ডিসি অফিসের দুর্নীতি রুখতে চালু হচ্ছে নতুন সফটওয়্যার

ডিসি অফিসের দুর্নীতি রুখতে চালু হচ্ছে নতুন সফটওয়্যার

ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পেতে বছরের পর বছর ভোগান্তি, হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে সাধারণ মানুষের। বিশেষ করে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় থেকে ক্ষতিপূরণের চেক নিতে গিয়ে ‘টেবিলবাণিজ্য’ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগও রয়েছে। এসব ভোগান্তি নিরসনে এবার ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পুরোপুরি ক্যাশলেস করার যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

নতুন এই ব্যবস্থায় আর সশরীরে ডিসি অফিসে গিয়ে চেকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না; ঘরে বসেই অনলাইন চ্যানেলে ক্ষতিপূরণ পাবেন ভূমির মালিকেরা। কাজটি করা হচ্ছে সম্পূর্ণ সরকারি (জিওবি) অর্থায়নে। চলতি বছরের শেষের দিকে এটা চালু হতে পারে বলে জানিয়েছেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

বিজ্ঞাপন

ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই অটোমেশন কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে ‘ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড রিকুইজিশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (এলআরএমএস) সফটওয়্যার চালু করা হচ্ছে। এছাড়া ‘লিজ অ্যান্ড সেটেলমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (এলএসএমএস) নামে আরেকটি প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনায় এসব সফটওয়্যার কাজে লাগানো হবে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাইজেশন, নলেজ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড পারফরম্যান্স (ডিকেএমপি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব এমদাদুল হক চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ভূমি অধিগ্রহণের পর জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে নানা ধরনের হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগ শোনা যায়। বিশেষ করে, চেক হস্তান্তর নিয়ে ঘুসবাণিজ্যের ঘটনাও ঘটে। তাই সরকার দুর্নীতি বন্ধে ক্যাশলেস বা নগদহীন সেবা চালু করছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নতুন এই পদ্ধতিতে কাজের প্রক্রিয়া হবে অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সহজ। সাধারণ নাগরিক বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ঘরে বসেই বা অনলাইনে সিস্টেমে লগইন করে আবেদন করতে পারবেন। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ক্ষতিপূরণের টাকা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম (আইবাস) পদ্ধতির মাধ্যমে এ টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ফলে মধ্যস্বত্বভোগী বা ডিসি অফিসের কোনো কর্মকর্তার টেবিলে যেতে হবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় অগ্রাধিকার তালিকার মধ্যে রয়েছে এলআরএমএস সফটওয়্যার প্রকল্পটি। সফটওয়্যারটির মূল কাঠামো ও ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া (বিজনেস লজিক) চূড়ান্ত করার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে অর্থ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়, আইবাস ইন্টিগ্রেশন এবং ই-চালান সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত কাজ চলছে।

সফটওয়্যারটি চলতি আগস্টের মধ্যে সরাসরি (লাইভ) আনার পরিকল্পনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট সব ব্যবস্থার সমন্বয় সম্পন্ন করে চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হতে পারে। সফটওয়্যারটি তৈরি করছে ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালট্যান্টস লিমিটেড (ডিডিসি)। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

আইন অনুযায়ী, ভূমি অধিগ্রহণে কোনো ধরনের মালিকানা বিরোধ বা আদালতের স্থগিতাদেশ না থাকলে নোটিস জারির পর ১২০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, মামলা বা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন কোনো বিষয় থাকলে আইনি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব হয় না।

ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও সরকারের যুগ্মসচিব পারভেজ হাসান আমার দেশকে বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণে স্বচ্ছতা ফেরাতে এলআরএমএস নামে একটি সফটওয়্যার অন্তর্ভুক্তির কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিএনপির অগ্রাধিকার তালিকায় এই প্রকল্পটিকে একীভূত করা হয়েছে। ফলে দ্রুতই এটি আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের দিকে এটা চালু হতে পারে। অধিগ্রহণ হওয়া জমিতে আপত্তি ও ত্রুটি না থাকলে কোনো খরচ ছাড়াই ১২০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ পেয়ে যাবেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডিজিটাল ও নগদহীন এ ব্যবস্থা চালু হলে ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণ বিতরণের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে। কমে আসবে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য। অনুরূপভাবে, সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তিও আশানুরূপভাবে কমে আসবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন