রাজশাহীর মাঠজুড়ে এখন পাকা আমন ধানের সোনালি শীষ। কোথাও বাতাসে দুলছে পাকা ধান, কোথাও চলছে আগাম জাতের ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তোলার প্রস্তুতি। বিশেষ করে তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলায় কৃষকদের ব্যস্ততা বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় এবার বাম্পার ফলনের আশা করছেন তারা।
গত বুধবার তানোর, গোদাগাড়ী ও পবা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আগাম জাতের আমন ধান কাটতে মাঠে নেমেছেন কৃষকরা। কেউ কাস্তে হাতে ধান কাটছেন, কেউ কাটা ধান আঁটি বেঁধে জমিতে স্তূপ করছেন। কোথাও আবার চলছে মাড়াইয়ের প্রস্তুতি।
নিচু জমি ও আগাম রোপণ করা ধানক্ষেতে পাকা শীষের আধিক্য দেখা গেছে। ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তোলাকে কেন্দ্র করে গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। কৃষকদের প্রত্যাশা, কাঙ্ক্ষিত ফলনের পাশাপাশি এবার ধানের ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত হবে।
তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় ধান নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। পরে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গাছ ও শীষ ভালো হয়েছে। আগাম রোপণ করা জমির ধান ইতোমধ্যে পাকতে শুরু করেছে এবং কিছু জমির ধান কাটা হয়েছে। এবার রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ তুলনামূলক কম হওয়ায় ফলন ভালো হবে বলে তিনি আশা করছেন।
পবা উপজেলার কৃষক রজব আলী বলেন, ধানের শীষ দেখে এবার ভালো ফলনের আশা করছেন। ফলন ভালো হলে পরিবারের সারা বছরের খাদ্যের চাহিদা অনেকটাই পূরণ হবে। ধান বিক্রি করে কিছু অর্থও পাওয়া যাবে। তবে উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর নিয়ে তার উদ্বেগ রয়েছে।
গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন মাঠেও আগাম আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। কোথাও পাকা ধানের সোনালি শীষ দুলছে, কোথাও কাটা ধান আঁটি বেঁধে রাখা হয়েছে। আবার কোথাও চলছে মাড়াইয়ের প্রস্তুতি।
গোদাগাড়ীর কৃষক মোসলেম উদ্দিন বলেন, আগাম জাতের ধান পাকায় কাটা শুরু করেছেন। এখন পর্যন্ত অনুকূল আবহাওয়ায় কোনো ক্ষতি হয়নি। বড় ধরনের দুর্যোগ না হলে বিঘাপ্রতি ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি।
তানোর, মোহনপুর ও পবা উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমন ঘরে তোলার পর একই জমিতে আলু, সরিষা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন রবি শস্য আবাদ করবেন অনেকে। আগাম ধান কাটা শেষ হলে দ্রুত জমি প্রস্তুত করে পরবর্তী ফসল চাষের সুযোগ মিলবে।
কৃষকদের মতে, একই জমিতে ধারাবাহিকভাবে একাধিক ফসল আবাদ করা গেলে উৎপাদন ও আয় দুটিই বাড়বে। পাশাপাশি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে, যা কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে আরো লাভবান করবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাজশাহীর তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৮৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ এবং তিন লাখ ১৪ হাজার ৩৩৬ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে গোদাগাড়ী উপজেলায় ২৩ হাজার ৭৬২ হেক্টর এবং তানোর উপজেলায় ২১ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলার এ দুই উপজেলাতেই আমন আবাদ সবচেয়ে বেশি হওয়ায় উৎপাদনেও এগিয়ে থাকার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমন ধানের ফলন অনেকাংশে নির্ভর করে আবহাওয়া, উন্নত জাতের বীজ, সঠিক সময়ে রোপণ ও জমির পরিচর্যার ওপর। এবার অনুকূল আবহাওয়া এবং তুলনামূলক কম রোগবালাইয়ের কারণে অনেক এলাকায় ধানের গাছ ও শীষের গঠন ভালো হয়েছে। তবে ধান পুরোপুরি ঘরে না ওঠা পর্যন্ত অতিবৃষ্টি, ঝড় কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ বলেন, চলতি মৌসুমে তানোরে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। মাঠের সার্বিক অবস্থা ভালো। আগাম জাতের কিছু ধান পাকতে শুরু করেছে এবং কৃষকরা ধান কাটা শুরু করেছেন। রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ মোকাবিলায় কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকলে এবার আমনের ভালো ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।
রাজশাহীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মিতা সরকার বলেন, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন। আগাম জাতের ধান কিছু এলাকায় পাকতে শুরু করেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবার ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
ধান কাটার মৌসুমকে ঘিরে এখন তানোর ও গোদাগাড়ীর কৃষকদের ব্যস্ততা বাড়ছে। ভালো ফলনের প্রত্যাশার পাশাপাশি উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে চলতি মৌসুমে কৃষকের মুখে হাসি আরো উজ্জ্বল হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষকরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

