কাজ শুরু হওয়ার আগেই বড় ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা ও অদূরদর্শিতার খেসারত দিতে হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডকে (ইডিসিএল)। প্রাথমিকভাবে মানিকগঞ্জে প্লান্ট স্থাপনের কথা থাকলেও, পরবর্তী সময়ে তা সরিয়ে মুন্সীগঞ্জে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জমিসংক্রান্ত জটিলতা ও কৃষিজমির সুরক্ষা নিশ্চিত করার যুক্তিতে প্রকল্পটির ঠিকানা বদল করা হয়।
ফলে ভৌগোলিক অবস্থান পরিবর্তন ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রথম সংশোধিত প্রস্তাবে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৬৭২ কোটি টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। যাকে অস্বাভাবিক বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই এ ধরনের বিপুল পরিমাণ ব্যয় বৃদ্ধি সরকারি অর্থের অপচয় এবং স্থান নির্বাচনে দুর্বল পরিকল্পনার বহিঃপ্রকাশ। এদিকে, প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত এই অতিরিক্ত ৬৭২ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে, নাকি আগের মতো ৬০:৪০ অনুপাতে ঋণ ও ইকুইটি কাঠামোর আওতায় (যেখানে সুদের হার ১ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে) অর্থায়ন করা হবে—তা নিয়ে অর্থ বিভাগের সুনির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত মতামতের অপেক্ষায় রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।
জানা যায়, ২০২২ সালে প্রকল্পটি শুরু হয়ে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালে। কিন্তু এখনো স্থানই চূড়ান্ত হয়নি। অথচ প্রাক্কলিত ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে এই বিপুল পরিমাণ টাকা। অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
ইডিসিএলের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ২০২২ সালে মানিকগঞ্জের সদর উপজেলার জাগীর ইউনিয়নের মেঘশিমুল মৌজায় এই প্লান্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরুর আগেই সৃষ্টি হয় জটিলতা। কয়েক বছর পর জানা গেল ওই মৌজায় বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি রয়েছে। এখানে কারখানা স্থাপিত হলে এলাকার কৃষি খাতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
এছাড়া এখানে জমির দামও বেড়ে গেছে অস্বাভাবিক হারে। ফলে ইডিসিএল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে মানিকগঞ্জের বদলে প্লান্টটি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে স্থাপন করতে চায়। আর এজন্য অতিরিক্ত ৬৭২ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে প্রস্তাবিত ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে প্রথম ডিপিপিতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১,৯০৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা। বর্তমানে প্রস্তাবটি অর্থ বিভাগ পর্যালোচনা করছে।
ইডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প উন্নয়ন) বিএম ইমাম হাসান আমার দেশকে বলেন, জায়গা পরিবর্তন এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যয় বেড়েছে। তিনি বলেন, স্থান পরিবর্তন সরকারি সিদ্ধান্ত। তবে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে সময় গড়িয়ে যাওয়ার বিষয় কিছুটা দায়ী বলে তিনি মনে করেন।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে সম্প্রতি অর্থ বিভাগে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির অতিরিক্ত অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে, নাকি আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৬০:৪০ অনুপাতে ঋণ ও ইকুইটির মাধ্যমে অর্থায়ন করা হব সে বিষয়ে স্পষ্ট মতামত প্রয়োজন। এটা ঋণ হলে সুদের হার ১ শতাংশ রাখারও প্রস্তাব করা হয়েছে। অবশ্য মানিকগঞ্জ প্লান্ট স্থাপনের জমির পরিমাণ ধরা হয়েছিল ৩১.৫০ একর। আর মুন্সীগঞ্জের বেলায় ধরা হয়েছে ৪০ একর জমি। এতে ব্যয় কিছুটা বাড়া স্বাভাবিক।
জমি জটিলতায় বদল ঠিকানা
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের চিঠিতে প্রকল্পের স্থান পরিবর্তনের কারণ হিসেবে সরাসরি বলা হয়েছে, ‘ইডিসিএল মানিকগঞ্জ প্লান্টের জমিসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্লান্টটি মানিকগঞ্জের পরিবর্তে মুন্সীগঞ্জে স্থানান্তরের প্রস্তাব করেছে। অর্থাৎ প্রকল্পের অনুমোদনের পর জমি নিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় স্থান পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে একনেক যে প্রকল্প অনুমোদন করেছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার তেজগাঁওয়ের পুরোনো প্লান্টের পরিবর্তে মানিকগঞ্জে আধুনিক ও বড় পরিসরের উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন। একই প্রকল্পে নতুন করে স্থান নির্বাচন, জমি যাচাই এবং প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
মুন্সীগঞ্জে একাধিক প্লান্ট
ইডিসিএল সূত্র জানায়, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ইডিসিএলের নতুন ওষুধ, টিকা ও অ্যান্টিভেনম উৎপাদন স্থাপনা করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। গোপালগঞ্জের বিদ্যমান টিকা উৎপাদন ইউনিট এবং মানিকগঞ্জের প্লান্টও নতুন স্থানে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন স্থানের জন্য ৪০ একরের বেশি জমি সুরক্ষিত করার কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইডিসিএলের একাধিক উৎপাদন প্রকল্পকে মুন্সীগঞ্জে কেন্দ্রীভূত করার পরিকল্পনার সঙ্গে মানিকগঞ্জ প্লান্ট স্থানান্তরের প্রস্তাবটি যুক্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, যেকোনো বড় সরকারি শিল্প প্রকল্প অনুমোদনের আগে জমির মালিকানা, জমির প্রাপ্যতা, ভূমি ব্যবহার, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি, অবকাঠামো এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের বিষয় যাচাই করার কথা। কারণ স্থান পরিবর্তন হলে ভূমি উন্নয়ন, অবকাঠামো, নকশা ও অন্যান্য ব্যয়ে পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু ইডিসিএল সে রকমটা না করেও প্রকল্প প্রস্তাব চূড়ান্ত করে তা অনুমোদনও করে। এতে করে একদিকে সময় অতিবাহিত হয়েছে। অন্যদিকে সময়ের পরিবর্তনে ব্যয় বেড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টার ন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এখানে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো প্রকল্পের কাজ এখনো শুরুই হয়নি। অথচ প্রকল্পটি ২০২৭ সালে শেষ হওয়ার কথা। আবার স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রেও খুবই অদূরদর্শিতা দেখিয়েছে ইডিসিএল। এসব দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের জন্যই আমাদের ভৌতিক ব্যয়ের প্রকল্প দেখতে হয়। যেখানে মূলত জনগণের অর্থের অপচয় ঘটে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরো বলেন, ইডিসিএলের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আধুনিকায়ন করতে হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অডিট আপত্তি রয়েছে। সেখানে যারা অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তা না হলে অর্থ অপচয়ের এই ঝুঁকি থেকেই যাবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

