দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশকিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে। শুরুতেই ৬০ জেলায় ডিসি পদায়ন নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবসহ শীর্ষস্থানীয় কয়েক আমলার বিরুদ্ধে। প্রধান উপদেষ্টার একজন বিশেষ সহকারীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তার দেড়শ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে হইচই পড়ে যায় সচিবালয়ে। দুই উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগও আমলে নেয় সরকার।
তবে সেবা খাতগুলোয় দুর্নীতি, অনিয়ম ও ঘুস লেনদেনের ঘটনা আগের মতোই আছে। বিভিন্ন দপ্তরের ৬০ জন সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলেছে আমার দেশ। এদের সবারই বক্তব্যÑ‘ঘুস আছে তো সেবা আছে। ঘুস নেই, সেবাও নেই।’ জুলাই অভ্যুত্থানে পটপরিবর্তন হলেও এ সেবা খাতে দুর্নীতি ও ঘুস লেনদেনে কোনো হেরফের নেই। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তর ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
আমলাতন্ত্রের দীর্ঘসূত্রতায় জনহয়রানির রাশ টেনে ধরা যাচ্ছে না বলে আক্ষেপ আছে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মাঝে। এ বিষয়ে সরকারের পাঁচজন উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলে আমার দেশ। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় এক বছর পার হতে চলেছে। এ সময়ে দেশে ঘুস, দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেন তাদের কেউ কেউ।
সব অভিযোগ আমলে নিয়ে চলছে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত। অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধান ও তদন্তের স্বার্থে এরই মধ্যে দায়িত্ব থেকে বেশ কয়েকজনকে অব্যাহতিও দেওয়া হয়েছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা পায়নি কমিটি।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একটি সম্মেলনে বলেছেন, ‘দুর্নীতির তালিকায় দেখবেন বাংলাদেশ সর্বনিম্ন স্তরে, সততা বলে আমাদের আর কোনো জিনিস নেই। কাজেই দুর্নীতি থেকে বের না হলে কিছুই হবে না। এ দুর্নীতি কীভাবে আছে, কোথায় আছে; আমলাদের তা অজানা নয়। এটা থেকে উদ্ধার পাওয়া ছাড়া বাংলাদেশের কোনো গতি নেই। এটা থেকে বের হতেই হবে আমাদের। দুর্নীতি এমন গভীরে ঢুকে গেছে যে, কেউই মুক্ত হতে পারছি না।’
ডিসি পদায়নে দুর্নীতির অভিযোগ
ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে টানা সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাশাসক শেখ হাসিনার পলায়নের পর গত বছরের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। মাত্র এক মাসের মাথায় ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক নিয়োগে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি ও ঘুস গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। চারটি গণমাধ্যম এ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাদিম মাহমুদ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ করেন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও দুদকে করা অভিযোগে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ৯, ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর দেশের ৬০ জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগ বা পদায়নে বড় দুর্নীতি ও ঘুস লেনদেন হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মোখলেস উর রহমানই ভাগ পেয়েছেন ১০ কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওই সময়ের যুগ্ম সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদের টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি গোয়েন্দা সংস্থা তিন কোটি টাকার চেক উদ্ধার করে বলে দুদকে করা অভিযোগে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বর্তমান স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল করিম মাকসুদ জাহেদীসহ সরকারের ৬৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ঘুস লেনদেনের একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়। সরকারের এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রার্থনাও জানানো হয় আবেদনে।
আবেদন আমলে নিয়ে দুর্নীতি অনুসন্ধান করে দুদক। পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টা সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সমন্বয়ে একটি কমিটি করে দেন।
উপদেষ্টা কমিট ও দুদক সংশ্লিষ্টদের জবানবন্দি গ্রহণ ও অনুসন্ধান শেষে দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পায়নি বলে প্রতিবেদন দিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ড. মোখলেস উর রহমান বলেন, সফল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নিকৃষ্টতর ফ্যাসিবাদের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে। মূলত সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগের লুটতন্ত্রকে বৈধতা দিতে এমন কাল্পনিক অভিযোগ করা হয়েছে। ১০ কোটি নয়, ১০ টাকার দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পেলে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়ে শাস্তি মাথা পেতে নেবেন বলেও জানান অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিনিয়র সচিব।
নগদে দেড়শ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদে দেড়শ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে’ বলে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আতিক মোর্শেদ এর সঙ্গে যুক্ত বলেও দাবি করা হয়। নগদের কর্মকর্তাদের বরাতে গত ৩০ মে এ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ করে ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিক। বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নগদে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়নি উল্লেখ করে অভিযোগের বিষয়ে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, ‘টাকা সরানোর অভিযোগ পাওয়ার পর আমি নগদের কাছে পরিচালন ব্যয় ও যাবতীয় বিলসহ দুই মাসের হিসাব নিয়ে জানতে পারি, সব মিলিয়ে অ্যাকাউন্ট থেকে ওঠানো হয়েছে ৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে কোম্পানির পরিচালন ব্যয়, বেতন-ভাতা, ভাড়া, ভেন্ডর বিলÑসবই রয়েছে। প্রতিটি টাকার হিসাব যথাযথভাবেই সংরক্ষণ করা আছে বলেও দাবি প্রধান উপদেষ্টার এই বিশেষ সহকারীর।
অভিযোগের বিষয়ে আতিক মোর্শেদ বলেন, নগদের দুর্নীতির বিষয়ে তাকে জড়িয়ে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এ সরকারের সময়ে এখানে এক টাকারও দুর্নীতি হয়নি বলেও দাবি তার।
অভিযোগের বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, দেশের আনুমানিক ৯ কোটি মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক সেবায় জড়িত নগদ। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার নগদে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। প্রশাসক বসানোর পর নিরীক্ষায় উঠে আসে, নগদ লিমিটেডে বড় ধরনের জালিয়াতি সংঘটিত হয়েছে। অনলাইন জুয়া, মানি লন্ডারিং, সাবেক মালিকদের অনুকূলে অর্থপাচার, ভুয়া পরিবেশক ও এজেন্ট দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে আর্থিক জালিয়াতি এবং অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক অর্থ বা ই-মানি তৈরি করা হয়েছে। এসব কারণে দুই হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার হিসাব মিলছে না। প্রতিষ্ঠানটিতে যখন এসব অনিয়ম হয়, তখন এর পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের একাধিক সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারির দিকে নগদের বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই করতে এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালায় দুদকের সহকারী পরিচালক রুহুল হক ও তানজির আহমেদের নেতৃত্বে একটি টিম। তারা এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা পাচার ও ৬০০ কোটি টাকার ই-মানি সংক্রান্ত অনিয়মের প্রমাণ পায়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট ২৪ জনকে আসামি করে বাংলাদেশ ব্যাংক মামলা করে। মূলত দুর্নীতির ওই সব অভিযোগ আড়াল করতে এখন মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে বলে দাবি টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের।
দুই উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তার দুর্নীতি
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেন এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা তুহিন ফারাবী ও মাহমুদুল হাসানকে গত ২১ এপ্রিল অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এরপর থেকেই প্রশাসনজুড়ে তাদের দুর্নীতির বিষয়টি আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়।
মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য এবং ফ্যাসিবাদের দোসর প্রকৌশলীদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়েছেন তিনি। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী থেকে উপজেলা প্রকৌশলী পর্যন্ত প্রায় সব গ্রেডের কর্মকর্তার বদলি-পদায়নে তদবির বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ঘুরে ঘুরে তদবির করতেন বলেও জানান কর্মকর্তারা।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ব্যক্তিগত দুই কর্মকর্তা তুহিন ফারাবী ও মো. মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা চিকিৎসক, মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল, পরিচালক, উপপরিচালক, সিভিল সার্জন নিয়োগ-বদলির মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। দুজন মিলে মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল, পরিচালক, উপপরিচালক, সিভিল সার্জন নিয়োগ-বদলিতে ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা করে আদায় করতেন।
দুই উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তার দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করতে এলজিআরডি উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া দুদককে অনুরোধ করেন। এ ছাড়া ফ্যসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকটি সংগঠনও দুদকে লিখিতভাবে ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তদন্তের অনুরোধ করে।
গত ২২ মে মোয়াজ্জেম হোসেনকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তদন্তের স্বার্থে তাদের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়।
দুই উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তার দুর্নীতির বিষয়ে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান। অনুসন্ধান শেষে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে জানা যাবে।
দুই প্রভাবশালী উপদেষ্টার ব্যক্তিগত স্টাফের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
বিআরটিএর মাসুদরা আর ভালো হয়নি
দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা ৫৭ লাখ ৫২ হাজারের বেশি আর নিবন্ধনধারী চালকের সংখ্যা ৫৯ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি। এ তথ্য বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) থেকে নেওয়া। নিবন্ধন করা প্রতিটি যানবাহনের মালিককে ফিটনেস ও অন্যান্য প্রয়োজনে বছরে একবার বিআরটিএ কার্যালয়ে যেতে হয়। চালকদের লাইসেন্স নবায়নের জন্য যেতে প্রতি পাঁচ বছর পরপর। এ ছাড়া প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার যানবাহন নিবন্ধন হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতি ও ঘুসের হার পাসপোর্ট, বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থায়।’ বিআরটিএ কার্যালয়গুলোয় সেবাগ্রহণকারীদের মধ্যে শতকরা ৯২ ভাগের বেশি মানুষকে ঘুস দিতে বাধ্য করা হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরেজমিন রাজধানীর মিরপুর ও উত্তরা বিআরটিএ কার্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, অসংখ্য দালালচক্র আগের মতোই সক্রিয়। গাড়ির ফিটনেস ও নতুন রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন এমন ১২ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সবাই ঘুস দিয়েছেন। একজন ব্যাংক কর্মকর্তা নতুন গাড়ি নিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে এসেছেন। তার কাছেই প্রশ্ন ছিলÑ‘ঘুস দেওয়াও তো সমান অপরাধ। আপনি কেন দিলেন?’ জবাবে খুব আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘পটপরিবর্তন হয়েছে কিন্তু মাসুদরা তো আর ভালো হয়নি। মাসুদদের চরিত্র তো আগের মতোই রয়ে গেছে।’
সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, মাসুদ হলেন বিআরটিএর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের প্রতীকী নাম। বিআরটিএ দুর্নীতিবাজ মাসুদদের হাত থেকে সেবাগ্রহীতাদের রক্ষা করতে সরকার কেন ব্যর্থ হচ্ছেÑজানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতেই আমরা গোটা সিস্টেম (পদ্ধতি) পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছি। এগুলো সম্পন্ন হলে আশা করছি ঘুস ও দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না। জনগণ সুফল পাবে।’
এনবিআরে সক্রিয় ছাগলকাণ্ডের ‘মতিউররা’
দেশে কর শনাক্তকরণ নম্বরধারীদের (ইটিআইএন) সংখ্যা এক কোটি ১৪ লাখ হলেও রিটার্ন দাখিল করেছেন মাত্র ৪৫ লাখ করদাতা। অর্ধেকের বেশি টিনধারী রিটার্ন দাখিল না করার কারণ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জটিলতা ও সংস্থাটির দুর্নীতিবাজ ‘ছাগলকাণ্ডের মতিউরদের’ মতো কর্মকর্তাদের দায়ী করেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের মতে, এনবিআরে কর্মরত প্রায় সবাই দুর্নীতিবাজ। সংস্থাটিতে ছাগলকাণ্ডের মতিউর দুর্নীতির আইকনে পরিণত হয়েছেন ধরা পড়ার কারণে। এখানকার চেয়ার-টেবিলগুলোও ‘মতিউরের মতোই আচরণ করে সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে।
এনবিআরের ঘুস, দুর্নীতি ও গ্রাহক হয়রানির বিষয়টি জানতে দেশের ছোট, মাঝারি ও বড় ধরনের ১৫টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর সঙ্গে আমার দেশ কথা বলে। প্রত্যেকের অভিযোগ, দেশের প্রতিটি সংস্থায় কিছু ভালো-মন্দ কর্মকর্তা থাকেন। কিন্তু এনবিআরের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। এখানে সৎ কর্মকর্তাদের জায়গা নেই। এখানকার সবাই মতিউরের মতোই দুর্নীতিবাজ।
ব্যবসায়ীদের মতে, বছরে একবার ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে সিটি করপোরেশনে দৌড়াতে হয়। পাশাপাশি আমদানি ও রপ্তানি সনদ নবায়ন, আয়কর রিটার্ন নিষ্পত্তি, ভ্যাট চালান থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘুস দিতে হয়। ঘুস ছাড়া কোনো ব্যবসায়ী এগুলো সহজে পেয়েছেন, এমন নজির পাওয়া যাবে না বলেও দাবি তাদের।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, এনবিআরকে ব্যবসাবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করার জন্যই অন্তর্বর্তী সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে আন্দোলনের নামে গোটা প্রতিষ্ঠানকে অচল করে দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান আমার দেশকে বলেন, ‘ঘুস ছাড়া এনবিআরে কাজ করাই দায়। এখানে ঘুসের ওপর ঘুস দিতে হয়। মানে যে ঘুসটা আমাদের দিতে হয়, সেটা তো আমরা অনেক সময় কোম্পানির খরচের হিসাবে কাগজে-কলমে দেখাতে পারি না। ফলে আদার এক্সপেন্স বা অন্যান্য খরচের খাতে এই ঘুসের খরচটা লিখতে হয়, সেটা অ্যাপ্রুভ করতে আবারও ঘুস দিতে হয়। এভাবে ঘুসের ওপরে ঘুস দিতে হয়। একই ঘটনা ঢাকা ওয়াসা ও বিদ্যুৎ খাতসহ দেশের সব খাতেই। ব্যবসায়ীরা আগে যেভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন, সেভাবেই রয়ে গেছে।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, এনবিআর এমন অবস্থায় পৌঁছে গেছে যে, এটা দুর্নীতিবাজদের জন্য একটা স্বর্গ। এটা প্রতিষ্ঠিত যে, এনবিআরে যারা কর ফাঁকি দিতে চায়, অবৈধ লেনদেন করতে চায়, অর্থপাচার করতে চায়; তাদের জন্য এনবিআর স্বর্গ। কিন্তু যারা আইন মেনে কর দিতে চান, তাদের একরকম জিম্মি করে অর্থ আদায় করা হয়। এটা যে শতভাগ হচ্ছে তেমনটা বলব না। তবে সার্বিক চিত্র এমনই।
‘ঘুস নেই, সেবাও নেই’
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন সেবা খাতগুলোর মধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় এবং তহসিলদার ও কানুনগো, সহকারী ভূমি সেটেলমেন্ট দপ্তরগুলোতে সেবা নিতে গিয়ে ভূমি মালিকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন আগের মতোই। নামজারি ও খাজনা দেওয়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হলেও বিভিন্ন ধরনের হয়রানিতে ফেলে ভূমি মালিকদের ঘুস দিতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত এক মাসে বিভিন্ন ভূমি অফিসে সেবা নিতে গেছেন এমন ২০ জন ভূমি মালিকের সঙ্গে কথা বলেছে আমার দেশ। এদের মধ্যে ১৫ জনই ঘুস লেনদেনের শিকার হয়েছেন। একজন ভূমি মালিক আমার দেশকে বলেন, আমি যে ভূমিটির খাজনা দিতে যাই, তার দাম আনুমানিক ২০০ কোটি টাকা। অথচ আমি তহসিলদারকে ঘুস দেওয়ার পাশাপাশি কমপক্ষে ৮০ বার ‘স্যার’ বলেছি। মনে হয় একজন তহসিলদার হচ্ছেন একজন রাজা আর আমরা ভূমি মালিকরা হলাম তার প্রজা। আপনি কেন ঘুস দিলেনÑএমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘হয়রানি থেকে বাঁচতে।’
ঢাকা ওয়াসা থেকে পানির সংযোগ নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মালিক জানান, ‘একটি ভবন নির্মাণ করেছি পার্শ্ববর্তী ডোবার পানি ব্যবহার করে। এখানেও ওয়াসার কর্মকর্তা এসে আট লাখ টাকা পানির বিল ধরিয়ে দিয়ে নিষ্পত্তির জন্য তিন লাখ টাকা ঘুস দাবি করেন। ভবন নির্মাণের জন্য রাজউক থেকে নকশা অনুমোদন করতে গেছে ১৫ লাখ টাকা। তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, রিহাবের সদস্যভুক্ত কোনো রিয়েল এস্টেট কোম্পানি কিংবা ব্যক্তিগত পর্যায়েও কেউ ন্যূনতম পাঁচ লাখ টাকার নিচে রাজউক থেকে নকশা অনুমোদন করাতে পারেনি। ঘুস ছাড়া কেউ ওয়াসার পানির লাইন নিতে পেরেছেÑএমন একজন গ্রাহকও পাওয়া যাবে না।
জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্ম নিবন্ধন সনদ পেতেও ঘুস লেনদেনে কোনো হেরফের হয়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। জাহিদুল ইসলাম নামে এক গ্রাহক জানান, একটি জন্ম নিবন্ধন সনদ পেতে গত তিন মাস ধরে ঘুরছি। এখনো পাইনি। কবে পাব বলতে পারছি না।
দুর্নীতিমুক্ত করতে পদ্ধতি পরিবর্তনের কথা বলছে সরকার
অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতি ও সেবা খাতের ঘুস রোধে সরকারের পদক্ষেপ কীÑএমন প্রশ্ন ছিল পাঁচজন উপদেষ্টার কাছে। প্রায় অভিন্ন জবাব দেন তারা। তাদের দাবি, সরকারের উপরের দিকে ঘুস ও দুর্নীতির বিন্দুমাত্র আঁচ লাগেনি। তবে সেবা খাতগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করে শতভাগ হয়রানিমুক্ত গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এটা অনেক দূরের পথ বলেও উপলব্ধি তাদের। গ্রাহকদের কাছ থেকে দুর্নীতি ও হয়রানির অসংখ্য অভিযোগও তাদের কাছে আসে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টারা। তারা বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থাই কর্মকর্তাদের ঘুস ও দুর্নীতিতে যুক্ত হতে সহায়তা করছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, সেবা খাতগুলোয় দুর্নীতি আগের চেয়ে না বাড়লেও কমেছে, এটা বলা যাবে না। উপরের কিছু লোক পরিবর্তনেই দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব হবে না, এটা প্রমাণ হয়ে গেছে। এটার জন্য গোটা সিস্টেমকে বদলাতে হবে। ৫ আগস্ট স্বৈরাচার বা দুর্নীতিবাজ সরকারের পতন হওয়ায় মানুষের মনে বিশাল আশা ছিল, বিআরটিএতে গিয়ে বিনা ঘুসে তিনি ড্রাইভিং লাইসেন্সটি পেয়ে যাবেন। কিন্তু পাননি। তাকে এ কাজে ঘুস দিতে হয়েছে। ফলে তার মধ্যে হতাশা কাজ করাটাই স্বাভাবিক।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, ‘এজন্য আমাদের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাই দায়ী। নিচের লোকগুলো তো আর বদলায়নি। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বদলি হয়েছে হয়তো। এটার জন্য পদ্ধতিগত পরিবর্তনটাই বেশি জরুরি।’
দুর্নীতির মুলোৎপাটনের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত সম্মেলনে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অল্প সময়ে দুর্নীতি কতটুকু সমাধান দিতে পারব, তা জানা নেই। দায়িত্বে আসার পর থেকে চেষ্টা করছি, তবে সেটা কাগজে-কলমে। আজ একটা চেষ্টা করলাম, সেটা হচ্ছে অনলাইন সার্ভিস। সব তৈরি আছে, কাজে লাগাতে পারছে না।’
দুর্নীতি নির্মূল না হওয়ার উদাহরণ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘কিছু লোক যায় অনলাইনে ট্যাক্স দেওয়ার জন্য, গিয়ে শোনে সার্ভার ডাউন। সুন্দর ব্যাখ্যা। অর্থাৎ সেই সার্ভিস দেবে না সে। আরেক জায়গায় আরেক ব্যাখ্যা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চায় আমরা দুর্নীতিমুক্ত হই। না হলে ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুই চলছে না। তাদেরই লাভ হবে। কিন্তু আমরা তাদের সুযোগ দিতে চাই না, যারা ব্যক্তিগত লাভ নিয়ে ব্যস্ত আছে। জাতির সুযোগের জন্য আমরা মোটেই চিন্তিত নই। আমাদের সেই চিন্তা পাল্টাতে হবে। আমরা চেষ্টা করছি যাতে প্রতিটি ক্ষেত্রে অনলাইন সার্ভিস শতভাগ কার্যকর করে যেতে পারি। কেউ যেন বাধা দেওয়ার জন্য কোমর বেঁধে লেগে না যায়।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

