প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফরে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে দেওয়া বক্তব্যে আশাবাদী চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে মিরসরাই থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত শিল্প-কারখানা স্থাপন, চট্টগ্রামে চীনা বিনিয়োগ এবং সমুদ্রসম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর পরিকল্পনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারা। একই সঙ্গে শঙ্কার কথাও জানালেন চট্টগ্রামের শিল্পোদ্যোক্তারা। চট্টগ্রামে চলমান বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট, বন্দরের কনটেইনারজট, পণ্য খালাসের সময় ও খরচ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা।
গত রোববার চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কর্মসূচিতে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিরসরাই থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত বিভিন্ন শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় চট্টগ্রামকে একটি অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য চীনা বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যকে চট্টগ্রামের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, দেশের প্রধান বন্দরনগরীতে শিল্পায়নের যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তা বাস্তবায়ন করা গেলে শুধু চট্টগ্রাম নয়Ñপুরো দেশের অর্থনীতিতেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আমিরুল হক জানান, দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধির জন্য চট্টগ্রাম সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ জনপদকে ঘিরে তারেক রহমান যে রূপরেখা দিয়ে গেছেন, তাতে ব্যবসায়ীরা আশাবাদী। চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে সমুদ্র। সমুদ্রের বিশাল জলরাশি ও সম্পদ ঘিরে প্রধানমন্ত্রীর যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা চট্টগ্রাম তথা পুরো দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। এর ফলে নতুন নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দেশের বাণিজ্য আরো সম্প্রসারিত হবে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, সরকার শিগগির এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।
শিল্পায়নের আগে জ্বালানি নিশ্চিতের দাবি
ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ। চট্টগ্রামের অনেক শিল্প-কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, বিদ্যুৎ সরবরাহে ওঠানামা এবং জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্পের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতেও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা।
শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে তাদের কারখানা নিয়মিত ও নির্বিঘ্নে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারবে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
গত ৮ জুলাই সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে আলাদা দুটি চিঠি পাঠিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই)। সেখানে গ্যাস ও বিদ্যুৎ ইস্যুতে শিল্পমালিকদের জন্য বিশেষ ছাড়ের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি আমিরুল হক চিঠিতে উল্লেখ করেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ সমস্যার কারণে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, প্লাস্টিকসহ ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প-কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে অনেক কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে অথবা অলিখিত ‘লে-অফ’ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
আমিরুল হক বলেন, সরকার আমাদের চিঠির বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যে এর সমাধান হবে। প্রধানমন্ত্রীও তার বক্তব্যে দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ জরুরি
চট্টগ্রামে চীনা বিনিয়োগে কয়েকশ মিল-কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। তবে তাদের দাবি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তাদেরও বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে। স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিদেশি কোম্পানির মধ্যে সরবরাহ, কাঁচামাল, পরিবহন ও সেবা খাতে অংশীদারত্ব তৈরি করা গেলে এর সুফল আরো বিস্তৃত হবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, বিদেশি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ দেশের ব্যবসার জন্য ভালো; তবে সেটা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উপেক্ষা করে নয়। বিদেশি এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে পারলে দেশের অর্থনীতি দ্রুত এগিয়ে যাবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা হারিয়ে গেলে বিদেশি বিনিয়োগেও দেশের অর্থনীতি খুব একটা ভালো করবে না। আশা করি নতুন সরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে কাজ করবে।
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে গুরুত্বারোপ
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ব্যবসায়ীরাও মনে করেন, বিনিয়োগের জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, কাস্টমসের অ্যাসেসমেন্ট (মূল্যায়ন) সম্পন্ন হতেই ৮ থেকে ১০ দিন সময় লেগে যায়; কিন্তু চারদিন পরই কাস্টমস ডেমারেজ চার্জ ধরা শুরু করে। ফলে পঞ্চম দিন থেকেই ব্যবসায়ীদের জরিমানা গুনতে হয়। বিলম্বিত খালাসের কারণে আমদানিকারকদের মূলধন আটকে যায়, কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং বন্দর ইয়ার্ডেই মূল্যবান পণ্য নষ্ট হয়ে যায়।
বিজিএমইএ পরিচালকের মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেজা) সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এগুলো দেশের বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বৃদ্ধির প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান। এখানে ফাইল নড়াচড়ায় সময় নষ্ট হলে পুরো ব্যবসা খাত ক্ষতির সম্মুখীন হয়। উদ্যোক্তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে নীতির ধারাবাহিকতা, দ্রুত অনুমোদন, জমি ও ইউটিলিটি সুবিধা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসায়ীরা জানান, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাড়লে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপও বাড়বে। এ কারণে তারা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পণ্য খালাসে সময় কমানো, কাস্টমসের জটিলতা দূর করা এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নত করার ওপর গুরুত্বারোপের আহ্বান জানান।
এদিকে মিরসরাই ও মাতারবাড়ীতে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপিত হলে এসব শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির বড় অংশই চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করবে। তাই নতুন বিনিয়োগের সঙ্গে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজও এগিয়ে নেওয়ার দাবি তাদের।
ব্যবসায়ীদের মতে, বন্দরে পণ্য খালাসের সময় ও ব্যয় কমানো গেলে চট্টগ্রামকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

