দখলবাজিতে বিলীনের পথে ধূপখোলা মাঠ

দখলবাজিতে বিলীনের পথে ধূপখোলা মাঠ
পুরান ঢাকার ধূপখোলা মাঠে নির্মাণাধীন মার্কেট। ছবি: রফিকুর রহমান রেকু

স্বৈরাচার এরশাদ আমলে ২৬২টি দোকান নির্মাণের নামে শুরু হয়েছিল পুরান ঢাকার ধূপখোলা মাঠ দখলের ইতিহাস। তারই ধারাবাহিকতায় নাম লিখিয়েছিলেন সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল মাঠ তৈরির মুলা ঝুলিয়ে পুরো মাঠটি গ্রাস করার চেষ্টা করেন তিনি। শুরু করেছিলেন বিশাল মার্কেট নির্মাণের কাজ। হাইকোর্টের নির্দেশে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকলেও এখন পর্যন্ত দখলমুক্ত হয়নি মাঠটি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উন্নয়ন প্রকল্প ও মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগের ফলে ৭.৪৭ একরের ঐতিহাসিক মাঠটি এখন প্রায় চার একরে নেমে আসার শঙ্কায় রয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক সময়ে দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ধূপখোলা মাঠের একটি বড় অংশ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) কাছে পুনরায় হস্তান্তর করা হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর ঢাকা জেলা প্রশাসন মাঠের পাঁচ একর ৩২ শতাংশের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার একর জায়গা বিশ্ববিদ্যালয়কে বুঝিয়ে দেয়। বর্তমানে ওই অংশটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহারের জন্য বাউন্ডারি করা হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, মাঠের এই অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে আসায় নতুন করে বেদখলের ঝুঁকি কিছুটা কমেছে।

সরেজমিনে ধূপখোলা মাঠ পরিদর্শন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) মামলার নথি পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আদালতের নির্দেশ, দখল-উন্নয়ন প্রকল্পের টানাপোড়েনসহ বহুমুখী জটিলতায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ঐতিহাসিক ধূপখোলা মাঠ। সাবেক মেয়র তাপসের সময় আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল মাঠ তৈরির পরিকল্পনার কথা বলে মাঠের একাংশে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সে সরকারের পতন হলেও থেমে থাকেনি দখলবাজির ধারাবাহিকতা। এতে সবশেষ থাবা বসিয়েছেন ডিএসসিসির প্রশাসক শাহজাহান মিয়া।

বেলার করা রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মার্কেট নির্মাণকাজে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিলেও ডিএসসিসির কর্মকর্তারা মার্কেট নির্মাণের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে আসছেন। একইসঙ্গে নির্মাণকাজ পুনরায় শুরুর বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে। নগর বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মার্কেট নির্মাণ সম্পন্ন হলে মাঠের অবশিষ্ট অংশের অস্তিত্বও সংকুচিত হয়ে পড়বে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বমানের ফুটবল খেলার মাঠ বানানোর আড়ালে পরিকল্পিতভাবে মাঠটিকে গ্রাস করতে তৈরি করা হচ্ছে বিশাল স্থায়ী মার্কেট স্থাপনা। জুলাই বিপ্লবের পর থেকে এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তবে এই স্থাপনা বন্ধ করা না হলে শেষ পর্যন্ত মাঠের অস্তিত্ব থাকবে না বলে আশঙ্কা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ধূপখোলা মাঠটি ঢাকা মহানগরীর মধ্যে সর্ববৃহৎ। এ মাঠে পুরান ঢাকার সাতটি থানা এলাকার শিশু-কিশোর খেলাধুলা করে থাকে। শুধু খেলার জন্যই নয়, আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সঙ্গে অবসর সময় কাটাতে এই মাঠে আসেন।

নানামুখী দখলের শিকার ধূপখোলা মাঠ

নানামুখী দখলের শিকার হয়ে আজ অস্তিত্ব হারানোর পথে রয়েছে এ মাঠটি। মাঠে জনসাধারণের জন্য রাখা অংশটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। এর অভ্যন্তরে রিকশা, মাইক্রোবাস, ইট, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, রাস্তা ভাঙার বড় বড় পাথর ও নির্মাণসামগ্রী রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও বেঁধে রাখা হয়েছে গরু-ছাগলসহ নানা ধরনের গবাদিপশু। মাঠের এক পাশে বিশাল মাছের বাজার ও হাঁস-মুরগির বাজার। এছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাত করে ছোট ছোট টিনের ঘর তুলে বিভিন্ন চা-স্টল গড়ে উঠেছে চারপাশে।

স্থানীয় দোকানিরা জানান, এসব ঘর মাদকাসক্তদের নিরাপদ আখড়া। দিনের বেলায়ও এখানে মাদক সেবন চলে। সন্ধ্যার পর রীতিমতো মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। চলে অসামাজিক কাজও। প্রকাশ্যে বিক্রি হয় ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য।

কথা হয় সেখানে থাকা আইসক্রিম বিক্রেতা আবদুস সাত্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে দেখছি মাঠটিকে। কিন্তু এখন এখানে বড় মার্কেট গড়ে তোলা হচ্ছে। মার্কেট হয়ে গেলে আর এর অস্তিত্ব থাকবে না।

এদিকে, মাঠের অপর অংশ ‘ইস্ট এন্ড খেলার মাঠ’ হিসেবে পরিচিত। সেখানে নানা ধরনের টুর্নামেন্ট হওয়ার কথা জানান স্থানীয়রা। কিন্তু এই স্থানেই বিভিন্ন সময় মেলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন ক্লাবের কর্মকর্তারা। জবির অংশটি অন্য দুটি অংশের চেয়ে মোটামুটি দখলমুক্ত। তবে সেখানেও মাঠজুড়ে ভাঙা ইটের টুকরা ছড়িয়ে রয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে এই অংশে খেলাধুলা করছেন স্থানীয় স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা।

দোকান-মার্কেট নির্মাণের ধারাবাহিকতা

সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের নথি অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালে ধূপখোলা মাঠের চারপাশে ২৬২টি দোকান নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে সালামি ও ভাড়া আদায়ের শর্তে ২৫২টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকি ১০টি দোকান তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের নির্দেশে ইস্ট এন্ড ক্লাবের অনুকূলে বিনা সালামি ও ভাড়ায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

পরে মাঠের চারপাশের দোকান অপসারণ করে বরাদ্দপ্রাপ্তদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে মাঠের পশ্চিম পাশে বেজমেন্টসহ ছয়তলা মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ডিএসসিসি। সাবেক মেয়র তাপসের সময় প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হয়। ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্মাণাধীন মার্কেটের নিচতলায় ৯৭টি এবং দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ তলায় ৯৯টি করে মোট ৩৯৪টি দোকান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পঞ্চম তলায় একটি রেস্তোরাঁ ও অফিস ভাড়ার জন্য জায়গা রাখার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

ডিএসসিসির নথিতে আরো দেখা যায়, নতুন মার্কেটে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫২ জন পুরোনো বরাদ্দপ্রাপ্তকে দোকান দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। একই সঙ্গে ইস্ট এন্ড ক্লাবের জন্য ১০টি দোকান বরাদ্দের আবেদনও করা হয়। ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর এ বিষয়ে মেয়র বরাবর আবেদন করে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। পরে ২০২২ সালের ১০ মার্চ দোকান বরাদ্দ কমিটির সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হয়।

মার্কেট নির্মাণের শুরু এরশাদ আমলে

ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৩ সালে তৎকালীন মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন ধূপখোলা মাঠের চারপাশে ২৬২টি দোকান নির্মাণ করে। এর মধ্যে ২৫২টি দোকান সালামি ও ভাড়া আদায়ের শর্তে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকি ১০টি দোকান তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের নির্দেশে ইস্ট এন্ড ক্লাবের অনুকূলে বিনা সালামি ও ভাড়ায় বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এর ধারাবাহিকতায় সাবেক মেয়র তাপসের সময় মার্কেট নির্মাণসংক্রান্ত একটি সুপারিশপত্রে ইস্ট এন্ড ক্লাবের দোকান বরাদ্দের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, নতুন মার্কেট ভবনে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫২ জন পুরোনো বরাদ্দপ্রাপ্তকে দোকান দেওয়ার পর মেয়রের সংরক্ষিত কোটায় থাকা দোকান থেকে মেয়র ইচ্ছা করলে ইস্ট এন্ড ক্লাবের অনুকূলে দোকান বরাদ্দ দিতে পারবেন। এ-সংক্রান্ত আবেদনটি নথিভুক্ত রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।

হাইকোর্টে স্থিতাবস্থার আদেশ

ধূপখোলা মাঠে মার্কেটসহ সব ধরনের নির্মাণকাজে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে ২০২৩ সালের ১২ মার্চ নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। মাঠের ধরন পরিবর্তন ও মার্কেট নির্মাণ সংবিধান ও প্রচলিত আইনবিরোধী কেন ঘোষণা করা হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়। বেলাসহ সাতটি সংগঠনের করা রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত ওই আদেশ দেয়।

আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ফের ২০২৫ সালে ‘ধূপখোলা মাঠ’-এ বহুতল মার্কেট নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে ডিএসসিসি প্রশাসক শাহজাহান মিয়ার বিরুদ্ধে ১১ মার্চ আদালত অবমাননার রুল জারি করে হাইকোর্ট।

বেলার আইনজীবীর দাবি, আদালতের স্থিতাবস্থার আদেশের পরও মার্কেটের দুটি তলার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। সংগঠনটির মতে, মার্কেটসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের ফলে ৭.৪৭ একরের মাঠের আয়তন ৪.০১ একরে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিনোদনমূলক স্থান থেকে বঞ্চিত হবেন।

ডিএসসিসির বক্তব্য

ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগ বলেন, বেলার মামলার কারণে মার্কেটের কাজ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তবে মার্কেট নির্মাণ হলেও মাঠের অবশিষ্ট অংশে খেলাধুলা করা যাবে। এতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

নগর পরিকল্পনাবিদের আপত্তি

নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী খেলার মাঠে বাণিজ্যিক মার্কেট নির্মাণের সুযোগ নেই। আইন ও নগর পরিকল্পনার নীতিমালা উপেক্ষা করে মাঠে মার্কেট ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন। অতীতে র‍্যাংগস ভবন বা বিজিএমইএ ভবনের মতো পরিকল্পনা ও পরিবেশসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনকারী স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার নজির রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, শিশু-কিশোর ও নাগরিকদের খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করতে মাঠে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা প্রয়োজন। খেলার মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান রক্ষায় কঠোরভাবে আইন প্রয়োগেরও দাবি জানান তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন