জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালকের পদ থেকে আফসানা বেগমের অব্যাহতিকে কেন্দ্র করে একটি চিহ্নিত মহল অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ দেশের খ্যাতিমান লেখক ও সাহিত্যিকরা এই অভিযোগ করেছেন।
তাদের মতেÑজাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে গত দেড় বছরে বিজাতীয় কর্মকাণ্ডই হয়েছে বেশি। জুলাই অভ্যুত্থানের নীতির প্রতিফলন হয়নি এ সময়ে। সাড়ে ১৫ বছরে গেঁথে যাওয়া ‘আওয়ামী বন্দনা আর বাঙালি চেতনা’র কবল থেকে মুক্ত হওয়ার পরিবর্তে আরো জোরদার করার চেষ্টা হয়েছে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ব্যাপক অনিয়ম ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করায় কয়েকদিন আগে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে সরকার। একইদিনে প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও কবি–প্রবন্ধকার সাখাওয়াত টিপুকে এ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে আফসানা বেগমের নিয়োগ বাতিলের পর ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী ও বামপন্থি বুদ্ধিজীবী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিরা অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বিভন্ন মাধ্যমে বিষোদগার করে চলছে। বিশেষ করে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা।
মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র সরকারি প্রতিষ্ঠান যেটি সারা দেশে বই পাঠের কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে থাকে। সরকার নিজ উদ্যোগে বই কিনে বিভিন্ন বেসরকারি লাইব্রেরিতে পাঠায় অনুদান হিসেবে। একটি কমিটির মাধ্যমে এ কাজ সমন্বয় করা হয়। এটি ‘বই নির্বাচন কমিটি’ নামে পরিচিত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনুদানের জন্য বই নির্বাচন কমিটি কর্তৃক নির্বাচিত চূড়ান্ত তালিকা দেখলে আফসানা-সিন্ডিকেটের হদিস পাওয়া যাবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, এ কমিটিতে মোশাহিদা সুলতানা (ঋতু) এবং আহমাদ মোস্তফা কামাল ছিলেন। মোশাহিদার একটি এবং কামালের তিনটি বই ক্রয় তালিকায় রয়েছে। কমিটির সদস্য হয়ে নিজের বই নিজে তালিকাভুক্ত করা প্রচলিত রীতি ও নৈতিকতাবিরোধী। এছাড়া, পুরাতন আওয়ামী বাঙালি জাতীয়তাবাদের বয়ান উৎপাদনকারী বই রাখা হয়েছে কেনার তালিকায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর বইও তালিকায় স্থান পেয়েছে। এমনকি ১৭ বছর ধরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের ধারক ও বাহক- সেই কবি নির্মলেন্দু গুণ, সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, ইমতিয়ার শামীম, অদিতি ফালগুনী, কুমার চক্রবর্তী, স্বকৃত নোমান, মোজাফফর হোসেনদের একাধিক বই রাখা হয়েছে। এদের কারো কারো চার-পাঁচটি বই রাখা হয়েছে কেনার তালিকায়।
কর্মকর্তারা জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে সক্রিয়ভাবে অবস্থান নেওয়া ব্রাত্য রাইসু, রিফাত হাসান, পিনাকী ভট্টাচার্য, রক মনু, মাহবুব মোর্শেদ, গাজী তানজিয়া, সালাহ উদ্দিন শুভ্র, রোবায়েত হাসান, ইমরুল হাসান, এহসান মাহমুদ, তুহিন খান, মীর হুজাইফা মাহমুদ, মৃদুল মাহবুব, এহসান মাহমুদ ও মাহমুদুর রহমানের মতো অনেকের বই বাদ পড়েছে।
কর্মকর্তারা আরো জানান, তালিকায় শাপলা ট্র্যাজেডি নিয়ে কোনো বই নাই। অথচ শাপলা ট্র্যাজেডি নিয়ে অন্তত দশটা বই বের হয়েছে। পিলখানা ট্র্যাজেডি নিয়েও বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘সাজ্জাদ-আফসানা’ সিন্ডিকেটের কাছে এসব বই পাত্তাই পায়নি।
তারা বলেন, এবারের বইয়ের তালিকায় মালেকা বেগম, সাজ্জাদ শরিফ, দন্তস্য রওশন ও জাহিদ রেজা নূরেরও একাধিক বই রয়েছে। অথচ ফরহাদ মজহারের বই আছে মাত্র একটি।
জানা যায়, বদরুদ্দীন উমর, ফরহাদ মজহার, সলিমুল্লাহ খান, ফাহাম আব্দুস সালামের বই উপদেষ্টার বিশেষ অনুরোধে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, আনু মুহাম্মদের বই রয়েছে অন্তত চারটি এবং আজফার হোসেন ও কল্লোল মোস্তফার একাধিক বই রয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আফসানা বেগমের বিশেষ সিন্ডিকেটের পছন্দের কিছু প্রকাশককে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ওই সব প্রকাশকের যে ন্যারেটিভ, সে অনুযায়ী বই নির্বাচন করা হয়েছে। পুরোনো আমলের ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’র মতো বই রাখা হয়েছে তালিকায়। অথচ পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ও পলাতক শেখ হাসিনার ১৫ বছরের দুঃশাসনের সমালোচনা করে লেখা কোনো বই যেমন তালিকায় নাই, তেমনি ৭২ থেকে ৭৫ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবের শাসনামল ও বাকশালের সমালোচনা করে লেখা বইও রাখা হয়নি। প্রহসনের নির্বাচন নিয়ে মাহবুব তালুকদারের বইটি দিলেও সেটা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
সাংবাদিক মাহফুজুল্লাহ ও মাহবুবুল্লাহর লেখা বই জমা দিলেও তালিকায় সেগুলো রাখা হয়নি বলেও জানান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। একজন কর্মকর্তা জানান, বাছাই করা বইয়ের তালিকায় জিয়াউর রহমানের ওপর লেখা বইও কৌশলে বাদ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, বই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারে থাকা ২০ ভাগের নিয়মটিও বাতিলের প্রস্তাব করেছিলেন সাবেক পরিচালক আফসানা বেগম। এর মাধ্যমে তিনি মূলত মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
আফসানা বেগমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল ও তার ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মফিদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া ও বাতিল করার বিষয়টি সরকারের একটি রুটিন ওয়ার্ক। আইন মেনেই আফসানা বেগমের নিয়োগ বাতিল হয়েছে। এটি নিয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলার নেই। আমরা সবাই সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করি। দায়িত্বে থেকে সরকারের নীতির বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকারের ভিত্তি হচ্ছে দেশের জনগণ। একটি সফল অভ্যুত্থানের পর জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের আলোকে গৃহীত নীতি বাস্তবায়ন করতে। আফসানা বেগম এটা জেনে ও বুঝেই নিয়োগপত্র গ্রহণ করেছেন। অথচ তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এ নীতিকে অবজ্ঞা করেছেন। আফসানা বেগমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের পর তিনিসহ কেউ কেউ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে জনগণকে ভুল বার্তা দিচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন এই সচিব।
এসব অভিযোগের বিষয়ে আফসানা বেগম আমার দেশকে বলেন, আমাদের যে নীতিমালা ছিল তার বাইরে একচুলও আমরা এদিক-ওদিক যাইনি। সুতরাং এখানে ঝামেলা ছিল- তা কেউ বের করতে পারবে না- তা আমি নিশ্চিত। বই সিলেকশন কমিটির আমি একজন সদস্য। এখানে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ছাড়াও গণগ্রন্থাগার, বাংলা একাডেমি, আর্কাইভ, কপিরাইট এসব প্রতিষ্ঠান থেকে একজন করে পরিচালক ছিল। দুজন কথা সাহিত্যিক, দুজন অধ্যাপক ছিলেন যেখানে এত লোক ছিল। তারা কেউ চায়নি নীতিমালার বাইরে যেতে।
তিনি আরো বলেন, নীতিমালা অনুয়ায়ী প্রকাশকদের কাছ থেকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে একটা তালিকা চাওয়া হয়। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের তালিকা নিয়ে কথা ওঠে। সে সময় গ্রন্থকেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিতে ছিল ৫০টি বই যে কোনো সময়ের যে কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দিতে পারে। সেখানে তারা (প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান) যে বই দেবেন, সেগুলোর ভেতর থেকে বই নির্বাচন কমিটিকে বই নির্বাচন করতে হবে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান তার তালিকায় কোনো নির্দিষ্ট লেখকের বই না দিয়ে থাকে, তাহলে সে বই নেওয়ার কোনো এখতিয়ার ওই কমিটির নেই।
আফসানা বেগম জানান, এই কমিটি বইয়ের তালিকা শুধু সুপারিশ করে। বই অনুমোদন করেন মন্ত্রণালয়। তালিকা থেকে বই কেটে দেওয়ার এখতিয়ার তাদেরই। সে সময় যাদের বই নেওয়া নিয়ে কথা উঠেছিল তাদের বই সচিব কেন কেটে দেয়নি। তাহলে যে বইগুলো নিয়ে বিতর্ক সেগুলোর দায়টা অনুমোদনকারীদের ওপরই যাবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

