কোথাও প্রতিপক্ষকে সরাতে খুনি ভাড়া করার অভিযোগও উঠেছে। সর্বশেষ গত শনিবার খুলনার তেরখাদায় ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি রামীম বিশ্বাসকে গুলি করা হয়েছে।

এর আগে মাগুরায় যুবদল নেতা শাকের হোসেন এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ে দুই যুবদল নেতাকে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনায় চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ও সামনে আসছে। চাঁদাবাজি, ব্যবসা ও দরপত্রের নিয়ন্ত্রণ, জমি-ফুটপাত দখল এবং স্থানীয় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারÑবিভিন্ন স্বার্থের সংঘাতে এসব ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

তেরখাদায় গত শনিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে মধুপুর ইউনিয়নের পারহাজীগ্রামে হামলার শিকার হন রামীম বিশ্বাস (৩২)। তিনি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি। মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তার পাঁজর ও পিঠের পাশে গুলি লাগে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে। হামলার পেছনে কারা এবং কী উদ্দেশ্যে জড়িত, তা তদন্তাধীন।

একই দিন সন্ধ্যায় খুলনা নগরের দক্ষিণ টুটপাড়া এলাকায় মুদিদোকানি ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডুকে গুলি করা হয়। এ ঘটনায় চাঁদাবাজির সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে পুলিশ। একই দিনে পৃথক দুটি গুলির ঘটনায় নগর ও জেলার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

এর আগে বুধবার ভোরে মাগুরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস কাউন্টারে গুলি করে হত্যা করা হয় পৌর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক শাকের হোসেনকে (৩৯)। তিনি ওই কাউন্টারে দায়িত্ব পালন করতেন। প্রথমে তার মৃত্যু স্বাভাবিক বলে মনে হলেও মাথার পেছনে ক্ষতচিহ্ন দেখে পরিবারের সদস্যরা পুলিশকে জানান।

পরে ময়নাতদন্তে মাথার খুলির ভেতরে বুলেট পাওয়ার তথ্য জানায় পুলিশ। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার যুবদলের আরেক নেতাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে মাগুরায় মানববন্ধন ও ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধও করা হয়।

খুলনার দৌলতপুরে ১৬ মার্চ গুলিতে নিহত হন যুবদল নেতা রাশিকুল আলম রাশু। তিনি বালু ও ইটের ব্যবসা করতেন। গত আগস্টে রূপসার শ্রীরামপুরে ইটভাটায় গুলিতে নিহত হন ফখরুল শেখ। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে খুলনা জেলায় ৬৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেÑএর মধ্যে নগরীতে ৩৫টি। পুলিশের হিসাবে রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটায়ও একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

নারায়ণগঞ্জে দুই নেতা হত্যা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ে কয়েক দিনের ব্যবধানে দুই যুবদল নেতা খুন হন। গত ১৮ অক্টোবর রাতে রূপগঞ্জের ভোলাব ইউনিয়নের পাইস্কা কুলি মার্কেট এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিপন মিয়াকে (৪২)। তিনি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সহসভাপতি ছিলেন। পাশাপাশি কাঠের ব্যবসা করতেন। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় একটি ওয়াজ মাহফিলের আয়োজক কমিটিতে কার নাম থাকবে, তা নিয়ে দুপক্ষের বিরোধ হয়েছিল। সে বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে প্রাথমিক ধারণা।

এর মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে বৃহস্পতিবার রাতে সোনারগাঁয়ের চরকিশোরগঞ্জ এলাকায় হামলার শিকার হন ফকির জহিরুল ইসলাম (৪৮)। তিনি আড়াইহাজারের কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি। ফার্মেসি বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে একদল ব্যক্তি তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শনিবার নিহতের ভাগনে বাদী হয়ে ২১ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। মামলায় স্থানীয় ছাত্রদল নেতা মো. রিজভীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়াতে জহিরুলকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। তাকে হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।

রাউজানে যুবদল নেতা হত্যা

চট্টগ্রামের রাউজানে গত ১৩ জুন গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে। প্রকাশ্য বাজারে সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে। স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) ভাষ্য অনুযায়ী, বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা ঠেকাতে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারও করে এসআরবি।

