বাংলাদেশ এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াইয়ে বিমানের অবস্থা এখন টালমাটাল। একটি ভিত্তিহীন ইমেইলের ওপর ভিত্তি করে পাঁচজন পাইলটকে সামাজিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতীয় পতাকাবাহী বিমানের ভাবমূর্তি নষ্ট করার পাঁয়তারা করছে কিছু অসাধু পাইলট-কর্মকর্তার একটি চক্র।
বিমান সূত্র জানায়, এ অসাধু চক্রটি অনেক দিন ধরে বিমানে রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল। গণতান্ত্রিক সরকার আসার পর প্রভাব টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে পাঁচজনকে অপরাধী প্রমাণ করে শাস্তি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। অথচ এ তদন্ত বিমানের এখতিয়ারভুক্ত নয়।
জানা গেছে, পাইলটদের লাইসেন্স দেওয়ার অধিকার একমাত্র সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের। লাইসেন্স সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ উঠলে সিভিল অ্যাভিয়েশন তদন্ত করার এখতিয়ার রাখে। আন্তর্জাতিকভাবে এয়ারলাইনসের জন্য এটা প্রযোজ্য। অথচ বিমান নিজেরাই তিন কার্যদিবসের মধ্যে তড়িঘড়ি তদন্ত শেষ করে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা পাইলট সংগঠনগুলোর (বিশেষ করে বাপা) ভেতরের রাজনীতিকে এ ঘটনার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছেন। পেশাদার সংগঠনগুলোতে দলাদলি (বিভাজন) অস্বাভাবিক নয়, তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের হেয় প্রতিপন্ন করতে বেনামি মাধ্যম ব্যবহার করার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দেখে মনে হচ্ছে, এটি কোনো রেগুলেটরি সমস্যা নয় বরং ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যা অনানুষ্ঠানিক উপায়ে মেটানো হচ্ছে।
সূত্র জানায়, বিমান বাহিনীর উড্ডয়ন ফ্লাইং আওয়ার আর এয়ারলাইনসের উড্ডয়ন ফ্লাইং আওয়ার কখনো এক হয় না। সিভিল ফ্লাইং প্রশিক্ষণ ও মিলিটারি ফ্লাইং প্রশিক্ষণের মধ্যে আওয়ারের হিসাব-নিকাশে পার্থক্য রয়েছে। একজন পাইলট যখন মিলিটারি পাইলট হয়ে আসেন তখন সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সিভিল অ্যাভিয়েশনে ফ্লাইংয়ে আসতে হয়। তারপরই তারা কমার্শিয়াল পাইলটের যোগ্যতা অর্জন করে কমার্শিয়াল পাইলট হিসেবে ফ্লাই করেন। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে বিমান বাহিনী থেকে মেধাবী পাইলটরা যোগদান করেন।
এদিকে পাঁচজন পাইলটের বিরুদ্ধে দেওয়া তিন মার্চের তদন্ত প্রতিবেদন বাতিল করে গত ২৫ মার্চ নতুন আরেকটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
অপর এক সূত্র জানায়, ইন্টারন্যাশনাল সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি (আইকাও) প্রতি বছরই বাংলাদেশ সিভিল অ্যাভিয়েশনের উদ্যোগে পাইলটদের দেওয়া লাইসেন্স মনিটর করে থাকে। এছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন অ্যাভিয়েশন সেফটি এজেন্সি (ইয়াসা) ও ক্যাবের অন্যান্য কাজের পাশাপাশি পাইলট লাইসেন্সও দেখভাল করে থাকে। তা সত্ত্বেও পাইলটদের লাইসেন্স ত্রুটি ৩০ বছরেও চোখে না পড়া বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।
বেনামি ইমেইলে তোলপাড়
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে একাধিক বেনামি ইমেইল পাঠানো হয়েছে, যেখানে পাইলট লাইসেন্স ইস্যুতে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের ধারণা, এ ইমেইলগুলোর উৎস খোদ পাইলটরাই।
অভিযোগ উঠেছে, সাবেক এক পরিচালকের নির্দেশনায় তার পছন্দমতো ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এ কমিটির উদ্দেশ্য ছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানহানি করা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ দেশের অ্যাভিয়েশন শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা। আরো অভিযোগ রয়েছে যে, মাত্র তিন দিনের একটি অযৌক্তিক সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তদন্ত চলাকালীন সংশ্লিষ্ট পাইলটদের কোনো নোটিস দেওয়া হয়নি বা তাদের বক্তব্য শোনার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। এ ধরনের আচরণ ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
সূত্র জানায়, প্রথম তদন্তের প্রতিবেদনে বেশকিছু জটিলতা ও অসংগতি রয়েছে। কমিটি ফ্লাইট অপারেশনস ডিরেক্টরের (ডিএফও) মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি পাইলটদের গ্রাউন্ডিং করার সুপারিশসহ প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দিয়েছে। এটি একটি গুরুতর পদ্ধতিগত ত্রুটি। ডেপুটি চিফ অব সেফটি এ কমিটির সদস্য হয়েও কোনো যাচাই ছাড়াই এমন অপ্রত্যাশিত সুপারিশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এছাড়াও রয়েছে বাপার প্রতিনিধির অনুপস্থিতি।
উল্লেখ্য, এ বিষয়ে বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ৫ মার্চ প্রেস রিলিজ ও প্রতিবাদলিপি অফিসিয়াল প্রেস রিলিজের মাধ্যমে স্পষ্ট করে, পাইলট লাইসেন্স যাচাই করা সিএএবির (ক্যাব) সংবিধিবদ্ধ ক্ষমতা। বিমান ইতোমধ্যেই সিএএবির কাছে যাচাইয়ের জন্য আবেদন করেছে। বিমান স্পষ্ট করেছে যে, প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো যাচাইহীন নথিপত্র এবং বেনামি ইমেইলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা প্রকৃত সত্য প্রকাশ করে না।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী হুমায়রা সুলতানা এ বিষয়ে আমার দেশকে বলেন, বিমানের পাঁচজন পাইলটের অপরাধের তদন্ত অধিকতর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য নতুনভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। যাতে নিরপরাধী কেউ শাস্তি না পায়।
এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম আমার দেশকে বলেন, আগের তদন্ত প্রতিবেদনটি তড়িঘড়ি করে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তিন মার্চ দেওয়া হয় । এ তদন্ত প্রতিবেদনটি আসলে সঠিক ছিল না। একটি চাপ সৃষ্টি করে করা হয়েছিল। গত ২৫ মার্চ নতুন আরেকটি কমিটি করা হয়েছে, যাদের ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

