আপাতত ভারত সফরে যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী

আপাতত ভারত সফরে যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী

অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জাতীয় স্বার্থ, সর্বোপরি ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ সামনে রেখে আপাতত ভারত সফরে যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো আমার দেশকে এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, নতুন প্রধানমন্ত্রীর জন্য দিল্লি সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, স্পর্শকাতর ও চ্যালেঞ্জিং। পানিবণ্টনসহ যে ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ভারতের সঙ্গে রয়েছে, অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের তা নেই। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যাত্রা শুরুর যে ঘোষণা দিল্লির পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ দিতে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি মোদি সরকার।

বিজ্ঞাপন

আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে বহুল আলোচিত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি। নতুন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান চুক্তিটি বহাল রাখতে ঢাকার অনুরোধে এখন পর্যন্ত সাড়া দেয়নি দিল্লি। সরকারপ্রধানের সফরের জন্য দুদেশের মধ্যে যে ধরনের আস্থার সম্পর্ক থাকা দরকার, এই মুহূর্তে সেটা একেবারেই অনুপস্থিত। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে দিল্লির বিরূপ মনোভাব প্রকাশের পাশাপাশি পুশইনের মাধ্যমে সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি, প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাকে দিল্লিতে বিমানবন্দরে হেনস্তা এবং সবশেষ মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে মাঠে নামিয়ে আবার বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে দিল্লি। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বহুল আলোচিত সম্ভাব্য দিল্লি সফরের যাবতীয় আলোচনা থেমে গেছে। চলতি বছরে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ বলে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।

রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। ভারত আসলে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কাউকে বিশ্বাস করে না। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে ছয় মাসও হয়নি। এরই মধ্যে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারকে চাপে রাখতে চাইছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত যদি তাদের মনোভাব না বদলায় তাহলে তারেক রহমানের সরকারের উচিত হবে দিল্লির সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলা। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের মাধ্যমে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের যে কৌশলগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তা যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে তারেক রহমানের সরকারকে।

দিল্লি সফরের বিষয়টি দূরে সরিয়ে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউ ইয়র্কে আসন্ন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের পাশাপাশি জাপান ও সৌদি আরব সফর নিয়ে প্রস্তুতির কথা জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্ক যাবেন প্রধানমন্ত্রী। ওই সফরের প্রাথমিক প্রস্তুতিও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী নিউ ইয়র্ক যাওয়ার আগে সম্ভাব্য জাপান ও সৌদি আরব সফর নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমার দেশকে জানিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব প্রধানমন্ত্রীকে টোকিও নিতে চায় জাপান সরকার। আগামী ১২ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশ-জাপান পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য জাপান সফরের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

এর আগে প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন দেশটির যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। গত ৬ জুলাই ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহ তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনুষ্ঠানিকভাবে এ আমন্ত্রণের কথা জানান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কূটনীতিক আমার দেশকে জানিয়েছেন, খুব শিগগির সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান ঢাকা সফরে আসতে পারেন। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী যদি ঢাকা না আসেন তাহলে তিনি নিউ ইয়র্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগে নিউ ইয়র্কে যাওয়া-আসার মধ্যেই থাকবেন। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সৌদি সফর নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফর যখন অনিশ্চিত, ঠিক সেই মুহূর্তে চীন সফরের পর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর হবে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এছাড়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধপরবর্তী পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির নতুন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব সফরও হবে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের তাৎপর্য সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র কূটনীতিক আমার দেশকে বলেন, ভারত নিশ্চিতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। তবে প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কখনোই মসৃণ ছিল না। ভারতের সঙ্গে আমাদের অমীমাংসিত অনেক ইস্যু রয়ে গেছে। সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে ভারতের অযাচিত হস্তক্ষেপ, পানিবণ্টনসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর ইস্যু রয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশ সরকারপ্রধানের জন্য ভারত সফর একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ও চ্যালেঞ্জিং। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিরোধী দল পর্যন্ত এ সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফর খুবই চ্যালেঞ্জিং।

ওই কূটনীতিক আরো বলেন, পানিবণ্টনসহ স্পর্শকাতর ইস্যুগুলো সমাধানে দিল্লির তরফ থেকে ইতিবাচক কোনো সাড়া মেলেনি। গঙ্গার পানিবণ্টনের ব্যাপারে নতুন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান চুক্তিটি বহাল রাখার জন্য ঢাকার পক্ষ থেকে যে অনুরোধ জানানো হয়েছে, সে ব্যাপারেও দিল্লির কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক জবাব আসেনি। পুশইনের মাধ্যমে সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি, সীমান্ত হত্যা, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে বাংলাদেশবিরোধী প্রোপাগান্ডা চালানো, সংখ্যালঘু হিন্দুদের আন্দোলনে নামানো, সবশেষ শেখ হাসিনাকে দিয়ে আগামী ডিসেম্বরে তার দেশে ফেরার ঘোষণার মাধ্যমে বর্তমান সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করতে চাইছে দিল্লি।

ওই সিনিয়র কূটনীতিক বলেন, এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে দিল্লি সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য দুদেশের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই একটি আস্থার পরিবেশ দরকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে আস্থার পরিবেশ তৈরি না করে ভারতের নীতিনির্ধারকরা উল্টো চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছেন। শেখ হাসিনাকে মাঠে নামানোর বিষয়টি একেবারেই মেনে নিতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। শপথ অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। তিনি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তাসংবলিত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি চিঠি হস্তান্তর করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে।

ওই চিঠিতে নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য প্রথম বিদেশ সফর নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। প্রধানমন্ত্রী প্রথমে ভারত নাকি অন্য কোনো দেশ সফরে যাবেন, ভারত নাকি চীন—কোন দেশে আগে যাবেন, তা নিয়ে চলতে থাকে আলোচনা।

প্রধানমন্ত্রীকে প্রথম সফরে দিল্লি নিতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালায় ভারত সরকার। তারেক রহমান সরকারের একটি অংশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর হিসেবে দিল্লি যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রথম বিদেশ সফরে দিল্লি যাওয়ার ব্যাপারে সবুজ সংকেত মেলেনি। পরবর্তী সময়ে ভুটান হয়ে দিল্লি সফরের বিষয়টি আলোচনায় আসে। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. হুমায়ূন কবির তখন ঘোষণা করেন, দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশ দিয়েই বিদেশ সফর শুরু করবেন প্রধানমন্ত্রী।

গত ৭ থেকে ৯ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করেন। ওই সফরে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফর এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয় বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান। ওই বৈঠকে জুলাই মাসের প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে দুদেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে চুপ রাখা হবে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন অজিত দোভাল।

এদিকে চীনের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেইজিং নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে শুরু হয় কূটনৈতিক তৎপরতা। গত ৫ থেকে ৭ মে বেইজিং সফরে করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ওই সফরে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। পরে জাতীয় স্বার্থ ও ভূরাজনীতির সমীকরণকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া হয়ে চীনে যান। গত ২১ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের খবর প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় গণমাধ্যম ও দিল্লিভিত্তিক বিভিন্ন থিঙ্কট্যাংক বাংলাদেশ তথা প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে।

ভারতের প্রধান গণমাধ্যমগুলোতে ফলাও করে খবর প্রচারিত হতে থাকে ‘খালেদার ছেলে তারেক ভারতকে পাশ কাটিয়ে চীনের দিকে ঝুঁকছে’। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি রীতিমতো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা ভেবেছিলাম— তারেক রহমান প্রথম সফরে দিল্লিতে আসবেন—সেটা আর হলো না। এখন দেখা যাক— ভারতের উদ্বেগের বিষয়গুলোকে তিনি কীভাবে অ্যাড্রেস করেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ ব্যাপারে তাদের প্রতিক্রিয়া জানায়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোতে কী হচ্ছে— সে ব্যাপারে আমরা নজর রাখছি।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সিদ্ধান্তকে ঘিরে ভারতীয় গণমাধ্যমে এতটাই নেতিবাচক প্রচার চালানো হয় যে, শেষ পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় বেইজিং। চীন সরকারের প্রধান মুখপত্র দ্য গ্লোবাল টাইমসের এক প্রতিবেদনে ভারতের কড়া সমালোচনা করে বলা হয়, কোনো দেশের সরকারপ্রধান কোথায় আগে গেলেন বা পরে গেলেন তা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইস্যু নয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে ভারত যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে তা তাদের দাদাগিরি ফলানোর মানসিকতার পরিচায়ক।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন কৌশলগত ভিত্তি তৈরি হয়। তারেক রহমান সরকারের প্রতি চীনের পক্ষ থেকে অকুণ্ঠ রাজনৈতিক সমর্থনের কথা জানানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ চীন প্রত্যাখ্যান করবে বলে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া মোংলা বন্দরের উন্নয়নকাজ চীনকে দেওয়ার পাশাপাশি তিস্তা প্রকল্পে চীনের যুক্ত হওয়ার বিষয় নিয়ে আবারো সমালোচনায় মুখর হয় ভারতীয় গণমাধ্যম ও থিঙ্কট্যাংকগুলো।

ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো সে দেশের সরকারের নীতি-নির্ধারকদের উদ্ধৃত করে জানায়, চীনের সঙ্গে তারেক রহমান সরকারের ঘনিষ্ঠতা ও কৌশলগত সহযোগিতা ভারত সরকারের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভারত এটাকে তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এবং এর ফলাফল নিয়ে এখনো সমালোচনায় লিপ্ত ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশের সঙ্গে রীতিমতো বৈরী আচরণ শুরু করে মোদি সরকার। দিনের পর দিন পুশইন চেষ্টার মাধ্যমে গোটা সীমান্তজুড়ে চরম অস্থিরতা তৈরি করা হয়। বাংলাদেশে একটি রামমূর্তি স্থাপনকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু হিন্দুদেরও মাঠে নামানো হয়। সর্বশেষ তারেক রহমান সরকারকে চাপে ফেলতে আবারো সামনে নিয়ে আসে ‘হাসিনা কার্ড’। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হাসিনাকে দিয়ে ধারাবাহিকভাবে উস্কানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশে সন্ত্রাস উসকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। হঠাৎই গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ঘোষণা দেন— আগামী ডিসেম্বরে তিনি তার নেতাদের নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবেন। অর্থাৎ, শেখ হাসিনাকে দিয়ে যেভাবে ইউনূস সরকারকে চাপে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল সেই একই পথ ধরে বর্তমান তারেক রহমান সরকারকে চাপে ফেলতে চাইছে দিল্লি। তবে দিল্লির এই আচরণে চরম ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ সরকারের নীতি-নির্ধারকরা। সবকিছু মিলিয়ে যে অস্বস্তিকর পরিবেশ ভারত তৈরি করেছে সেখানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে আপাতত দিল্লি যাওয়া সম্ভব নয় বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তারা আরো জানান, প্রধানমন্ত্রী চীন থেকে ফেরার পর আগামী আগস্ট মাসে তার সম্ভাব্য দিল্লি সফরের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছিল কিন্তু শেখ হাসিনাকে মাঠে নামানোর পর সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

নিকট ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা ও দিল্লির একাধিক কূটনৈতিক সূত্র আমার দেশকে জানান, চলতি বছরে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি জাপান ও সৌদি আরব সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। এর বাইরে আরো কয়েকটি দেশ সফরের সম্ভাবনা রয়েছে তার।

এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত নিউ ইয়র্কে ব্যস্ত থাকবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন না এলে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সম্ভব হবে না।

এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি না যাওয়ার সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক আখ্যা দিয়ে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, ভারত আসলে কোনোভাবেই জুলাই বিপ্লবকে মেনে নিতে পারছে না। তাদের আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কারো প্রতি আস্থা নেই। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ভারতের ব্যাপারে কোনো ধরনের অযৌক্তিক আচরণ করেনি। কিন্তু ভারত বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে একের পর এক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত আসলে তারেক রহমানকে সবসময় চাপের মধ্যে রাখতে চাইছে। হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা সেই চাপ প্রয়োগেরই অংশ।

তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে দিল্লি সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক। প্রধানমন্ত্রী সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। আমি মনে করি, ভারত ইস্যুতে দেশের জনগণ প্রধানমন্ত্রীর পাশে থাকবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, দুদেশের সম্পর্ককে দিল্লি এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যা ঠিক হতে বহু বছর লেগে যাবে। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে— কখন ভারত বাংলাদেশের ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে।

বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম শহীদুজ্জামান এ ব্যাপারে আমার দেশের সঙ্গে আলাপে বলেন, এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক এবং চীন সফরের পর এটি অনিবার্য ছিল। চীনের সঙ্গে যে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা তৈরি হয়েছে— তা টিকিয়ে রাখা এবং চীন সফরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য জরুরি।

তিনি বলেন, ভারত আসলে ইউনূস সরকারের সময়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে যেভাবে স্কেল ডাউন করে রেখেছিল তা এখনো বজায় আছে। সম্পর্ক উন্নয়নে দিল্লি কোনো পদক্ষেপই নেয়নি, বরং চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়ে আবারো হাসিনা কার্ড খেলছে। দিল্লি চাইছে— তারেক রহমান চাপে পড়ে দিল্লি গিয়ে ঘোষণা করুক— ‘সবার আগে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক’। ভারত তার মানসিকতা না বদলানো পর্যন্ত তাদের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা উচিত বলে মন্তব্য করেন এম শহীদুজ্জামান। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে দিল্লি হয়তো একটা বার্তা পাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন