ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক সবচেয়ে ‘গভীর’ বলেই বিবেচনা করা হয়। এ অঞ্চলে আমেরিকার কৌশলগত মিত্র হিসেবেও রয়েছে ভারতের নাম। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কের মধ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশ ‘চমৎকার’Ñএমন প্রচারও রয়েছে।
কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব সম্পর্ককে একপাশে সরিয়ে ভারতের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্কারোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এ অঞ্চলে মিয়ানমারের পর ভারতের ওপর শুল্কারোপের এ হার সর্বোচ্চ। ভারতের ‘চির বৈরী’ পাকিস্তানের ওপর ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কহার ২৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে কম শুল্কহার। পাকিস্তানের শুল্কহার তুলনামূলক কম হওয়া ভারতের জন্য কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
শুধু শুল্কহারই নয়, ভারতের পণ্যের ওপর বাড়তি জরিমানা আরোপের কথাও জানিয়েছেন ট্রাম্প। তবে জরিমানার পরিমাণের বিষয়ে কিছুই স্পষ্ট করেননি তিনি। ট্রাম্পের এমন ঘোষণায় ভারতজুড়ে বিস্ময় ও হতাশা বিরাজ করছে। শুধু অর্থনীতিই নয়, আগামী দিনে ভারতের রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
নয়াদিল্লির কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রাম্পের ঘোষণায় তারা বিস্মিত ও হতাশ হয়েছেন। সরকার আলোচনা চালু রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরো বেশি পণ্য কেনার উপায় খুঁজছে।
প্রশ্ন উঠছেÑভারতের ওপর কেন এতটা চটেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প? সে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর পাওয়া না গেলেও ভারতের ওপর ক্ষোভের কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই গত বৃহস্পতিবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া এক পোস্টে পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, ‘ভারত রাশিয়ার সঙ্গে কী করে, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। তারা তাদের মৃত অর্থনীতিকে একসঙ্গে গোল্লায় নিয়ে যেতে পারে। আমরা ভারতের সঙ্গে খুব কম ব্যবসা করেছি, তাদের শুল্ক অনেক বেশি, বিশ্বের সর্বোচ্চ।’
অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসনের বরাতে গণমাধ্যমে যেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে তাতে দেখা যায়, ভারতের ওপর শুল্ক খড়্গ আরোপের অন্যতম কারণ রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে সস্তায় জ্বালানি তেল ক্রয় করে তা পরিশোধন করে পশ্চিমা দেশগুলোয় রপ্তানি করে রাশিয়ার অর্থনীতিকে সহায়তা করছে ভারত। মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টিতে এটি জি-৭ জোটের রাশিয়ার ওপর আরোপিত মূল্যসীমা নীতির পরিপন্থি।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টও কড়া ভাষায় ভারতের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘ভারত এখন আর বিশ্বাসযোগ্য কোনো শক্তি নয়। তারা রাশিয়ার তেল কিনে বিশ্ববাজারে লাভে বিক্রি করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও আমাদের পুরো প্রশাসন ভারতের এ ভূমিকার কারণে অত্যন্ত হতাশ।’
অবশ্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করেই বাণিজ্য করি। ভারতের তেল আমদানি পুরোপুরি বাণিজ্যিক চাহিদার ভিত্তিতে এবং আন্তর্জাতিক নিয়মের আওতায় পরিচালিত হয়। আমরা জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া কোনো একতরফা নিষেধাজ্ঞাকে স্বীকৃতি দেই না।’
শুল্কে সর্বশেষ যে পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্র এনেছে এতে দেখা গেছে, ৫০টিরও বেশি দেশের শুল্ক আগের তুলনায় কমানো হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো রয়েছে। এ অঞ্চলের মধ্যে শুধু ব্যতিক্রম ভারত, যেখানে দেশটির ওপর পূর্বে ঘোষিত ২৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে।
এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, দেশ দুটির মধ্যে বিরাজমান সম্পর্কের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সম্প্রতি আমেরিকা অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে যে অভিযান শুরু করেছে, তাতে ভারতীয় নাগরিকদের ওপর খড়্গ নেমে আসে। এমনকি ভারতীয় অবৈধ অভিবাসীদের দেশটিতে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে আমেরিকার নীতির কঠোরতা প্রত্যক্ষ করেছে দেশটি। তার রেশ না কাটতেই তুলনামূলক উচ্চহারে শুল্কারোপ দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্কের একটি নতুন মোড় হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ।
ভারত এখন কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবেÑএমন প্রশ্ন উঠেছে দেশটিতে। তবে এটি ভারতের জন্য খুব সহজ হবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। আমেরিকা থেকে পণ্য আমদানি বৃদ্ধি করে দিশটিকে খুশি করার চিন্তা করছে ভারত। পাল্টা কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত তাদের নেই।
সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং সোনা আমদানি বাড়ানোর কথা ভাবছে ভারত। এতে আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমবে। তবে তারা বলছে, কোনো নতুন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা নেই।
বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, শুল্কারোপের এ পদক্ষেপ ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। ওয়াশিংটন এখন নয়াদিল্লিকে ‘কৌশলগত কিন্তু স্বার্থান্বেষী’ অংশীদার হিসেবে দেখছে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এ বাণিজ্যিক চাপানউতোর দুই দেশের দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদারত্বে ফাটল ধরাতে পারে। ২০২৪ সালে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশ দুটি প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বিশেষ করে চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে উভয় দেশের অভিন্ন অবস্থান এ অংশীদারত্বকে আরো মজবুত করেছে।
তবে একই সঙ্গে নয়াদিল্লির মস্কোর প্রতি ঝোঁক নিয়ে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমশ কঠোর হচ্ছে। বর্তমানে ভারত চীনের পরে রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক এবং এখনো ভারতের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ রাশিয়া। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল থেকেও ব্যাপকভাবে অস্ত্র সংগ্রহ করছে ভারত।
গত মে মাসে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধপরবর্তী এক মন্তব্যে ট্রাম্প পাকিস্তানের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল মনোভাব দেখানোর পর থেকেই ভারতের ভেতরে ক্ষোভ জমতে শুরু করে। এখন রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের প্রকাশ্য মন্তব্য ওই উত্তেজনাকে আরো উসকে দিতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এদিকে ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্কারোপের খবরে দেশটির শেয়ারবাজারে প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে পোশাক খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতন হয়েছে। ভারতের কেপিআর মিলসের শেয়ার ৫ শতাংশ, ওয়েলসপুন লিভিংয়ের শেয়ার ২ শতাংশ, অলোক ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার ০ দশমিক ৮ শতাংশ, পিয়ার্ল গ্লোবালের শেয়ার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, গোকূলদাস এক্সপোর্টের শেয়ার ২ দশমিক ৬ শতাংশ, কিটেক্স গার্মেন্টসের শেয়ার ৩ দশমিক ২১ শতাংশ এবং বর্ধমান টেক্সটাইলের শেয়ার ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


