শুভ নাকি অশুভ শক্তি

শুভ নাকি অশুভ শক্তি
আমার দেশ গ্রাফিক্স

বর্তমান বিশ্বে জ্বালানির চাহিদা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। চাহিদা পূরণের জন্য এখন সবাই তেল, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ইত্যাদি অনবায়নযোগ্য বা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করছে। কিন্তু আমরা সবাই জানি, এসব অনবায়নযোগ্য জ্বালানি সীমিত এবং একবার ব্যবহার করার পর তা খুব দ্রুত পুনরায় তৈরি হয় না। এগুলো তৈরি হতে হাজার হাজার থেকে কোটি কোটি বছর সময় লাগতে পারে। তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের চাহিদা কীভাবে পূরণ করবে? তাদের জন্য একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে পারমাণবিক বিজ্ঞান।

কিন্তু প্রথমেই প্রশ্ন হলো, পারমাণবিক বিজ্ঞান আসলে কী? পারমাণবিক বিজ্ঞান হলো পরমাণু বা এর নিউক্লিয়াসকেন্দ্রিক বিজ্ঞান ও অধ্যয়ন। পরমাণুর কেন্দ্রে, অর্থাৎ নিউক্লিয়াসে, বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত থাকে। বিশেষ কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই শক্তি মুক্ত করা যায়।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে বিশ্বের অনেক শক্তিশালী ও বৃহৎ দেশ, যেমন—রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, চীন ও জাপান, পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করছে। এজন্য প্রয়োজন পারমাণবিক বিজ্ঞান। পরমাণু থেকে শক্তি বা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট (Nuclear Power Plant)। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে শক্তি উৎপাদনের জন্য নিউক্লিয়ার ফিশন (Nuclear Fission) বা সহজ বাংলায় পরমাণু বিভাজন প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি রিঅ্যাক্টর থাকে। রিঅ্যাক্টরের ভেতরে ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর মতো বিভাজনযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। একটি নিউট্রন ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর নিউক্লিয়াসে আঘাত করলে সেটি বিভাজিত হতে পারে। এতে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয় এবং আরো নিউট্রন নির্গত হয়। সেই নিউট্রনগুলো আবার অন্য নিউক্লিয়াসকে বিভাজিত করতে পারে। এভাবে একটি শৃঙ্খল বিক্রিয়া বা চেইন রিঅ্যাকশন (Chain Reaction) তৈরি হয়, যার ফলে আরো তাপ উৎপন্ন হয়।

এই তাপ দিয়ে পানি গরম করে বাষ্পে পরিণত করা হয়। বাষ্প টারবাইন নামক একটি যন্ত্রকে দ্রুত গতিতে ঘোরায়। টারবাইনটি জেনারেটরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। পরে বাষ্পকে ঠান্ডা করে আবার পানিতে পরিণত করা হয় এবং সেই পানি পুনরায় ব্যবহার করা হয়। রিঅ্যাক্টরের শৃঙ্খল বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কন্ট্রোল রড বা নিয়ন্ত্রণ দণ্ড ব্যবহার করা হয়। এগুলো নিউট্রন শোষণ করে বিক্রিয়ার হার নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশের নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট

বাংলাদেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি রাজশাহী বিভাগের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে অবস্থিত। রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মাণাধীন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি রিঅ্যাক্টর রয়েছে, যেগুলো থেকে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

পারমাণবিক শক্তির সুবিধা

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আমাদের অনেক সুবিধা দিতে পারে। এর মাধ্যমে অল্প পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করে প্রচুর বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। যদিও এটি নির্মাণে অনেক টাকা ব্যয় হতে পারে, তবে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কোন কারণে এটি জীবাশ্ম জ্বালানির চেয়ে ভালো? এর একটি প্রধান কারণ হলো, পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে তুলনামূলকভাবে অল্প পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহার করে প্রচুর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। অন্যদিকে, জীবাশ্ম জ্বালানি অনবায়নযোগ্য এবং এর মজুত সীমিত। এছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। তাই ভবিষ্যতের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের জন্য পারমাণবিক শক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য উৎস হতে পারে।

পারমাণবিক শক্তির ঝুঁকি

তবে পারমাণবিক শক্তির কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যন্ত্রপাতির ত্রুটি, মানুষের ভুল, শীতলীকরণ ব্যবস্থার সমস্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার মতো বিভিন্ন কারণে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। গুরুতর দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমাতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একাধিক নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়। তবু দুর্ঘটনা ঘটলে এর প্রভাব গুরুতর হতে পারে।

তাই পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা, দক্ষ কর্মী এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিউক্লিয়ার ফিউশন

বিজ্ঞানীরা বর্তমানে আরো নিরাপদ ও কার্যকর প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে নিউক্লিয়ার ফিউশন (Nuclear Fusion) অন্যতম। ফিউশন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে দুটি হালকা নিউক্লিয়াস একত্র হয়ে একটি ভারী নিউক্লিয়াস তৈরি করে এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হতে পারে। সূর্যের মতো নক্ষত্রে প্রাকৃতিকভাবে নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটে। ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিউশন শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। তবে পৃথিবীতে ফিউশনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো একটি বড় বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।

সব দিক বিবেচনা করলে বলা যায়, পারমাণবিক বিজ্ঞানকে শুধু ভবিষ্যতের শক্তি বা অভিশাপ—কোনো একটিতে সীমাবদ্ধ করা যায় না। এর মধ্যে যেমন বিপুল শক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিও। আমরা যদি সঠিক জ্ঞান, উন্নত প্রযুক্তি, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করি, তাহলে এটি মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস হয়ে উঠতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন