আমরা প্রতিদিন কম্পিউটার ও স্মার্টফোনে অসংখ্য ছবি, ভিডিও, গান, নথি ও অন্যান্য ফাইল সংরক্ষণ করে থাকি। প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে ফাইল খুলে দেখি, আবার অপ্রয়োজনীয় ফাইল ডিলিট করে ফেলি। কিন্তু একটা বিষয় কখনো কি ভেবে দেখেছি, এসব তথ্য আসলে কোথায় থাকে? কীভাবে থাকে? কম্পিউটার কীভাবে একটি ছবি, গান কিংবা লেখাকে সংরক্ষণ করে রাখে? আর বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও কীভাবে সেই তথ্য অক্ষত থাকে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর রয়েছে ডিজিটাল স্টোরেজ প্রযুক্তির মধ্যে। প্রচলিত হার্ডডিস্ক ড্রাইভ (HDD) থেকে আধুনিক সলিড স্টেট ড্রাইভ (SSD)—প্রতিটি প্রযুক্তিই তথ্য সংরক্ষণের জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়া ব্যবহার করে। আজ এ বিষয়ে বিস্তারিত জানব।
HDD-এর তথ্য সংরক্ষণ
এর পূর্ণরূপ Hard Disk Drive। এটি একটি ইলেকট্রোমেকানিক্যাল স্টোরেজ ডিভাইসÑঅর্থাৎ এর মধ্যে ইলেকট্রনিক সার্কিটের পাশাপাশি ঘূর্ণায়মান ও চলমান যন্ত্রাংশও থাকে। হার্ডডিস্কের ভেতরে এক বা একাধিক গোলাকার চাকতি থাকে, যেগুলোকে প্লেটার (Platter) বলা হয়। এগুলোর পৃষ্ঠে বিশেষ চৌম্বকীয় উপাদানের পাতলা স্তর থাকে। প্লেটারগুলো দ্রুতগতিতে ঘোরে এবং রিড-রাইট হেড নামের ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশের সাহায্যে সেখানে তথ্য লেখা ও পড়া হয়। কম্পিউটারে কোনো ফাইল সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিলে অপারেটিং সিস্টেম ও ড্রাইভের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা তথ্যকে উপযুক্ত ডিজিটাল বিন্যাসে প্রস্তুত করে। এরপর হার্ডডিস্কের রাইট হেড প্লেটারের চৌম্বকীয় পৃষ্ঠে নির্দিষ্ট বিন্যাস তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় চৌম্বকীয় অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের মাধ্যমে তথ্য উপস্থাপিত হয়। ড্রাইভের ইলেকট্রনিকস ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ঠিক করে দেয় কোন জায়গায় কী তথ্য লেখা হবে। যখন কোনো ফাইল খোলা হয়, হার্ডডিস্কের রিড হেড সংশ্লিষ্ট স্থানের চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করে। ড্রাইভের ইলেকট্রনিকস সেই সংকেতকে ডিজিটাল তথ্যে রূপান্তর করে কম্পিউটারে পাঠায়। এরপর অপারেটিং সিস্টেম ও সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার তথ্যকে ছবি, লেখা, ভিডিও বা অন্য উপযোগী রূপে দেখায়। যেহেতু HDD-তে প্লেটার ঘোরে এবং হেডকে নির্দিষ্ট স্থানে যেতে হয়, তাই তথ্য খুঁজে পাওয়া ও পড়ার ক্ষেত্রে কিছু যান্ত্রিক সময় লাগে। এ কারণেই অনেক পরিস্থিতিতে HDD, SSD-এর তুলনায় ধীরগতির হয়।
SSD-এর তথ্য সংরক্ষণ
এর পূর্ণরূপ Solid State Drive। প্রচলিত HDD-এর মতো এতে ঘূর্ণায়মান প্লেটার বা চলমান রিড-রাইট হেড থাকে না। এর ফলে এটি দ্রুত তথ্য পড়তে পারে, কম শব্দ করে এবং যান্ত্রিক আঘাতের কারণে চলমান অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। বর্তমান SSD-এর একটি বড় অংশে NAND ফ্ল্যাশ মেমোরি ব্যবহার করা হয়। এই মেমোরির কোষগুলো বৈদ্যুতিক চার্জের প্রভাবে তাদের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে। সেই পরিবর্তন শনাক্ত করেই তথ্য পড়া হয়।
মেমোরি সেল
NAND ফ্ল্যাশ মেমোরির সেল সাধারণত ট্রানজিস্টরভিত্তিক কাঠামো দিয়ে তৈরি। এর নকশা অনুযায়ী, ফ্লোটিং-গেট বা চার্জ-ট্র্যাপ অঞ্চলে বৈদ্যুতিক চার্জ ধরে রাখা যায়। সেই চার্জ সেলের নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করে। SSD-এর নিয়ন্ত্রক চিপ (Controller) এই বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করে সংরক্ষিত তথ্য নির্ধারণ করে। তথ্য লেখার সময় সেলে চার্জের অবস্থা নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিবর্তন করা হয়। NAND ফ্ল্যাশের নির্দিষ্ট নকশায় চার্জ স্থানান্তরের জন্য কোয়ান্টাম টানেলিংসহ বিভিন্ন ভৌত প্রক্রিয়া ব্যবহৃত হতে পারে; তবে সব ধরনের ফ্ল্যাশ মেমোরির অভ্যন্তরীণ কাঠামো এক নয়।
ফাইল ডিলিট করলে যা ঘটে
কম্পিউটার বা ফোন থেকে কোনো ফাইল মুছে ফেললে সেটির তথ্য সবসময় সঙ্গে সঙ্গে স্টোরেজ থেকে সম্পূর্ণ মুছে যায় না। সাধারণত প্রথমে ফাইল সিস্টেমে ওই ফাইলের জায়গাকে পুনর্ব্যবহারের উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
নষ্ট হয় কেন
কোনো স্টোরেজ ডিভাইসই চিরস্থায়ী নয়। তবে HDD ও SSD-এর সীমাবদ্ধতা ভিন্ন। HDD-তে মোটর, প্লেটার ও রিড-রাইট হেডের মতো যান্ত্রিক অংশ থাকে। আঘাত, অতিরিক্ত তাপ, যান্ত্রিক ক্ষয় বা ইলেকট্রনিক ত্রুটির কারণে ড্রাইভ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ড্রাইভ থেকে অস্বাভাবিক শব্দ, বারবার ফাইল পড়তে সমস্যা বা কম্পিউটারে ড্রাইভ শনাক্ত না হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া উচিত। SSD-এর NAND ফ্ল্যাশ সেলে তথ্য লেখা ও মুছে ফেলার সহনক্ষমতা সীমিত। বারবার প্রোগ্রাম-ইরেজ চক্রের কারণে সময়ের সঙ্গে সেলের কার্যক্ষমতা কমতে পারে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক চিপ, বিদ্যুৎ সরবরাহ বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক অংশেও ত্রুটি দেখা দিতে পারে। তবে HDD বা SSD—কোনটি কত দিন টিকবে তা ড্রাইভের মান, ব্যবহারের ধরন, তাপমাত্রা, লেখার পরিমাণ এবং অন্যান্য পরিস্থিতি এর আয়ুষ্কালে প্রভাব ফেলে।
HDD ও SSD ছাড়াও তথ্য সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। CD ও DVD-এর মতো অপটিক্যাল ডিস্কে লেজারের সাহায্যে তথ্য পড়া হয়। ম্যাগনেটিক টেপ বড় পরিমাণ তথ্য দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ও ব্যাকআপের কাজে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে মেমোরি কার্ড ও USB ফ্ল্যাশ ড্রাইভেও NAND ফ্ল্যাশ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ক্লাউড স্টোরেজের ক্ষেত্রেও তথ্য কোনো জাদুকরী অদৃশ্য জায়গায় থাকে না। সাধারণত দূরবর্তী ডেটা সেন্টারের সার্ভার, স্টোরেজ ড্রাইভ, নেটওয়ার্ক ও ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারের সমন্বয়ে এই সেবা পরিচালিত হয়। ব্যবহারকারী ইন্টারনেটের মাধ্যমে নিজের অনুমোদিত তথ্য দেখতে, আপলোড করতে বা ডাউনলোড করতে পারেন।
HDD নাকি SSD
দুটিরই আলাদা সুবিধা রয়েছে। সাধারণভাবে HDD তুলনামূলক কম খরচে বেশি ধারণক্ষমতা দিতে পারে। তাই বড় আকারের ফাইল, আর্কাইভ বা ব্যাকআপ সংরক্ষণে এটি এখনো উপযোগী। অন্যদিকে SSD দ্রুত বুট, দ্রুত ফাইল খোলা এবং সফটওয়্যার চালু করার সুবিধা দেয়। চলমান যন্ত্রাংশ না থাকায় যান্ত্রিক আঘাতজনিত ক্ষতির ঝুঁকিও কম। কোনটি বেছে নেওয়া ভালো, তা নির্ভর করে ব্যবহারকারীর বাজেট, প্রয়োজনীয় ধারণক্ষমতা, পারফরম্যান্সের চাহিদা এবং ব্যবহারের ধরনের ওপর। অনেক ক্ষেত্রে কম্পিউটারে অপারেটিং সিস্টেম ও নিয়মিত ব্যবহৃত সফটওয়্যারের জন্য SSD এবং বড় ফাইল বা ব্যাকআপের জন্য HDD ব্যবহার করা কার্যকর সমাধান হতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