বরিশালে যুবদলকর্মী খুন

গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে বরিশালের উজিরপুর-কোটালীপাড়া সীমান্তবর্তী পশ্চিম সাতলা এলাকায় কাওসার হাওলাদারকে (৩৭) নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলে এসে যুবদলকর্মী কাওসার হাওলাদার ও রাশেদ আমিন হাওলাদারের ওপর হামলা চালায়। জীবন বাঁচাতে তারা পাশের একটি ঘরে আশ্রয় নিলে হামলাকারীরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে কাওসারকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় নিহতের ভাই মোস্তফা হাওলাদার বাদী হয়ে গত শনিবার উজিরপুর মডেল থানায় ১৭ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

ঢাকায় টেন্ডার ও ফুটপাত নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব

বিএনপি গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যুবদলের বিভিন্ন সংঘাতের খবর পাওয়া যায়। গত ২৪ জুলাই মিরপুর-১৩ এলাকায় গুলিতে যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী নিহত হন এবং আহত হন আরো দুজন। গোয়েন্দা পুলিশের বক্তব্য, হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিলেন যুবদলের আরেক নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবু। তাকে হত্যার জন্য ২৫ লাখ টাকায় শুটার ভাড়া করার অভিযোগ তদন্তে উঠে আসে।

ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় ময়লা ব্যবস্থাপনার টেন্ডার, ফুটপাতের দোকান, ব্যবসা এবং একটি টিনশেড বাড়ির দখল নিয়ে বিরোধের জেরে বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মিরপুরে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যার ঘটনায়ও যুবদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের তথ্য সামনে আসে। ওই সময় দোকানে ঢুকে তাকে গুলি করার দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯ মাসে দেশে ১,০১৩টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭৩ জন। প্রতিবেদনে ৯৩১টি ঘটনায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক দলের সংঘাতের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) দিদারুল আলম বলেন, চাঁদাবাজি, দখল কিংবা হত্যার অভিযোগ উঠলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কঠোরভাবে আইনি পথ অবলম্বন করা উচিত। শুধু বহিষ্কার বা পদ স্থগিত করে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা যায় না। এক্ষেত্রে কয়েকটি পন্থা অবলম্বন করা উচিত। প্রথমত, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হামলায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রের উৎস, অর্থের জোগান এবং পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।

আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপকালে জুলাইয়ে রাজপথে থাকা যুবদলের সাবেক এক নেতা বলেন, যুবদলের অভ্যন্তরীণ এ খুনোখুনি ও চাঁদাবাজির দুষ্টচক্র ভাঙতে না পারলে এর রাজনৈতিক মূল্য চড়া হতে বাধ্য। জনসমর্থন ধরে রাখতে হলে নীতিনির্ধারকদের কঠোর ও আপসহীন নীতি গ্রহণ করতে হবে। যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নয়ন যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকার পরও তিনি প্রমোশন পেয়েছেন। তাহলে এটা কীসের বার্তা দেয়Ñপ্রশ্ন রাখেন জুলাই আন্দোলনে রাজপথে থাকা যুবদলের সাবেক ওই নেতা।

গত শনিবার খুলনায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের সফর চলাকালে যুবদল নেতা হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে আইজিপি বলেন, ‘চাঁদাবাজি যারা করে, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি তারা। হয় সন্ত্রাসী অথবা কোনো না কোনো ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা এ কাজগুলো করে। তাদের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ সাক্ষ্য দিতে চায় না; থানায় অভিযোগও করতে চায় না।’

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে কেউ বলছে, এদের ওপর বলপ্রয়োগ করা হোক। বলপ্রয়োগ করলে আবার বলা হয়, পুলিশ ফ্যাসিস্ট। বলপ্রয়োগ না করলে বলা হয় দুর্বল পুলিশ। সুতরাং এগুলো আমরা দেখতে চাই না।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, এখন পুলিশ মনোবল নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সব জায়গায় পুলিশের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সব সমস্যার তো রাতারাতি পরিবর্তন হবে না। অবস্থার তো এখন উন্নতি হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন