প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রক্সি পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণের চিন্তা থেকে সরে আসছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রাজনৈতিক দলগুলোর অনাস্থার কারণে পিছু হটছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। অপরদিকে, অনলাইনে ভোটদান হ্যাক হওয়াসহ নানা সংশয়ের কারণে এ পদ্ধতি নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়েছে কমিশন। বিকল্প হিসেবে নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিতর্কমুক্ত ভোটদান পদ্ধতি হিসেবে পোস্টাল ব্যালটে ফিরতে উপায় খুঁজছে ইসি।
প্রবাসীদের ভোটদানের সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পোস্টাল ব্যালট প্রেরণ এবং সংগ্রহের আনুমানিক খরচের তথ্য চেয়ে বেসরকারি তিনটি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছে ইসি। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ এক্সপ্রেস কোম্পানি লিমিটেড, মার্ক লাইন এন্টারপ্রাইজ এবং ডিএইচএল ওয়ার্ল্ডওয়াইড এক্সপ্রেস (বাংলাদেশ) প্রাইভেট লিমিটেড।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যালট পেপারের ওজন হবে ১২ গ্রাম এবং প্যাকেটসহ আনুমানিক ওজন ৫০ গ্রাম। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এর আলোকে খরচের হিসাব পাঠাবে। ব্যয় সমন্বয়সাপেক্ষে ইসি পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
ইসির তথ্য ব্যবস্থাপনা অধিশাখার সিস্টেম এনালিস্ট মিজানুর রহমানের স্বাক্ষরে চিঠিটি গত ২৫ জুন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাঠায়। ইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ইসির পর্যালোচনার তথ্যমতে, প্রতীক বরাদ্দের পর পোস্টাল ব্যালট ইস্যু থেকে ফেরত আসা পর্যন্ত ন্যূনতম সময় লাগে ২৬ দিন। ক্ষেত্রবিশেষে আরো সময় লাগে। কিন্তু প্রতীক বরাদ্দ থেকে ভোটদানের সময় থাকে সর্বোচ্চ ২৩ দিন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির এক কমিশনার আমার দেশকে জানান, প্রবাসে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোটদান নিশ্চিত করতে প্রক্সি পদ্ধতিটিকে সহজ ও ঝুঁকিহীন বিবেচনায় নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কমিশনের অবস্থান স্পষ্টকরণে আইটি বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া হয়। কিন্তু অনলাইন পদ্ধতিতে বেশিসংখ্যক মতামত পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে পোস্টাল ব্যালট এবং প্রক্সিতে কমসংখ্যক অভিমত দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের প্রধান স্টেকহোল্ডার, তাদের চাওয়াকে প্রাধান্য দিতে প্রক্সি থেকে সরে আসতে হচ্ছে।
ওই কমিশনার আরো বলেন, পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতির জন্য একটি অনলাইন রেজিস্ট্রেশন অ্যাপ তৈরি করা হবে। যারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে ইচ্ছা পোষণ করবেন সেখানে প্রবেশ করে রেজিস্ট্রেশন করবেন। এলাকা বিবেচনায় প্রত্যেকের নামে ব্যালট ইস্যু করা থাকবে। এ সংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে সংরক্ষিত থাকবে।
ইসির তথ্যমতে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের লক্ষ্যে গত ৮ এপ্রিল ওয়ার্কশপ এবং ২৯ এপ্রিল সেমিনার হয়। সেমিনারে আইটি বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মতামত দেয়। পরে সেমিনারে অংশগ্রহণকারী ২৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিকল্পধারা বাংলাদেশ ও জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম কোনো পদ্ধতির পক্ষে সায় দেয়নি। প্রবাসীদের ভোটদানে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মত দেয় এনডিএম এবং পরবর্তী (ত্রয়োদশ না) নির্বাচনে ভোটদান প্রক্রিয়া অন্বেষণ এবং পরিমার্জনের জন্য পাইলট উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। আর আগামী জাতীয় নির্বাচনে অহেতুক বিতর্ক এড়াতে প্রবাসী ভোটারদের বিষয়টি নিশ্চিত না করা বর্তমান কমিশনের জন্য সমীচীন বলে মত দিয়েছে বিকল্পধারা।
বাকি ২২ দলের মধ্যে তিনটি পদ্ধতিতে (অনলাইন, পোস্টাল ও প্রক্সি) মত দিয়েছে চারটি দল; সেগুলো হচ্ছেÑ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি।
বিএনপিসহ সাতটি দল একটি করে পদ্ধতিতে মতামত দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে বিএনপি ও বাংলাদেশ কংগ্রেস পোস্টাল ব্যালটে। বাকি ৫টি দল অনলাইনে। এগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ, গণঅধিকার পরিষদ-জিওপি ও বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি-বিএমজেপি।
আর ৯টি রাজনৈতিক দল দুটি পদ্ধতিতে তাদের মতামত দিয়েছে। এর মধ্যে অনলাইল ও পোস্টাল ব্যালটের পক্ষে মতামত দিয়েছে ৮টি রাজনৈতিক দল। এগুলো হচ্ছেÑ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ নাগরিক পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি, গণসংহতি আন্দোলন, আমার বাংলাদেশ পার্টি-এবি পার্টি, খেলাফত মজলিস (পাইলটিং), ইসলামী আন্দোলন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি,
একইভাবে দুটি দল পোস্টাল ব্যালট ও প্রক্সি ভোটের পক্ষে তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। এরা হলো বাংলাদেশ লেবার পার্টি ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি। আর অনলাইন ও প্রক্সির পক্ষে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ।
সমন্বিতভাবে প্রবাসীদের ভোটদান নিশ্চিত করতে ১৮টি দল অনলাইনের পক্ষে, ১৫টি পোস্টাল ব্যালটে এবং প্রক্সিকে সমর্থন জানিয়ে ইসিতে মতামত দিয়েছে ৮টি দল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


