দিনের বেলায় শ্রমিক দিয়ে আর রাতে এক্সকেভেটর দিয়ে কেটে সাবাড় করা হচ্ছে পাহাড়। একদিকে পাহাড় কাটা চলছে অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে ১৭ তলা ভবন, অভিযোগ স্থানীয়দের।
চট্টগ্রাম নগরীর আসকারদিঘির পাড়ে রাস্তার পাশে বড় একটি পাহাড়ে চলছে এই কর্মযজ্ঞ।
‘স্বপ্নিল ফ্যামিলি ওনার্স’ নামের বহুতল এই ভবনের পিলার ও রিটেইনিং দেয়ালের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ১৭ তলা ওই ভবনে নির্মাণ করা হচ্ছে ৯২ জনের ফ্ল্যাট।
রাত ১১টার পর নির্মাণসামগ্রী ঢোকে
সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই জায়গাটি ঘিরে রয়েছে পাহাড়। দিনের বেলায় ওই ভবনের বেষ্টনীর ভেতরে প্রবেশের দরজা বন্ধ থাকে। ভেতরে নিরাপত্তা প্রহরী থাকেন। রাত ১১টার পর ভেতরে নির্মাণসামগ্রী ঢোকানো হয়। পাশাপাশি পাহাড় কাটা মাটি পরিবহন করা হয় ভোর পর্যন্ত।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের আসকারদিঘির পাড় এলাকায় ওই পাহাড়ের ঢালের সর্বোচ্চ উচ্চতা ১২৭ ফুট। পাহাড় সরকারের রেকর্ডে ভিটে হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। কয়েক হাত বদল হয়ে সবশেষ ব্যবসায়ী সজল চৌধুরী, খোকন ধর, হিমেল দাশ, সুভাষ নাথ, রনজিৎ কুমার দে, রূপক সেনগুপ্তসহ ৯২ জনই ভবনের জায়গার মালিক। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ১০ কোটি টাকায় কেনা জায়গাটি জামালখান এসএস খালেদ রোডে গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকের পাহাড় নামে পরিচিত। ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল তিনটি বেজমেন্ট ও ১৭ তলা ভবনের অনুমোদন নেওয়া হয়।
এদিকে, অভিযোগ রয়েছে যাচাই-বাছাই না করে বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন দেয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। শর্তসাপেক্ষে ভবন নকশার অনুমোদন দিয়ে দায় সেরেছে প্রতিষ্ঠানটি।
অভিযোগে পদক্ষেপ না নেওয়ার সুযোগ
চার বছর আগে পাহাড় কেটে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠলে সেখানে অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। পরে সেই জরিমানা আদায় ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার সুযোগ নিয়ে নির্বিচারে পাহাড় কেটে বহুতল ভবন নির্মাণ চলমান রেখেছে ভূমিদস্যুরা। সংশ্লিষ্ট এসব দপ্তরের রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা।
২০২০ সালের ১ জুন নগরের আসকারদিঘির পাড় এলাকায় ২৮ হাজার বর্গফুট পাহাড় কাটার দায়ে ২ জনকে ২৮ লাখ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম। পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রোর উপপরিচালক মিয়া মাহমুদুল হক বলেন, নির্মাণকাজের জন্য জায়গা বাড়াতে দুই ব্যক্তি গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকের পাহাড় কেটে সমান করেছিলেন।
২০২৪ সালের ১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বরাবর রাতের আঁধারে পাহাড় কেটে ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ করে নগরীর আসকারদিঘির পাড়ের পার্শ্ববর্তী এবিসি মাহবুব হিলস ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। অভিযোগে স্বাক্ষর করেন ফ্ল্যাট মালিক ডা. মর্তুজা নুরুদ্দিন, রফিকুল ইসলাম ও হাসান মানিক। অভিযোগের অনুলিপি দেওয়া হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় কাউন্সিলর, কোতোয়ালি থানা ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ।
স্বপ্নিল ফ্যামিলি ওনার্সের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ‘স্বপ্নিল ফ্যামিলি ওনার্স’ কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিমেল দাশ বলেন, আমরা সিডিএর শর্ত মেনে ভবন নির্মাণ করছি। পাহাড় কাটছি না। যেভাবে তারা নির্দেশনা দিয়েছে সেভাবে নির্মিত হচ্ছে ভবন। আমাদের তিন বেজমেন্টে তিনটি পার্কিংসহ মোট ১৭ তলা ভবনের অনুমতি রয়েছে।
পাহাড় কাটার দায়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কর্তৃক জরিমানার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিবেশ অধিপ্তর যে সময় জরিমানা করেছিল, সে সময় ভবনের নকশার অনুমোদন হয়নি। পরে নিয়েছিলাম নকশার অনুমোদন। সিটি করপোরেশন কোনো জরিমানা করেনি।
বেলার বক্তব্য
বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় নেটওয়ার্ক মেম্বার আলীউর রহমান বলেন, পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের বিষয়ে মালিকদের বেলার পক্ষে একটি লিগ্যাল নোটিস প্রেরণ করা হয়। সেই নোটিসের সূত্র ধরে হাইকোর্টে রিট করেন ভবন মালিকরা। ওই রিটের প্রেক্ষিতে ভবনের কার্যক্রম স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে আদেশ দেন হাইকোর্ট। এই আদেশ অমান্য করে প্রশাসনের সামনে ভুলভাবে উপস্থাপন করে নির্বিচারে পাহাড় কেটে নির্মাণ করছে বহুতল ভবন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

