রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের সরবরাহ করা প্রতিদিনের খাবারে পুষ্টির ভয়াবহ ঘাটতি থাকছে। একঘেঁয়ে খাদ্যতালিকায় মূল স্থান দখল করে আছে ভাত, ডাল, আলু ভর্তা, ভাজি ও সবজি। সপ্তাহে মাত্র এক বা দুই দিন পাঙাশ, তেলাপিয়া বা চাষের মাছ এবং ব্রয়লার মুরগির মাংস পরিবেশন করা হয়। দিনের পর দিন পুষ্টিহীন খাবার গ্রহণের ফলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক বিকাশ ও পড়াশোনায় চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পুষ্টিহীনতার এই চিত্র স্বীকার করে খোদ মাদরাসা শিক্ষকরা জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার কারণেই মূলত শিক্ষার্থীরা সুষম খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
গবেষক ও পুষ্টিবিদদের মতে, শিক্ষার্থীদের খাবারে ক্যালরি বা কার্বোহাইড্রেটের (শর্করা) কোনো ঘাটতি সাধারণত হয় না। তিন বেলাই পর্যাপ্ত পরিমাণে ভাত, রুটি কিংবা খিচুড়ি খাওয়ানো হয়। এর ফলে পেট ভরা এবং শরীর তাৎক্ষণিক শক্তি পেলেও এটি সুষম খাবার বা ব্যালেন্সড ডায়েট নয়। বাড়ন্ত বয়সের একটি শিশুর জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ প্রথম শ্রেণির প্রোটিন অর্থাৎ ডিম, দুধ, মাছ বা মাংস প্রয়োজন, তা তারা পায় না। ডাল থেকে কিছু উদ্ভিজ্জ প্রোটিন এলেও তা শরীরের জন্য পর্যাপ্ত নয়।
ভিটামিন ও মিনারেলের চাহিদা পূরণের অবস্থা হলোÑখাবারের মেনুতে শাকসবজি ও ফলমূলের উপস্থিতি থাকে একেবারেই নগণ্য। মাঝে মধ্যে পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া বা আলু ছাড়া রঙিন ও পুষ্টিকর শাকসবজি খুব একটা রান্না করা হয় না। এছাড়া খাবারে ভিটামিন এ, সি এবং ক্যালসিয়াম ও আয়রনের মতো প্রয়োজনীয় উপাদানের ব্যাপক ঘাটতি থাকে। এ অবস্থা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং পড়াশোনার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত আম্বরশাহ মসজিদ ও মাদরাসার আবাসিকের ১০ বছর বয়সি এতিম এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে জানায়, তাদের মাদরাসায় প্রতিদিন সকালে ভাত, আলু ভর্তা, ডাল; দুপুরে ভাত, ব্রয়লার মুরগি অথবা পাঙাশ মাছ, ডাল; রাতে যেকোনো সবজির ভাজি আর ডালের ব্যবস্থা থাকে। সপ্তাহের প্রতিদিন একই মেন্যু। একই ধরনের খাবার প্রতিদিন খেতে ভালো লাগে না বলেও আলাপচারিতায় শিশু্টি জানায়।
সে জানায়, বিকাল বা সন্ধ্যায় কোনো নাস্তার ব্যবস্থা নেই। তাই একই খাবার ভালো না লাগলেও ক্ষুধার তাড়নায় গোগ্রাসে খেয়ে নেয় তারা। তবে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন জায়গা থেকে বড় মাছ, গরু বা খাসির মাংস, বিরিয়ানি আসে। ভালো খাবার যখন পাও কেমন লাগেÑজানতে চাইলে শিশুটির ভাষ্য, ‘খুব আনন্দ লাগে, সেদিন আমরা সহপাঠীরা সবাই মিলে পেট ভরে মজা করে খাই।’
লালমাটিয়ার সি ব্লকের জামিয়া ইসলামিয়া মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানার হিসাবরক্ষক মাওলানা আবু সাঈদ আমার দেশকে জানান, এখানে আবাসিকে থেকে ৪৫০ জন ছাত্র কোরআন-হাদিস শিখছে। পঞ্চম শ্রেণি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়ানো হয়। মানুষের দেওয়া দান-অনুদান এবং কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকায় এই মাদরাসার শিক্ষার্থীদের খাওয়া ও পড়াশোনা এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য কার্যক্রম চলছে। তিনি আরো জানান, প্রতিদিন ছাত্রদের তিনবেলা খাবারের পেছনে খরচ হয় ২২ থেকে ২৮ হাজার টাকা।
৪৫০ জন ছাত্রের তিনবেলা খাবারে খরচ মাত্র ২৮ হাজার টাকা। এই টাকায় কি ভালো মানের খাবার দেয়া সম্ভবÑআমার দেশ প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে আবু সাঈদ বলেন, আর্থিক সংকটে ছাত্রদের পুষ্টিকর দামি খাবার দেওয়া সম্ভব হয় না। অল্প পুষ্টির খাবার খেয়ে কষ্ট করে আল্লাহর কোরআন শিখতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এই সংকট উত্তরণে রাষ্ট্রীয়ভাবে মাদরাসা শিক্ষাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।
লালমাটিয়ার মাদরাসা নূরে মদিনার পরিচালক হাফেজ মাওলানা মুফতি এহসানুল্লাহ আমার দেশকে বলেন, দীনি ইলম শিক্ষা করতে হলে কিছুটা কষ্ট করতে হবেÑএটাই স্বাভাবিক। মাদরাসাগুলো সামান্য টাকার বিনিময়ে হাজার হাজার ছাত্রের খাবার জোগান দিয়ে থাকে। এতে খাবারের মান না থাকাটা স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ মাদরাসার বদনামও রয়েছে। তবে আমি মনে করি এগুলো কর্তৃপক্ষের অপারগতা। এর সমালোচনা না করাই ভালো। তিনি বলেন, সচ্ছল লোকেরা যদি ঠিকমতো জাকাত দিত তাহলে মাদরাসার এতিম শিক্ষার্থীদের খাবার, পোশাক পরিচ্ছদ ও শিক্ষায় কোনো ঘাটতি তৈরি হতো না।
কওমি ও আবাসিক মাদরাসার শিক্ষার্থীদের পুষ্টিহীনতার হার বেশ উদ্বেগজনক, যা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে
এসেছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কওমি মাদরাসার আবাসিক শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী আন্ডারওয়েট বা স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজনের। তারা প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫৪.৭ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত ফলমূল পায় না এবং ৬৩.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত দুধ বা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার থেকে বঞ্চিত হয়।
কওমি ও আবাসিক মাদরাসাগুলোর একটি বড় অংশে শিক্ষার্থীদের জন্য খেলার মাঠ বা শারীরিক কসরতের ব্যবস্থা থাকে না। পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ৯৫.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো ধরনের নিয়মিত ব্যায়াম বা খেলাধুলায় অংশ নেয় না। এটি তাদের সঠিক শারীরিক গঠনে বাধা সৃষ্টি করে।
বিভিন্ন মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক মাদরাসায় এতিম, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনা করে। মাদরাসার সীমিত বাজেট এবং দাতব্য অনুদানের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে শিক্ষার্থীদের জন্য পুষ্টিকর ও সুষম খাবারের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনধারা সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনার ঘাটতি থাকে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদরাসা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে এবং অপুষ্টি দূর করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে মাদরাসাগুলোয় পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ‘হেলথ স্ক্রিনিং’ চালু করা এবং বাধ্যতামূলক শারীরিক খেলাধুলার ব্যবস্থা করা।
তবে ব্যতিক্রম চিত্রও রয়েছে। কোনো কোনো আবাসিক মাদরাসার খাবারের মান বেশ ভালো দেখা গেছে। সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার বিনিময়ে এসব খাবার পেয়ে থাকে।
রাজধানীর বড় মাদরাসাগুলোর খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বর্তমানে প্রাইভেট মাদরাসাগুলোর খাবারের মান যথেষ্ট পরিমাণ ভালো রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। রাজধানী মিরপুরের ঢাকা আইডিয়াল ক্যাডেট মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহমুদুল হাসান জানান, আমরা প্রতি বেলায় শিক্ষার্থীদের মোটামুটি ভালো খাবার দেওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের খাবারের মানে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা সন্তুষ্ট।
ধানমন্ডি জামে মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্সের সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ আলমগীর আমার দেশকে বলেন, আমাদের মাদরাসাগুলোর বাৎসরিক খরচ জোগান দিতেই হিমশিম খেতে হয়। শিক্ষকদের বেতন-ভাতাও প্রায় সময় বকেয়া পড়ে যায়। সারা বছর টানাহেঁচড়ার মাঝেই কাটে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সব মাদরাসারই খাবারের মান ভালো করা উচিত। সমাজের বিত্তশালীরা যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তাহলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে, ইবতেদায়িসহ দেশের সব মাদরাসায় সরকারের মিড ডে মিল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। গত ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি জানান।
তিনি জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসইডিপি (সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম) কর্মসূচির আওতায় ‘মাদরাসা শিক্ষা উৎকর্ষ সহায়তা কর্মসূচি’ (এমইইএসপি) প্রণয়ন করা হয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে ২০২৬-৩১ অর্থবছরের মধ্যে দেশের সব মাদরাসায় মিড ডে মিল চালু করা হবে। এর আওতায় ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোও থাকবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

