আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ক্ষমতার দাপটে হত্যাসহ ১৬ মামলায় দায়মুক্ত হাসিনা

নাসির উদ্দিন লিটন

ক্ষমতার দাপটে হত্যাসহ ১৬ মামলায় দায়মুক্ত হাসিনা

খুন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অপরাধের মামলাও ক্ষমতার দাপটে ভোজবাজির মতো উড়িয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গণঅভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। এক-দুটি নয়, ১৬টি মামলা। রয়েছে ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার তাণ্ডবে বর্বর হত্যাকাণ্ডের মামলাও। এর কোনো মামলায়ই বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি ফ্যাসিবাদী সরকারপ্রধানকে। ক্ষমতায় গিয়েই প্রভাব খাটিয়ে সব অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি নেন শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এক-এগারোর আগে ও পরে হত্যা, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৬টি মামলা দায়ের হয়েছিল। ২০০১ থেকে ২০০৭ সালে এসব মামলায় শেখ হাসিনাকে অভিযুক্ত করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে কয়েকটি মামলায় তাকে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টাও হয়েছিল। তবে কোনো মামলায়ই আজ পর্যন্ত তার বিচার হয়নি। পরে ২০০৮ সালে মঈন-ফখরুদ্দিনদের সঙ্গে বোঝাপড়ার নির্বাচনে ক্ষমতায় বসে সবগুলো মামলা থেকে দায়মুক্তি নেন।

বিজ্ঞাপন

ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রপ্রধানদের হত্যা, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি মামলায় ঢালাওভাবে দায়মুক্তি নেওয়ার এমন চর্চা বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করে বলে মন্তব্য করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এতে একদিকে যেমন আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের বিরূপ ধারণা তৈরি হয়, অপরদিকে দায়মুক্তি দেওয়ার প্রবণতা অপরাধকে উৎসাহিত করার শামিল বলেও মন্তব্য করেন তারা। তবে রাষ্ট্র চাইলে পুনরায় ওইসব মামলায় বিচার করা সম্ভব বলে মনে করেন সরকারি কৌঁসুলিরা। বিচারের আশায় আছেন ভুক্তভোগীরা।

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের ছয় নেতাকর্মীকে লগি-বৈঠা দিয়ে হত্যার অভিযোগে রাজধানীর পল্টন মডেল থানায় মামলা হয়। তদন্ত শেষে ২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল শেখ হাসিনাসহ ৪৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ওই বছরের ২২ এপ্রিল অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আদালত পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করে।

তবে পরদিন ২৩ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তার এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পরোয়ানা স্থগিত করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে রাজনৈতিক বিবেচনায় সব মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ৯ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আবু সাঈদ পল্টন থানায় দায়ের করা হত্যা মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসককে একটি চিঠি দেন। একই বছরের ১৭ আগস্ট ক্ষমতার প্রভাবে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন মঞ্জুর করে শেখ হাসিনাকে অব্যাহতি দেয় অনুগত আদালত।

এদিকে নিষ্ঠুরতম এমন হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে এখনও আশায় বুক বেঁধে আছেন ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজনরা। সেদিন ২৮ অক্টোবর পল্টনে সহিংসতার ঘটনায় নিহত সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের বাবা মাহতাব উদ্দিন আহমেদ আক্ষেপ করে বলেন, ৪০/৪২ বছর পর শেখ হাসিনা তার বাবার হত্যাকাণ্ডের বিচার করেছেন। অথচ আমার ছেলেকে এভাবে প্রকাশ্যে হত্যা করা হলো। ছেলে হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো কারাগারে যেতে হলো আমাকে। এখন আমার চাওয়া একটাই ছেলে হত্যার বিচার যেন দেখে যেতে পারি।

পল্টনের ওই ঘটনায় নিহত মোহাম্মদ সিপনের বড় ভাই ডাক্তার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ভাই হত্যার বিচারের আশায় পুরো পরিবার অপেক্ষা করছি। আমাদের এই অপেক্ষার প্রহর কবে শেষ হবে জানি না। দিনদুপুরে নির্মমভাবে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ভাই হত্যার বিচার শুরু হলেও পরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বন্ধ করে দেওয়া হয় বিচারকাজ।

এ মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর একটি নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। সেদিন লগি-বৈঠার যে উল্লাস, সেই উল্লাসে ঘটনাস্থলেই মুজাহিদ, মাসুম, সিপন, ফয়সাল, রফিক, হাবিব ও জসিমকে হত্যা করা হয়। আহত হন অনেকেই। সিরাজুল হক বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, মামলাটি দায়ের হওয়ার পর তদন্ত শেষে হাসিনাসহ ৪৬ জনকে অভিযুক্ত করে সিএমএম আদালতে অভিযোগ পত্র দেওয়া হয়। ওই সময় আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে সব আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করে। এ সময় আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েলসহ অব্যাহতি পাওয়া ২৯ জনের বিরুদ্ধে একটি নারাজি পিটিশনও দাখিল করা হয়েছিল।

আদালত নারাজি পিটিশন আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য আদেশও দিয়েছিল। তবে সিআরপিসির ৪৯৪ ধারায় তৎকালীন ঢাকা মহানগর পিপি আবদুল্লাহ আবু মামলা প্রত্যাহারে আবেদন করেন। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট দিলারা চন্দনা মামলাটি প্রত্যাহারের আদেশ দেন। আমরা দীর্ঘ বছর ধরে অপেক্ষায় ছিলাম। কোনো বিচার পাইনি আমরা। এখন মামলাটি নিয়ে পর্যালোচনা করছি। শিগগিরই এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে যাব। আশা করছি উচ্চ আদালতে সুযোগ পাব, আবার মামলাটি সচল হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, দিনের আলোতে হাজার হাজার মানুষের সামনে এমন হত্যাকাণ্ড থেকে কেউ রেহাই পেতে পারে না।

এদিকে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে প্রত্যাহার করা হয় দুর্নীতির আরও ১০টি মামলা। জানা যায়, দুর্নীতির অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ১০ মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে ছয়টি মামলায় অভিযোগ পত্র দেওয়া হয়। পরে এসব মামলা হাইকোর্ট থেকে বাতিল করা হয়। এছাড়া অপর চার মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় তদন্ত সংস্থা দুদক। এর মধ্য দিয়ে দুর্নীতির সব মামলা থেকে দায়মুক্ত হন শেখ হাসিনা।

২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর বেপজায় পরামর্শক নিয়োগে রাষ্ট্রের দুই কোটি ১০ লাখ এক হাজার ৬৮৮ টাকা ক্ষতির অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন ব্যুরো। তদন্ত শেষে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পত্র দেওয়া হয়। তবে অভিযুক্ত হলেও ২০১০ সালের ৩০ মে এই মামলাটি বাতিল করে দেয় হাইকোর্ট।

অবৈধভাবে মেঘনা ঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দিয়ে রাষ্ট্রের ১৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ক্ষতি করার অভিযোগে ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন ব্যুরো। তদন্ত শেষে ২০০২ সালের ১৪ অক্টোবর শেখ হাসিনাসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পত্র দেওয়া হয়। পরে ২০১০ সালের ২২ এপ্রিল এই মামলাটি বাতিল করে হাইকোর্ট।

নীতিমালা লঙ্ঘন করে রাশিয়া থেকে আটটি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান কিনে রাষ্ট্রের প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ক্ষতিসাধন করার অভিযোগে ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর এ মামলাটি দায়ের করে দুর্নীতি দমন ব্যুরো। এ মামলায় ২০০৮ সালের ২০ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত।

এ মামলার বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার দায়ের করা একটি কোয়াশমেন্ট আবেদন আদালত খারিজ করে দিয়ে নিম্ন আদালতে এই মামলাটি চলবে বলে আদেশ দেয়। প্রধান বিচারপতি এম রুহুল আমিনের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির ফুল আপিলেট ডিভিশন এই রায় দেয়। ফলে বিশেষ জজ আদালতে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০১০ সালের ৯ মার্চ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয়ে দুর্নীতির মামলাটি বাতিল করে দেন বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।

এরপর ২০০২ সালের ৭ আগস্ট ফ্রিগেট কেনায় দুর্নীতির অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন ব্যুরো। রাষ্ট্রের ৪৪৭ কোটি টাকা ক্ষতিসাধনের অভিযোগ আনা হয়। তদন্ত শেষে ২০০৩ সালের ৩ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পত্রও দেওয়া হয়। তবে ২০১০ সালের ১৮ মে এই মামলাটিও বাতিল করে হাইকোর্ট।

একইভাবে সরকারি কর্মচারী হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে পারিতোষিক গ্রহণ ও সহায়তা করা, বিদেশি জ্বালানি কোম্পানি নাইকোকে অবৈধভাবে কাজ দিয়ে রাষ্ট্রের ১৩ হাজার ৬৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতি করা, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার নির্মাণে প্রকল্প সংক্রান্ত সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় দরদাতাকে কাজ দেওয়া, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের তহবিল থেকে পরিশোধের সিদ্ধান্ত থাকলেও তা না করে সরকারি বিধি উপেক্ষা করে ৪১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ মামলা থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয় শেখ হাসিনাসহ অন্যান্যদের।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, দুর্নীতি মামলায় একজনকে দায়মুক্তি দিয়ে আরেক জনের বিচার করা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা তখন সেটা করেছেন।

এদিকে ২০০৪ সালে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ১৯৪৭ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৩(৩) ধারা ও ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেট আইনের ৩(ক) ধারায় অভিযোগ আনা হয়। পরে তিনি এ মামলায় অব্যাহতি পান। এছাড়া ২০০৩ সালে খাগড়াছড়িতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। পরে এ মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। এতে তিনি মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পান।

এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, মার্ডার কেস হওয়া সত্ত্বেও সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে তখন। এ ধরনের দায়মুক্তি অপরাধকে উৎসাহিত করে। তিনি বলেন, এ ধরনের দায়মুক্তি না দিয়ে যদি যথাযথ প্রক্রিয়ায় বিচার করা হতো তাহলে ভবিষ্যতে মানুষ অপরাধ করা থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হতো। সেজন্য কাউকেই কখনও দায়মুক্তি দেওয়া উচিত নয়। সব ক্ষেত্রেই অপরাধকে বিচারের আওতায় আনা উচিত।

এমবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন