নিরাপদ খাদ্য পাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ

নিরাপদ খাদ্য পাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ
আমার দেশ গ্রাফিক্স

ক্ষুধা মেটানোর মতো খাবার আছে, কিন্তু তা কতটা নিরাপদ—সেই প্রশ্নই এখন বাংলাদেশের সব জায়গায়। চাল থেকে মাছ, ভোজ্যতেল থেকে দুধ, এমনকি রাস্তার খাবার ও রেস্তোরাঁর সালাদেও ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভারী ধাতু, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিরাপদ খাদ্য তাৎক্ষণিকভাবে ডায়রিয়া ও খাদ্যে বিষক্রিয়ার মতো রোগ সৃষ্টি করতে পারে; দীর্ঘ মেয়াদে কিডনি, স্নায়ুতন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। অথচ সীমিত জনবল, দুর্বল তদারকি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘাটতিতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। এ হিসেবে প্রতিদিন গড়ে ১১৫ জনের প্রাণহানি ঘটে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, দূষিত খাবারে থাকা ক্ষতিকর

ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী ও রাসায়নিক পদার্থের কারণে বিভিন্ন রোগ ছড়ায়। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক সেমিনারে বলা হয়েছিল, দেশের প্রায় পাঁচ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। নিরাপদ খাদ্যের ঘাটতি শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য নয়, বিদেশে খাদ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

সম্প্রতি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা গবেষণাগারের এক গবেষণায় পরীক্ষিত ২৩২টি চালের নমুনার মধ্যে ১৩১টিতে ক্রোমিয়াম, ১৩০টিতে ক্যাডমিয়াম ও সিসা এবং ৮৩টিতে আর্সেনিক পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ভারী ধাতু দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতিসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) পরীক্ষার তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, পরীক্ষিত নমুনায় দূষণের হার ২০২৩ অর্থবছরের সাড়ে আট শতাংশ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে ৩৩ দশমিক তিন শতাংশে পৌঁছেছে। তবে নমুনার সংখ্যা, সংগ্রহ পদ্ধতি ও দূষণের ধরন বিবেচনা না করে এ হারকে দেশের সামগ্রিক খাদ্যদূষণের প্রকৃত চিত্র হিসেবে দেখা ঠিক হবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ব্যাকটেরিয়া, রাসায়নিক ও বিষাক্ত উপাদানযুক্ত খাবার মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। ঘি, গুড়, মধু, মিষ্টি, হলুদ, মরিচের গুঁড়া, গুঁড়া দুধ, লবণের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি খাবার পরিষ্কার রাখা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা এবং নিরাপদ পানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পাঠ্যক্রমেও নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।

তেল, দুধ ও মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

খাদ্যদূষণের নতুন উদ্বেগ মাইক্রোপ্লাস্টিক। ২০২৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ঢাকার বাজার থেকে সংগ্রহ করা ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা বিশ্লেষণ করে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। খোলা তেলে এসব কণার পরিমাণ বোতলজাত তেলের তুলনায় বেশি ছিল।

২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ধরনের দুধেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় আড়িয়াল বিলের কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি মাছেও এসব কণার উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে।

গবেষকদের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণের বিভিন্ন পর্যায় থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যচক্রে প্রবেশ করতে পারে। তবে মানুষের শরীরে এসব কণার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণে আরো গবেষণা প্রয়োজন।

রাস্তার খাবারেও জীবাণুর ঝুঁকি

শুধু প্যাকেটজাত খাদ্য নয়, রাস্তার খাবার ও রেস্তোরাঁর পরিবেশিত খাবারেও জীবাণু দূষণের ঝুঁকি রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান গবেষক ড. লতিফুল বারীর গবেষণায় রাস্তার খাবার, সালাদ, জুস ও শরবতের নমুনায় ই-কোলাই, সালমোনেলা ও ভিব্রিওর মতো রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে।

গবেষণায় চানাচুর মাখা ও ছোলা-মুড়িতে ই-কোলাই, অ্যালোভেরা শরবতে সালমোনেলা এবং চটপটিতে ভিব্রিওর উপস্থিতি বা সংক্রমণের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অপরিচ্ছন্ন পানি, খোলা অবস্থায় খাবার রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানাকে এসব দূষণের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডল জানান, রান্না করা খাবার ও কাঁচা মাংস একসঙ্গে রাখা এবং দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা খাবারে রঙ মেশানোর মতো অনিয়ম তারা দেখেছেন। তার ভাষ্য, এক প্লেট ফুচকায় সাত কোটিরও বেশি ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব খাবারে মলমূত্রবাহিত জীবাণুও শনাক্ত হয়েছে বলে তিনি জানান।

বর্জ্য থেকে খাদ্যচক্রে ভারী ধাতু

বিভিন্ন গবেষণায় ঢাকার আমিনবাজার ও মাতুয়াইল, চট্টগ্রামের আনন্দবাজার এবং সিলেটের মগরা বাজারের ল্যান্ডফিলসংলগ্ন জলাশয় ও কৃষি জমির ফসলে ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, সিসা, নিকেল ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলেকট্রনিক ও ধাতব বর্জ্য থেকে এসব উপাদান মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বর্জ্য থেকে নির্গত দূষিত তরল বা লিচেটের মাধ্যমে ভারী ধাতু জলাশয় ও কৃষিজমিতে পৌঁছে খাদ্যচক্রে প্রবেশের আশঙ্কা রয়েছে।

২০১৮ সালে প্রকাশিত গবেষণায় বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকার গর্ভবতী নারীদের রক্তে সিসার উপস্থিতি পাওয়া যায়। একই বছরে ঢাকার ৫০০ শিশুর ওপর পরিচালিত আরেক গবেষণায় ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসা শনাক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সিসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর সংস্পর্শ শিশুদের স্নায়বিক বিকাশ ও স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

এসব ভারী ধাতু খাবার বা পানির মাধ্যমে শরীরে যাওয়ার ফলে মানুষের পরিপাকতন্ত্র, নিউরোলজিক্যাল সমস্যা থেকে শুরু করে ক্যান্সারও হতে পারে। গ্লোবাল ক্যানসার অবজারভেটরির তথ্য অনুসারে, ২০২০ সালে বাংলাদেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৭৫ জন নতুন ক্যানসারে আক্রান্ত এবং ১ লাখ ৮ হাজার ৯৯০ জন ক্যানসারজনিত মৃত্যু ঘটেছিল।

নজরদারিতে জনবল সংকট

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর সীমিত জনবলও বড় বাধা। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সচিব শ্রাবস্তী রায়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সীমিত জনবল দিয়ে বিপুলসংখ্যক হোটেল-রেস্তোরাঁ ও খাদ্যপ্রতিষ্ঠান তদারকি করতে হচ্ছে। বাধ্যতামূলক গ্রেডিং, নিয়মিত নজরদারি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা কার্যকর না হলে অভিযান চালানোর পরও পুরোনো পরিস্থিতি ফিরে আসতে পারে।

এদিকে গত ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা ও ভেজাল শনাক্তে ব্যবহৃত একটি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার পরিদর্শন করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে পরীক্ষাগারের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করেন। বর্তমানে আটটি মহানগরে এ ধরনের পরীক্ষাগারের মাধ্যমে কার্যক্রম চলছে এবং পর্যায়ক্রমে ৬৪ জেলায় তা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালের নিরাপদ খাদ্য আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি এবং উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার এবং পরীক্ষার ফল স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; উৎপাদক, ব্যবসায়ী, পরিবেশক ও ভোক্তা—সব পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে। জনসচেতনতা ও কঠোর নজরদারির সমন্বয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা না গেলে খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়লেও নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা কঠিন হবে। জনস্বাস্থ্যও বড় ঝুঁকির মুখেই থেকে যাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন