ঝড় আসার আগেই সতর্ক করবে এআই

ঝড় আসার আগেই সতর্ক করবে এআই
আমার দেশ গ্রাফিক্স

এতদিন আবহাওয়ার পূর্বাভাস তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে গাণিতিক সমীকরণ, আবহাওয়াবিষয়ক উপাত্ত এবং শক্তিশালী সুপার কম্পিউটার। এখন সেই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। বিপুল পরিমাণ আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই এমন সব ধরন ও সম্পর্ক শনাক্ত করতে পারে, যেগুলো প্রচলিত পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করতে অনেক বেশি সময় ও কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন হয়। ফলে ঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ, বৃষ্টিপাত, বাতাসের গতি এবং তাপমাত্রা সম্পর্কে দ্রুত পূর্বাভাস তৈরির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। লিখেছেন আরিফ বিন নজরুল।

এআই যেভাবে কাজ করে

বিজ্ঞাপন

আবহাওয়াবিদরা সাধারণত স্যাটেলাইট, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র, রাডার, সমুদ্রের বয়া, বায়ুচাপ পরিমাপক যন্ত্র এবং অন্যান্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। এসব তথ্যের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রচলিত সংখ্যাভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস পদ্ধতিতে বায়ুমণ্ডলের পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম ও গাণিতিক সমীকরণ ব্যবহার করে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি গণনা করা হয়।

এআইভিত্তিক মডেল ভিন্নভাবে কাজ করে। অতীতের বিপুলসংখ্যক আবহাওয়ার তথ্য থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মডেলগুলো শেখে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতির পর বায়ুমণ্ডলে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে। বর্তমান আবহাওয়ার অবস্থা বিশ্লেষণ করে তারা পরবর্তী সময়ের সম্ভাব্য পরিস্থিতি অনুমান করে। এরপর সেই পূর্বাভাসের ভিত্তিতে আরো পরবর্তী সময়ের আবহাওয়ার চিত্র তৈরি করা যায়।

তবে এআই কোনো জাদুকরি ব্যবস্থা নয়, যা আকাশের দিকে তাকিয়েই ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে। এর কার্যকারিতা নির্ভর করে প্রশিক্ষণের উপাত্ত, বর্তমান আবহাওয়ার তথ্য, মডেলের সক্ষমতা এবং পূর্বাভাস যাচাইয়ের ওপর। কোনো অঞ্চলে পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য কম থাকলে কিংবা আবহাওয়ার পরিস্থিতি প্রশিক্ষণের সময় দেখা পরিস্থিতির চেয়ে অস্বাভাবিক হলে পূর্বাভাসে ভুল হতে পারে। তাই এআইয়ের পূর্বাভাসকে বাস্তব পর্যবেক্ষণ ও আবহাওয়াবিদদের বিশ্লেষণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।

সুপার কম্পিউটার ছাড়াই এআইয়ের পূর্বাভাস

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এআইয়ের অগ্রগতির উল্লেখযোগ্য উদাহরণ গুগল ডিপমাইন্ডের তৈরি ‘গ্রাফকাস্ট’ (GraphCast)। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এই মডেল কয়েক দশকের পুনর্বিশ্লেষিত আবহাওয়ার তথ্য ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ পেয়েছে। গবেষকদের মূল্যায়নে, নির্দিষ্ট পরীক্ষায় প্রচলিত উচ্চমানের পূর্বাভাসব্যবস্থা ইউরোপীয় মধ্যমেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রের (ECMWF) এইচআরইএসের তুলনায় ১ হাজার ৩৮০টি পরীক্ষিত চলক ও পূর্বাভাস-সময়ের সমন্বয়ের ৯০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে গ্রাফকাস্ট ভালো ফল দেখিয়েছিল। মডেলটি প্রায় ২৮ কিলোমিটার ব্যবধানের গ্রিডে বৈশ্বিক আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান বিশ্লেষণ করতে পারে এবং বিশেষায়িত হার্ডওয়্যারে ১০ দিনের পূর্বাভাস তৈরি করতে এক মিনিটেরও কম সময় নিতে পারে। প্রচলিত পদ্ধতিতে একই ধরনের পূর্বাভাস তৈরিতে অনেক বেশি কম্পিউটিং সময় প্রয়োজন হতে পারে। তবে এই তুলনা নির্দিষ্ট পরীক্ষার ফল। সব অঞ্চল, সব আবহাওয়া পরিস্থিতি কিংবা সব ধরনের পূর্বাভাসে একই ধরনের সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না।

এরপর আবহাওয়ার সম্ভাব্য একাধিক পরিস্থিতি অনুমানের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৪ সালে গুগল ডিপমাইন্ড ‘জেনকাস্ট’ (GenCast) নামে একটি এআই মডেলের কথা প্রকাশ করে, যা ১৫ দিন পর্যন্ত আবহাওয়ার সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারে। এটি একটি মাত্র সম্ভাব্য ফল না দেখিয়ে একাধিক পূর্বাভাস তৈরি করে। এর ফলে কোনো ঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে অনিশ্চয়তা কতটা, কিংবা বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে কোনটি বেশি সম্ভাব্য, তা মূল্যায়ন করা সহজ হয়। জেনকাস্টের গবেষণায় প্রচলিত এনসেম্বল পূর্বাভাসব্যবস্থা ইসিএমডব্লিউএফ-ইএনএসের সঙ্গে তুলনায় ১ হাজার ৩২০টি পরীক্ষিত চলক ও পূর্বাভাস-সময়ের সমন্বয়ের ৯৭ দশমিক ২ শতাংশ ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া গিয়েছিল। এ ধরনের ফল আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এআইয়ের সম্ভাবনা তুলে ধরে। যদিও বাস্তব ব্যবহারে স্থানীয় আবহাওয়া, পর্যবেক্ষণের মান এবং পূর্বাভাসের উদ্দেশ্য অনুযায়ী ফল ভিন্ন হতে পারে।

ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ জানাতে নতুন সম্ভাবনা

সাধারণ বৃষ্টিপাত বা তাপমাত্রার পূর্বাভাসের তুলনায় ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও তীব্রতা অনুমান করা অনেক বেশি জটিল। একটি ঘূর্ণিঝড় কোন দিকে এগোবে, কত দ্রুত শক্তিশালী হবে, এর কেন্দ্র কোথায় উপকূলে আঘাত হানতে পারে এবং কোন এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠবে—এসব বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। সামান্য পরিবর্তনেও ঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ বদলে যেতে পারে। এ কারণে কয়েক দিন আগে পাওয়া নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

২০২৫ সালে গুগল ডিপমাইন্ড ও গুগল রিসার্চ পরীক্ষামূলক ঘূর্ণিঝড় পূর্বাভাসের জন্য ‘ওয়েদার ল্যাব’ (Weather Lab) উন্মুক্ত করে। এর মাধ্যমে গবেষক ও আগ্রহীরা এআই মডেলের ঘূর্ণিঝড়-সংক্রান্ত পূর্বাভাস দেখতে পারেন। একই বছরের আগস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের পরীক্ষামূলক মডেল ভারত মহাসাগরের দক্ষিণাঞ্চলে কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ প্রায় সাত দিন আগে ধারণ করতে পেরেছিল। তবে মডেলটি তখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ছিল। এ ধরনের সাফল্যকে সব ঝড়ের ক্ষেত্রে নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

২০২৬ সালের আগস্টে গুগল ডিপমাইন্ড তাদের ওয়েদারনেক্সট প্রযুক্তি নিয়ে আরো অগ্রগতির কথা জানায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, নতুন ঘূর্ণিঝড় মডেল গতিপথ, তীব্রতা ও বাতাসের বিস্তৃতি পূর্বাভাসে উন্নত ফল দেখিয়েছে। গবেষকদের মূল্যায়নে, প্রচলিত মডেলের তুলনায় এটি গড়ে এক দিনেরও বেশি সময়ের পূর্বাভাসগত সুবিধা দিতে পারে। অর্থাৎ আগের মডেলগুলো যে ধরনের নির্ভুলতা দিয়ে কোনো ঝড়ের তিন দিনের পূর্বাভাস দিত, নতুন মডেলটি গড়ে তার কাছাকাছি নির্ভুলতা দুদিন আগেই দিতে সক্ষম হয়েছে। এটি গবেষণাভিত্তিক তুলনার ফল; কোনো নির্দিষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগেই সঠিক পূর্বাভাস পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নয়। তবু দুর্যোগের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কয়েক ঘণ্টা বা এক দিনের সময়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, দীর্ঘ উপকূলরেখা, ঘনবসতি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা কিংবা বজ্রঝড় মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকার জেলে, কৃষক, লবণচাষি এবং নদী ও সমুদ্রনির্ভর মানুষের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল।

ঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে আগেভাগে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া গেলে মাছ ধরার নৌযানকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া, ফসল ও গবাদি পশু রক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া এবং উদ্ধারকারী দলকে আগে থেকে প্রস্তুত রাখা সহজ হতে পারে।

দেশে এআইভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুধু উন্নত মডেল ব্যবহার করলেই হবে না। দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র, স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য, সমুদ্রের পরিস্থিতি, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং স্থানীয় ভূপ্রকৃতির উপাত্তকে যথাসম্ভব সমন্বিত করতে হবে। বৈশ্বিক মডেল সাধারণত বড় পরিসরে আবহাওয়ার প্রবণতা বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট উপকূল, নদীঘেরা জনপদ কিংবা শহরের জন্য ঝুঁকি নিরূপণে স্থানীয় তথ্য ও বিশেষায়িত বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে তথ্যবিনিময় ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে।

এআইয়ের পূর্বাভাস মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ওয়েবসাইটে একটি মানচিত্র প্রকাশ করলেই হবে না। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের কাছে সহজ ভাষায় সতর্কবার্তা পৌঁছাতে হবে। মোবাইল ফোনের বার্তা, অ্যাপ, রেডিও, টেলিভিশন, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে সতর্কতা ছড়িয়ে দেওয়া গেলে প্রযুক্তির সুফল আরো কার্যকর হতে পারে। তবে এআইভিত্তিক পূর্বাভাসকে বাংলাদেশের সরকারি আবহাওয়া সতর্কবার্তার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং যাচাই করা তথ্য ও বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নের সঙ্গে মিলিয়ে এটি পূর্বাভাসের সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়াই যুক্তিযুক্ত।

(চলবে...)

বন্যা ও তাপপ্রবাহের পূর্বাভাসেও এআই

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এআইয়ের ব্যবহার ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অতিবৃষ্টি থেকে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হওয়া, তাপপ্রবাহের সময়কাল, প্রবল বাতাস, শৈত্যপ্রবাহ এবং কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসেও এআইভিত্তিক মডেল কাজে লাগতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, কোনো অঞ্চলে কয়েক দিন ধরে অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে আগাম প্রস্তুতির জন্য পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র ও জরুরি সেবার পরিকল্পনা করা সম্ভব। আবার তাপপ্রবাহের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে হাসপাতাল, কর্মক্ষেত্র এবং জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা যেতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে সংশ্লিষ্ট এলাকার বন্যার মানচিত্র, নদীর পানির স্তর, জনবসতি ও অন্যান্য স্থানীয় তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।

এআইভিত্তিক পূর্বাভাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্ভাব্য ঝুঁকির বিভিন্ন দৃশ্যপট তৈরি করা। ধরুন, একটি ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে মডেল ৫০টি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করল। অধিকাংশ পরিস্থিতিতে ঝড়টি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের দিকে এগোলেও কয়েকটি পরিস্থিতিতে অন্য এলাকায় আঘাত হানার সম্ভাবনা দেখা যেতে পারে। এই পার্থক্য বুঝতে পারলে কর্তৃপক্ষ শুধু একটি সম্ভাব্য গতিপথের ওপর নির্ভর না করে একাধিক ঝুঁকির জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে। তবে একাধিক পূর্বাভাস তৈরি করা মানেই প্রতিটি সম্ভাবনাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া নয়। সেগুলোর সম্ভাব্যতা ও ঝুঁকি বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের মাধ্যমে মূল্যায়ন করতে হয়।

প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা কোথায়

এআই আবহাওয়ার পূর্বাভাসে অগ্রগতি আনলেও এখনো কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আবহাওয়া একটি জটিল ও পরিবর্তনশীল ব্যবস্থা। বায়ুমণ্ডলের সামান্য পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। কোনো অঞ্চলে পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্য অপর্যাপ্ত হলে কিংবা ঝড়ের মতো বিরল ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতির যথেষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য না থাকলে মডেলের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। আবার বৈশ্বিক পূর্বাভাসে ভালো ফল পাওয়া কোনো মডেল স্থানীয় পর্যায়ে একই ধরনের নির্ভুলতা দেখাবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে নির্ভুলতা এবং সতর্কবার্তার কার্যকারিতা এক জিনিস নয়। একটি মডেল ঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ ভালোভাবে অনুমান করলেও সতর্কবার্তা সময়মতো মানুষের কাছে না পৌঁছালে কিংবা মানুষ সতর্কবার্তা বুঝতে না পারলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো কঠিন হবে। একইভাবে অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করলে মানুষ বারবার অপ্রয়োজনীয় আতঙ্কের মুখে পড়তে পারে; আবার ঝুঁকি কম করে দেখালে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হবে না। তাই এআইয়ের ফল যাচাই, পূর্বাভাসের অনিশ্চয়তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ এবং সতর্কবার্তার দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা জরুরি।

সামনে কী অপেক্ষা করছে

আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভবিষ্যৎ সম্ভবত এআই ও প্রচলিত আবহাওয়া বিজ্ঞানের সমন্বয়ের মধ্যেই নিহিত। এআই দ্রুত বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরতে পারে। আর আবহাওয়াবিদরা বাস্তব পর্যবেক্ষণ, ভৌত প্রক্রিয়া ও স্থানীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেই পূর্বাভাস যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই সমন্বয় আরো উন্নত হলে ঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ, তীব্রতা এবং সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সহজ হতে পারে।

প্রযুক্তির আসল সাফল্য অবশ্য শুধু কত দ্রুত পূর্বাভাস তৈরি হলো, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং কত আগে নির্ভরযোগ্য সতর্কতা পাওয়া গেল, কত মানুষের কাছে তা পৌঁছাল এবং তার ফলে কতটা প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি কমানো সম্ভব হলো, সেটিই হবে বড় মাপকাঠি। বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে এআইভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস তাই শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়। সঠিক পরিকল্পনা, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং কার্যকর সতর্কবার্তার সঙ্গে যুক্ত হলে এটি জীবন রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন